হোম > সারা দেশ > চট্টগ্রাম

ওসি বদলির পেছনে অদৃশ্য প্রভাবের ইঙ্গিত

জমির উদ্দিন, চট্টগ্রাম

চট্টগ্রাম মহানগরীতে থানার ওসি পদে রদবদল এখন নিয়মিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার বাইরে আলোচিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে ২০ মাসে একাধিকবার বদলির ঘটনায় পুলিশ প্রশাসনের ভেতরে-বাইরে নানা প্রশ্ন উঠেছে।

এ সময়ের অন্তত ১০টি বদলির আদেশ বিশ্লেষণে দেখা যায়, একই ধরনের কর্মকর্তা ঘুরেফিরে গুরুত্বপূর্ণ ও ‘আকর্ষণীয়’ থানাগুলোতেই দায়িত্ব পাচ্ছেন, যা এই বদলির পেছনে অন্য কোনো অদৃশ্য প্রভাব থাকার ইঙ্গিত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। আর ঘুসই সেই অদৃশ্য ইঙ্গিত বলে মনে করছেন সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রামের সাধারণ সম্পাদক আখতার কবির চৌধুরী।

তিনি বলেন, চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের (সিএমপি) থানাগুলোতে ঘন ঘন ওসি রদবদলের এমন প্রবণতা প্রশাসনিক স্থিতিশীলতার জন্য উদ্বেগজনক। একটি থানায় দায়িত্ব নিয়ে স্থানীয় অপরাধচক্র, সামাজিক বাস্তবতা ও গোয়েন্দা তথ্য বুঝে উঠতেই একজন কর্মকর্তার অনেকটা সময় লাগে। সেখানে কয়েক মাস পরপর বদলি হলে কার্যকর পুলিশিং সম্ভব হয় না। এতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির বদলে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।

তিনি আরো বলেন, যেসব থানাকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়, সেগুলোতে একই কর্মকর্তাদের বারবার ঘুরেফিরে পদায়ন করা হলে স্বচ্ছতা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে। বদলি যদি নির্দিষ্ট নীতিমালা ও জবাবদিহির আওতায় না হয়, তাহলে জনগণের মধ্যে পুলিশের প্রতি আস্থার ঘাটতি তৈরি হতে পারে। তাই ওসি পদায়ন ও বদলির ক্ষেত্রে একটি স্পষ্ট, লিখিত নীতিমালা অনুসরণ এবং তা প্রকাশের দাবি জানান তিনি।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর চট্টগ্রাম মহানগর ও জেলা পুলিশের ভেতরে যে বড় ধরনের প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস শুরু হয়, তার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল থানার এই ওসির পদ। সে প্রক্রিয়ায় ৯ সেপ্টেম্বর একযোগে ৩০ জন পরিদর্শককে বদলি করা হয়। এর মধ্যে ১৩ জন ছিলেন সিএমপির ওসি এবং জেলার অন্তত ১২ থানার ওসি। এর আগে ২ সেপ্টেম্বর তাদের প্রত্যাহার করে পুলিশ লাইনসে সংযুক্ত করা হয়, যা কার্যত মাঠ পর্যায়ের নেতৃত্বকে একদিনে শূন্য করে দেয়। এ সিদ্ধান্তকে অনেকেই সিস্টেম রিসেট হিসেবে দেখলেও পরবর্তী বদলির ঘটনাগুলো বলছে, এটি ছিল একটি দীর্ঘমেয়াদি রদবদল চক্রের সূচনা।

এর পরপরই ১০, ১২, ১৫ ও ২২ সেপ্টেম্বর একাধিক দফায় নতুন ওসি পদায়ন করা হয়। বাকলিয়া, বন্দর, সদরঘাট, কোতোয়ালি, খুলশী, হালিশহর, চান্দগাঁও, চকবাজার, কর্ণফুলী, পাঁচলাইশ ও ইপিজেড থানায় নতুন মুখ আনা হয়। কিন্তু এই ‘নতুন’ মুখদের বড় অংশই ছিলেন একই সিস্টেমের ভেতরের কর্মকর্তা, গোয়েন্দা পুলিশ, সিটি এসবি বা অন্যান্য ইউনিট থেকে আনা। ফলে বাইরে থেকে নতুন নেতৃত্ব আসেনি, বরং অভ্যন্তরীণ একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর মধ্যেই ক্ষমতা পুনর্বণ্টন হয়েছে।

এরপর ২৮ নভেম্বর কোতোয়ালি থানায় এবং ১৭ ডিসেম্বর পতেঙ্গা ও কর্ণফুলী থানায়ও নতুন ওসি পদায়ন করা হয়।

ঘুরেফিরে একই থানায় বদলি নিয়ে প্রশ্ন

গত বছরের ২২ অক্টোবর চট্টগ্রামের চার থানায় ওসি রদবদল হয়। কর্ণফুলী থানার ওসি মুহাম্মদ শরীফকে সিটি এসবিতে বদলি করা হয়, তার স্থলে জাহেদুল ইসলাম নিয়োগ পান। বায়েজিদ বোস্তামী থানার ওসি কামরুজ্জামানকে ইপিজেড থানায়, ইপিজেড থানার ওসি জমির হোসেন জিয়াকে পাহাড়তলী থানায় এবং পাহাড়তলী থানার ওসি জসিম উদ্দিনকে বায়েজিদ বোস্তামী থানায় বদলি করা হয়। নভেম্বরে আরো দুই থানায় রদবদল হয় বন্দর থানার ওসি আফতাব উদ্দিনকে বাকলিয়া থানায়, বন্দর থানার নতুন ওসি হিসেবে পুলিশ পরিদর্শক মোস্তফা আহমেদকে পদায়ন করা হয়। বাকলিয়া থানার ওসি ইখতিয়ার উদ্দিনকে সিএমপির কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটে স্থানান্তর করা হয়। অর্থাৎ, চারটি থানার মধ্যে এক ধরনের ‘রোটেশনাল বদলি’ করা হয়েছে, যেখানে নতুন কাউকে আনার পরিবর্তে বিদ্যমান কর্মকর্তাদেরই ঘুরিয়ে দেওয়া হয়েছে।

এর আগে ওই বছরের জানুয়ারির শুরুতে সদরঘাট, চান্দগাঁও ও ডবলমুরিং থানায়ও একই ধরনের রদবদল দেখা যায়। ওই আদেশে তিন থানার ওসিকে সরাসরি লাইনওয়ারে পাঠিয়ে নতুন তিন কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু লক্ষণীয় বিষয় হলো, নতুন হিসেবে যাদের আনা হয়েছে, তারাও আগে একই মহানগরের গুরুত্বপূর্ণ ইউনিট বা থানায় কর্মরত ছিলেন। ফলে বাস্তবে নতুন নেতৃত্ব আসার পরিবর্তে একটি সীমিত গোষ্ঠীর মধ্যেই দায়িত্ব বণ্টন ঘুরপাক খাচ্ছে।

ওই বছরের ৯ নভেম্বর ও ৬ ডিসেম্বরের আদেশগুলো বিশ্লেষণ করলে আরো স্পষ্ট হয় যে, বদলির ধরনটি অনেকাংশেই ‘পছন্দের পোস্টিং’ ঘিরে আবর্তিত। যেমন এক থানার ওসিকে সরিয়ে আরেক গুরুত্বপূর্ণ থানায় বসানো হচ্ছে। আবার কয়েক মাস পর তাকে অন্য আরেক ‘হট’ থানায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এর ফলে একটি নির্দিষ্ট সার্কেলের বাইরে নতুন কর্মকর্তাদের প্রবেশের সুযোগ কমে যাচ্ছে। ওই বছরের ৩১ ডিসেম্বর সদরঘাট, চান্দগাঁও ও ডবলমুরিং থানায় রদবদল হয়। সদরঘাট থানার নতুন ওসি হন পরিদর্শক কাজী মাহফুজ হাসান সিদ্দিকী, চান্দগাঁও থানার ওসি নুর হোসেন মামুন এবং ডবলমুরিং থানার ওসি জামাল উদ্দিন খান।

এরপর ৬ ডিসেম্বর একযোগে ১৬ থানার ওসিকে বদলি করা হয়। কোতোয়ালি থেকে পাঁচলাইশ, পাঁচলাইশ থেকে বাকলিয়া, বাকলিয়া থেকে কোতোয়ালি; বন্দর-পতেঙ্গা-হালিশহর; পাহাড়তলী-ডবলমুরিং-চকবাজার; বায়েজিদ-চান্দগাঁও; খুলশী-কর্ণফুলীÑএভাবে একটি ‘চেইন ট্রান্সফার মডেল’ তৈরি হয়।

চট্টগ্রামের এই ধারাবাহিক রদবদল একটি বিষয় স্পষ্ট করে যে, কিছু থানা ‘হট জোন’ হিসেবে বিবেচিত। চকবাজার, কোতোয়ালি, বন্দর, ডবলমুরিং, পতেঙ্গা, ইপিজেড, পাহাড়তলী ও কর্ণফুলী থানায় দায়িত্ব মানে কেবল আইনশৃঙ্খলা নয়; বরং অর্থনীতি, শিল্প, পরিবহন ও রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ন্ত্রণ করা। এজন্যই এসব থানায় পোস্টিং সবচেয়ে আকর্ষণীয়। ঘন ঘন রদবদল এই সুযোগ নিয়ন্ত্রণে রাখার একটি পদ্ধতি হিসেবে দেখা যায়।

পুলিশ নীতিমালা অনুযায়ী একজন ওসি সাধারণত তিন বছর পর্যন্ত একটি থানায় থাকেন। কিন্তু চট্টগ্রামে কয়েক মাস পরপর বদলি হওয়ায় ধারাবাহিকতা হারিয়েছে, যার ফলে মাঠ পর্যায়ের কার্যক্রমে স্থিতিশীলতা না থাকা, অপরাধচক্রের গভীর ধারণা না থাকা এবং প্রশাসনিক অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।

পুলিশের সূত্র বলছে, ‘পছন্দের থানা’ পাওয়ার জন্য অঘোষিত প্রতিযোগিতা আছে। আনুষ্ঠানিকভাবে সব বদলি জনস্বার্থে হলেও অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক গুরুত্বসম্পন্ন থানায় পদায়ন প্রভাবশালী তদবিরের সঙ্গে যুক্ত। সর্বশেষ কমিশনার হাসিব আজিজের নেতৃত্বে এই ঘন ঘন রদবদল নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, রদবদল প্রক্রিয়া যদি স্বচ্ছ ও নীতিনির্ভর না হয়, তবে তা শুধু প্রশাসনিক অস্থিরতা নয়, নগরের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থাকেই দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে।

তবে সাবেক প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী খোদা বখশ চৌধুরী বলেন, একটি সরকার পতনের পর দেশজুড়ে প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে সাধারণত ঘন ঘন বদলি করা হয়। এটি একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। বিশেষ করে যখন রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক ব্যবস্থার ভারসাম্য সাময়িকভাবে শিথিল হয়ে যায়, তখন গুরুত্বপূর্ণ পদে বিশেষত থানার ওসি বা জেলা পর্যায়ের কর্মকর্তাদের দ্রুত বদলির মাধ্যমে মাঠ পর্যায়ের নেতৃত্ব পুনর্বিন্যস্ত করা হয়। এছাড়া জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা নিশ্চিতের জন্যও অনেক সময় কর্মকর্তাদের বদলি করা হয়। এ বদলির লক্ষ্য কেবল ব্যক্তিগত নিয়োগ নয়, বরং একটি স্বচ্ছ ও কার্যকর প্রশাসনিক পরিবেশ বজায় রাখা। আমি এটিকে স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হিসেবে দেখছি, যা দেশের আইনশৃঙ্খলা ও প্রশাসনিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে সম্পর্কিত।

কুমিল্লায় ছেলের হামলায় বাবার করুণ মৃত্যু

রামগঞ্জে ছাত্রদল নেতার ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার

চাঁদপুরে হামে আক্রান্ত ২৩ শিশু হাসপাতালে, মৃত্যু ৩

চট্টগ্রামে ‘স্বাধীনতা বইমেলা’ উদ্বোধন আজ

উখিয়ায় দেশীয় অস্ত্রসহ কিশোর আটক, পলাতক ১

গোমতীর বুকে পলো উৎসব, মাছ শিকারিদের মিলনমেলা

পটিয়া আইনজীবী সমিতির নির্বাচন সম্পন্ন, নেতৃত্বে কবিশেখর-তানজিনা

আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে অশনিসংকেত

রামুর কৃষক নাইংক্ষ্যংছড়িতে অপহৃত, মুক্তিপণ দাবি

মতলব দক্ষিণে ফিলিং স্টেশন মালিককে ১ বছরের জেল