উড়িরচরে জমি, বাড়িঘর, পথঘাট সবই আছে। শুধু নেই নিজেদের নামে কোনো ভূমি। অনেকটা নিজ দেশেই পরবাসী অবস্থায় জীবন পার করছে চরবাসী।
নোয়াখালীর উপকূলীয় দ্বীপ জনপদ উড়িরচরের অর্ধলক্ষ ভূমিহীনের বসবাস। ফলে ভূমিদস্যুদের হুমকি, মামলা, হামলার ভয়ে অনেকটা নির্ঘুম দিন কাটছে তাদের।
সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, নোয়াখালীর ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন দ্বীপ উড়িরচর। কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা ও সন্দ্বীপ উপজেলার সীমান্তে চরটির অবস্থান। সেখানকার চরগাজী নিজাম অংশের একতা বাজার, ফুল মিয়া চেয়ারম্যান বাজার ও বাতানী বাজার এলাকায় প্রায় ৫০ হাজার ভূমিহীনের বসবাস। প্রতিকূল আবহাওয়া, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে আছে তারা। নদীভাঙনে নিঃস্ব হয়ে শেষ আশ্রয় হিসেবে এসব ভূমিহীন পরিবার বেছে নিয়েছে এই চরাঞ্চলকে।
যুগ যুগ ধরে এখানে বসবাস করলেও তারা ভূমি বন্দোবস্তো পায়নি। ফলে নিজ দেশেই অনেকটা পরবাসীর মতো বসবাস করছে ভূমিহীনরা। প্রকৃত ভূমিহীনদের বন্দোবস্ত না দেওয়ায় ভূমিদস্যুরা ভুয়া নথি তৈরি করে জায়গাগুলো দখলের পাঁয়তারা করছে বলে অভিযোগ করেছেন ভূমিহীনরা। মামলা-হামলার ভয়ে আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন ভূমিহীনরা। এমতাবস্থায় দ্রুত সিডিএসপি প্রণীত ভূমিহীনদের তালিকা অনুযায়ী দ্রুত ভূমি বন্দোবস্ত দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
একতা বাজারের ভূমিহনী নারী রহিমা আক্তার বলেন, ‘এই চরের ভূমির জন্য আমরা অনেক কষ্ট করেছি, বহু স্বজন হারিয়েছি। শুধু এই আশায় যে, আমরা এক টুকরো ভূমি পাব। কিন্তু আমাদের সেই আশা এখনো পূরণ হয়নি। ভূমিদস্যুরা আমাদের জায়াগ দখলের হুমকি দেয়, আমাদের স্বামী-সন্তানদের মেরে ফেলার হুমকি দিচ্ছে। আমরা আতঙ্কের মধ্যে আছি ‘
বাতানী বাজারের আরেক ভূমহীন বেলাল মিয়া বলেন, ‘এই চরকে কেন্দ্র করে আমাদের নানাভাবে হয়রানি করা হচ্ছে। আদালতে মামলা দিয়ে হয়রানি এমনকি হত্যার হুমকিও দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু আমরা জীবন থাকতে এই ভূমি ছাড়ব না, এটা আমাদের বাপ-দাদার ভিটা, আমাদের একমাত্র সম্বল।’
চাই সিডিএসপি যে জরিপ করেছে, সেই জরিপ অনুযায়ী ভূমিহীনদের ভূমি বন্দোবস্ত দেওয়া হোক।
ফুল মিয়া চেয়ারম্যান বাজার এলাকার ভূমিহীন আবদুর রহমান জানান, ‘আমরা যুগ যুগ ধরে বসবাস করলেও ভূমি পাব না, আর প্রভাবশালী ও ভূমিদস্যুরা শহরে বসে ভুয়া নথি করে ভূমি নিয়ে যাবে—এটা হতে পারে না। আমাদের ভূমি দখল করতে এলে আমরা প্রতিহত করব। প্রয়োজনে নিজের জীবন দিয়ে দেব। কারণ, স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে আমাদের আর কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই। আমরা বাঁচব এখানে, মরবও এখানে।’
ভূমিহীন নেতা আবু বক্কর ছিদ্দিক নসু মাঝি জানান, ‘ভূমিদস্যুরা আমাদের মারার জন্য লোক ভাড়া করেছে। আমরা ভূমিহীনদের পক্ষে কথা বলে আজ আমাদের জীবন বিপন্নের পথে। আমাদের স্ত্রী-সন্তানেরা আতঙ্কের মধ্যে থাকে, কখন কী হয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে আমাদের আকুল আবেদন, তিনি যেন খোঁজখবর নিয়ে আমাদের ভূমি বন্দোবস্তের ব্যবস্থা করেন।’
এ বিষয়ে নোয়াখালী জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম জানান, আমরা ইতিমধ্যে অনেক ভূমিহীনকে ভূমি বন্দোবস্ত দিয়েছি। বিভিন্ন চরে ভূমি বন্দোবস্ত দেওয়া বাকি রয়েছে। উড়িরচরের ভূমিহীনদের দাবির বৈধতা যাচাই-বাছাই করে প্রকৃত ভূমিহীন ও অসহায় পরিবারের মধ্যে দ্রুতই ভূমি বন্দোবস্ত দেওয়া হবে।
নদীভাঙনের নির্মমতায় সর্বস্ব হারানো এসব ভূমিহীন মানুষের স্বপ্ন পূরণ আর জীবনমান উন্নয়নে দ্রুত ভূমি বন্দোবস্ত দিয়ে তাদের পাশে দাঁড়াবে সরকার এমনটাই প্রত্যাশা উড়িরচরবাসীর।
এমএইচ