দীর্ঘ দিন ধরে সরকারি কর্মকর্তাকে প্রশাসক করে পরিচালিত হয়ে আসছে চট্টগ্রাম জেলা পরিষদ। তবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে বিএনপি সরকার গঠনের পর সিটি করপোরেশনের পাশাপাশি নতুন করে আলোচনায় এসেছে জেলা পরিষদ।
সহসা নির্বাচন না হলেও এরই মধ্যে জেলা পরিষদে নতুন প্রশাসক নিয়োগ করা হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে কে হচ্ছেন চট্টগ্রাম জেলা পরিষদের প্রশাসক, তা নিয়ে আলোচনাও জোরালো হচ্ছে। অনলাইন-অফলাইনে উঠছে নানা গুঞ্জন। আলোচনার শীর্ষে আছেন চট্টগ্রামের দুই সিনিয়র বিএনপি নেতা।
এরা হলেন, উত্তর জেলা বিএনপির বিলুপ্ত কমিটির আহ্বায়ক ইঞ্জিনিয়ার বেলায়েত হোসেন ও দক্ষিণ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ইদ্রিস মিয়া। জেলার বিভিন্ন উপজেলার বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা তাদের ছবি দিয়ে জেলা পরিষদের প্রশাসক পদে দেখতে চাই উল্লেখ করে পোস্ট দিচ্ছেন।
তারা আশা করছেন, দীর্ঘ দিন নিষ্প্রাণ হয়ে থাকা নগরের লালদিঘী পাড়ের চট্টগ্রাম জেলা পরিষদ কার্যালয় এবার প্রাণবন্ত হয়ে উঠবে । বাড়বে নেতাকর্মীদের যাতায়াত, খুলবে এলাকা ভিত্তিক সমস্যাগুলো সমাধানের নতুন দ্বার।
এদিকে জেলা পরিষদের প্রশাসক হতে প্রার্থীরাও দৌড়ঝাঁপ চালিয়ে যাচ্ছেন স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ও সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে। তুলে ধরছেন নিজেদের যোগ্যতা ও অতীত কর্মকাণ্ডের ফিরিস্তি। সরকারও সম্ভাব্যদের নিয়ে যাচাইবাছাই শুরু করেছে বলে দলীয় সূত্র জানিয়েছে।
দলীয় সূত্র জানায়, সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার দৌঁড়ে এগিয়ে ছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত হতে পারেননি কিংবা সাংগঠনিক সিদ্ধান্তে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াতে হয়েছে। দুঃসময়ে দলের জন্য ত্যাগ ছিল, মামলা, হামলা ও পুলিশি নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, একাধিকবার কারা নির্যাতিত ও তৃণমূলে সম্পর্ক আছে- এমন নেতাই হতে পারেন প্রশাসক। দলের হাইকমান্ড সবদিক বিবেচনায় নিয়ে শিগগিরই জেলা পরিষদে প্রশাসক নিয়োগ দিতে পারে।
জানা যায়, ২০২৪ সালে ছাত্র জনতার গণঅভ্যুত্থানে ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকার পালিয়ে গেলে আওয়ামী লীগ নেতারাও পালিয়ে যান। পরে দেশের সব উপজেলা পরিষদ ও জেলা পরিষদ বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়। এতে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্য পদগুলো শূন্য হয়ে পড়ে।
এরপর থেকে চেয়ারম্যান নয় প্রশাসক দিয়ে চলছে চট্টগ্রাম জেলা পরিষদ। বর্তমানে চট্টগ্রামের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (সার্বিক) দায়িত্ব পালন করছেন।
এবার প্রশাসক দৌড়ে এগিয়ে আছেন চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক ইঞ্জিনিয়ার বেলায়েত হোসেন ও দক্ষিণ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ইদ্রিস মিঞা। এর মধ্যে বেলায়েত হোসেনের বাড়ি দ্বীপ উপজেলা সন্দ্বীপে।
তিনি অতিতে চট্টগ্রামে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে প্রথম সারির নেতা হিসেবে পরিচিত। তার বিরুদ্ধে ৪০টির মতো মামলা রয়েছে। গেল ১৭ বছর ঘরছাড়া জীবনযাপন করে আসছেন তিনি। মামলা, হামলা, ডান্ডা বেড়ি, চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার ছিল তার নিত্যসঙ্গী।
১৯৮৪ সালে তিনি চট্টগ্রাম পলিটেকনিক ছাত্রদলের সভাপতি, ১৯৮৬ সালে চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক ও পলিটেকনিকের নির্বাচিত জিএস ছিলেন। এরপর তিনি বিএনপি সন্দ্বীপ উপজেলার সহসভাপতি, চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপির সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য, সন্দ্বীপ উপজেলা বিএনপির নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক, চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপির ১ নম্বর যুগ্ম আহ্বায়ক হন।
২০১৭ সালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত বেগম খালেদা জিয়াকে নিয়ে চট্টগ্রামের একটি আঞ্চলিক পত্রিকায় কুরুচিপূর্ণ ও আপত্তিকার সংবাদ প্রকাশ হলে তিনি ক্ষুদ্ধ হয়ে ওই পত্রিকার বিরুদ্ধে ১০০ কোটি টাকা মানহানির মামলা করেন।
২০১৪ সালে তিনি বিএনপির মনোনয়ন পান সন্দ্বীপ উপজেলা চেয়ারম্যান পদে। ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কারাগারে থাকা অবস্থায় দল তাকে বিকল্প প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেয়। ২০২৬ সালে মনোনয়ন প্রত্যাশী হলেও শেষ পর্যন্ত তাকে মূল্যায়ন করা হয়নি। ৪০টি মামলায় বহুবার গ্রেপ্তার ও রিমান্ডে নির্যাতনের শিকার হন।
বিএনপি নেতাকর্মীরা মনে করেন, ইঞ্জিনিয়ার বেলায়েত হোসেনকে এবার মূল্যায়ন করা হতে পারে। জাতীয় নির্বাচনে তিনি মনোনয়ন পাননি। জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পদে তাকে দায়িত্ব দিলে সন্দ্বীপসহ ১৫টি উপজেলার উন্নয়নে গতি পাবে। তাছাড়া সাংগঠনিক কারণে সবকটি উপজেলায় তার সমান বিচরণ আছে।
অন্যদিকে দক্ষিণ জেলা থেকে অনেকে মনে করেন আলোচনায় থাকা ইদ্রিস মিয়াও হতে পারেন চট্টগ্রাম জেলা পরিষদের নতুন প্রশাসক। ইতিমধ্যে তাকে ঘিরে আলোচনা সরগরম হয়ে ওঠেছে নেতাকর্মীদের টাইমলাইনে। কেউ কেউ তার ছবি দিয়ে শুভকামনা করছেন।
জানা যায়, ইদ্রিস মিঞা বিএনপিতে পরীক্ষিত নেতা। তার বিরুদ্ধে মামলা যেমন ছিল তেমনি অতিতে স্বৈরাচারের আমলে সীমাহীন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তিনি এর আগে পটিয়া উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও দক্ষিণ জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি ছিলেন।
সবশেষ তিনি দক্ষিণ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক হয়েছেন। তিনি এর আগে ২০১০ সালে আওয়ামী লীগের মোতাহের হোসেনকে হারিয়ে বিপুল ভোটে পটিয়া উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে বিজয়ী হন। ইউপি সদস্য থেকে ওঠে আসা এই নেতা কয়েকবার ইউপি চেয়ারম্যান, উপজেলা চেয়ারম্যান ছিলেন। জনপ্রতিনিধিত্ব করার ব্যাপারে তার ব্যাপক অভিজ্ঞতা রয়েছে। তাকে চেয়ারম্যান করা হলে জেলা পরিষদ পাবে যোগ্য নেতৃত্ব এমনটাই মনে করেন অনেকে।
উল্লেখ্য, ৫ আগস্টের আগে চট্টগ্রাম জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন আওয়ামী লীগের এটিএম পেয়ারুল ইসলাম। পরিষদ বিলুপ্ত করা হলে পদ শূন্য হয়। জেলা পরিষদে মূলত ইউপি সদস্য, সিটি করপোরেশনের মেয়র, কমিশনার, পৌরসভার মেয়র ও কাউন্সিলর, সংরক্ষিত আসনের নারী সদস্য ও কমিশনাররা ভোট দেন।
তারা নির্বাচকমন্ডলীর সদস্য হয়ে থাকেন কিন্তু প্রার্থী হতে পারেন না। আর প্রার্থীরা ভোট দিতে পারেন না। অর্থাৎ তারা ভোটার না। রাজনৈতিক দল থেকে একজনকে চেয়ারম্যান প্রার্থী করা হয়। তাকে ১৫টি উপজেলায় নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা ভোট দিয়ে চেয়ারম্যান ও সদস্যদের নির্বাচিত করেন। এছাড়া চট্টগ্রাম জেলা পরিষদে ১৫টি সাধারণ সদস্য ও ৫টি সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্য পদসহ মোট ২১টি পদ রয়েছে।