চট্টগ্রামের ১৬টি আসনের প্রার্থীদের দাখিল করা হলফনামা বিশ্লেষণে সম্পদে বিএনপির প্রার্থীরা অনেক এগিয়ে রয়েছেন। এ দিকে ধনী প্রার্থীদের তালিকায় শীর্ষে রয়েছেন আসলাম চৌধুরী। তিনি চট্টগ্রাম-৪ (সীতাকুণ্ড) বিএনপির প্রার্থী।
আর জামায়াতের অধিকাংশ প্রার্থী মধ্যবিত্ত বা নিম্নমধ্যবিত্ত পেশাজীবী। গরিব প্রার্থীদের তালিকায় রয়েছেন একই আসনের মো. আনোয়ার ছিদ্দিকী। তিনি একই আসনের জামায়াত প্রার্থী। হলফনামায় দেখা গেছে, আসলাম চৌধুরীর সম্পদের পরিমাণ সাড়ে ৪০০ কোটি টাকা। আনোয়ার ছিদ্দিকী সম্পদের পরিমাণ ৪৩ লাখ ৮৪ হাজার টাকা।
হলফনামা অনুযায়ী চট্টগ্রামে বিএনপির বেশিরভাগ প্রার্থীর মালিকানাধীন সম্পদ কয়েক কোটি থেকে শুরু করে কয়েকশ কোটি টাকা পর্যন্ত। নগদ অর্থে একেকজনের হাতে রয়েছে কয়েক লাখ থেকে কয়েক কোটি টাকা। স্থাবর–অস্থাবর সম্পদ, ব্যবসা, জমি এবং ব্যাংক হিসাব-সব সূচকেই বিএনপি প্রার্থীরা সুস্পষ্টভাবে এগিয়ে। উদাহরণ হিসেবে সীতাকুণ্ডে বিএনপি প্রার্থী আসলাম চৌধুরীর সম্পদ ঘোষণায় দেখা যায়, তার ব্যক্তিগত স্থাবর ও অস্থাবর মিলে প্রায় ৪ শত ৫৬ কোটি ৯৫ লাখ ৭ হাজার টাকার সম্পদ রয়েছে। তবে তার ঋণ চট্টগ্রামের অন্যান্য প্রার্থীদের চেয়ে সবচেয়ে বেশি। বর্তমানে তার সর্বমোট ঋণ রয়েছে ১ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। রাউজান থেকে হুমাম কাদের চৌধুরীর সম্পদ ঘোষণায়ও একই চিত্র-স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ মিলিয়ে প্রায় শতকোটি টাকার মালিকানা।
অন্যদিকে জামায়াতের অধিকাংশ প্রার্থী এসেছেন মধ্যবিত্ত শিক্ষক, ছোট ব্যবসায়ী বা বেতননির্ভর পেশার ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে। তাদের ঘোষিত সম্পদ সাধারণত ৩০ লাখ থেকে ১ কোটি টাকার মধ্যে। বেশিরভাগের নগদ অর্থ ১ থেকে ২০ লাখ টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ। কিছু আসনে জামায়াত প্রার্থীরা মোট সম্পদ দেখিয়েছেন মাত্র ৫০–৮০ লাখ টাকা, যা বিএনপির প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় বহুগুণ কম। ব্যতিক্রম হিসেবে ফটিকছড়িতে জামায়াত প্রার্থী নুরুল আমিন ১৩ কোটি টাকার সম্পদ দেখিয়েছেন।
চট্টগ্রামের সামগ্রিক ধারা বিবেচনায় এটি একটি ব্যতিক্রম হিসেবেই দেখা যায়। চট্টগ্রামে ১৬ আসনের মধ্যে সবেচেয় গরীব প্রার্থী সীতাকুণ্ড আসনের জামায়াতের মো. আনোয়ার ছিদ্দিকর। তার মোট সম্পদ ৪৩ লাখ ৮৪ হাজার টাকা। তার নগদ টাকা ৯০ হাজার, বার্ষিক আয় ৫ লাখ ৬৬ হাজার। সম্পদ দেখিয়েছেন মাত্র ৪৩ লাখ ৮৪ হাজার।
আসলাম চৌধুরীর পর দ্বিতীয় অবস্থানে রাঙ্গুনিয়া আসনের বিএনপির প্রার্থী হুমাম কাদের চৌধুরী। তার মোট সম্পদ প্রায় ১৩৪ কোটি টাকা (স্ত্রীসহ যৌথ)। ব্যক্তিগত সম্পদ ৮৯ কোটি, স্ত্রীর ৪৭ কোটি ৫০ লাখ। নগদ টাকা রয়েছে ৩ কোটি ৮৫ লাখ, স্ত্রীর ২৬৯ কোটি ৬৫ লাখ। এ আসনে তিনি সবচেয়ে ধনী প্রার্থী। রাউজানের বিএনপির গোলাম আকবর খোন্দকারের মোট সম্পদ প্রায় ৫২ কোটি টাকা। তার ব্যক্তিগত সম্পদ ৩৬ কোটি, স্ত্রীর ১৬ কোটি। নগদ টাকা রয়েছে ১ কোটি ২২ লাখ, স্ত্রীর ১ কোটি ৮২ লাখ। দীর্ঘদিনের ব্যবসায়ী হিসেবে তার আর্থিক ভিত্তি উল্লেখযোগ্য।
একই আসনে বিএনপির অন্য প্রার্থী স্বতন্ত্র গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরীর মোট সম্পদ প্রায় ৪২ কোটি টাকা। তার ব্যক্তিগত সম্পদ ২৬ কোটি, স্ত্রীর ১৬ কোটি। নগদ টাকার পরিমাণ ১ কোটি ৭৫ লাখ, স্ত্রীর ৯ কোটি ২৮ লাখ। বার্ষিক আয় দেখিয়েছেন ৩১ কোটি টাকা, যা জেলার সর্বোচ্চ ঘোষিত আয়ের একটি। পটিয়া আসনের বিএনপির মো. এনামুল হকের মোট সম্পদ ৪৪ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। ব্যবসায়ী এনামুল হক ব্যক্তিগত সম্পদ দেখিয়েছেন ৪৪ কোটি ৫৯ লাখ। নগদ অর্থ ১ কোটি ৬ লাখ। এই আসনে তিনিই শীর্ষ ধনী প্রার্থী।
সবচেয়ে কম সম্পদশালী ৫ প্রার্থীর মধ্যে রয়েছে আনোয়ারা–কর্ণফুলী আসনের জামায়াতের মাহমুদুল হাসান। তার মোট সম্পদ ৬৫ লাখ টাকা। তার বার্ষিক আয় মাত্র ৫০ হাজার। নগদ টাকা ৮২ হাজার। স্থাবর–অস্থাবর সম্পদ ৬৫ লাখ টাকা। পুরো জেলার মধ্যে সবচেয়ে কম সম্পদশালী প্রার্থী। তারপর সীতাকুণ্ডের মো. আনোয়ার ছিদ্দিকর। তার মোট সম্পদ ৪৩ লাখ ৮৪ হাজার টাকা। তার নগদ টাকা ৯০ হাজার, বার্ষিক আয় ৫ লাখ ৬৬ হাজার। সম্পদ দেখিয়েছেন মাত্র ৪৩ লাখ ৮৪ হাজার।
তারপর সন্দ্বীপ আসনের জামায়াতের মোহাম্মদ আলাউদ্দীনের মোট সম্পদ ১ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। তার নগদ টাকা ৭৭ হাজার, বার্ষিক আয় ৪ লাখ ৫০ হাজার। দীর্ঘদিনের প্রবাসজ অভিজ্ঞতার কারণে তার সম্পদের বড় অংশ বিদেশি–উৎস বলে উল্লেখ করেছেন। রাউজানের মো. শাহজাহান মঞ্জু (জামায়াত) মোট সম্পদ ৮১ লাখ টাকা। তার বার্ষিক আয় ৪ লাখ ৮০ হাজার। কোনো নগদ টাকা দেখাননি। স্থাবর–অস্থাবর সম্পদ মোট ৮১ লাখ টাকা।
সর্বশেষ মিরসরাইয়ের মোহাম্মদ ছাইফুর রহমান (জামায়াত) মোট সম্পদ ৬০ লাখ টাকা। তার বার্ষিক আয় ১০ লাখ ৭৯ হাজার, সম্পদ ৬০ লাখ, নগদ ১৬ লাখ ৭২ হাজার। বিএনপি প্রতিদ্বন্দ্বীর তুলনায় তাঁর আর্থিক সক্ষমতা অনেক কম।
অর্থনীতিবিদ ড. মইনুল ইসলাম আমার দেশকে বলেন, মনোনয়নপত্রের সঙ্গে জমা দেওয়া হলফনামার তথ্য প্রার্থীর জন্য আইনি দায়বদ্ধতার মধ্যে পড়ে। কিন্তু বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়-আয়ের তুলনায় সম্পদ অস্বাভাবিকভাবে বেশি, বিশেষ করে নগদ অর্থের পরিমাণ অযৌক্তিকভাবে ফুলে ওঠে।
তার মতে, এমন পরিস্থিতিতে নিয়মিত অডিট বা স্বাধীনভাবে এসব তথ্য যাচাই করা জরুরি। এতে প্রার্থীরা যেমন স্বচ্ছতা বজায় রাখতে বাধ্য হবেন, তেমনি ভোটাররাও প্রার্থীর প্রকৃত আর্থিক অবস্থার নির্ভরযোগ্য তথ্য জানতে পারবেন। তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশে কোনো সময় প্রার্থীদের হলফনামার তথ্য কোনো সংস্থা চ্যালেঞ্জ করেনি। তাদের আয়ের উৎসের সঙ্গে জমা দেওয়া তথ্য মিলে কি–না, সেটি তদন্ত করার কোনো প্রচলন নেই।
রিটার্নিং কর্মকর্তা ও চট্টগ্রামের আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন চৌধুরী বলেন, নির্বাচনে অংশ নেওয়া প্রত্যেক প্রার্থীর জন্য হলফনামায় ‘সঠিক ও সত্য’ তথ্য দেওয়া বাধ্যতামূলক। হলফনামায় ভুল তথ্য দিলে বা তথ্য গোপন করলে তা আইনগতভাবে গুরুতর অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। এতে প্রার্থিতা বাতিলসহ যেকোনো সময় আইনি জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে।
তিনি আরো জানান, নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী শুধু প্রার্থীই নয়, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি–ধর্মী সংস্থাগুলোও নির্বাচনের সময় প্রার্থীদের হলফনামার সত্যতা যাচাই করে থাকে। এটি প্রমাণ করে—হলফনামা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আইনি দলিল, যেখানে কোনো অসঙ্গতি বা ভুল তথ্য মেনে নেওয়ার সুযোগ নেই।