মাদারীপুর জেলার শিবচর উপজেলায় চাহিদার অর্ধেকেরও কম বিদ্যুৎ সরবরাহ পাওয়ায় কয়েক দিন ধরে তীব্র লোডশেডিং চলছে। দিনে ও রাতে ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে জনজীবন। সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছে শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিরা। একই সঙ্গে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা, উৎপাদনমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষা কার্যক্রম এবং শ্রমজীবী মানুষের আয়-রোজগারেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
শিবচর উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, প্রচণ্ড গরমে বিদ্যুৎ না থাকায় অনেকেই ঘর থেকে বের হয়ে দোকান, রাস্তার পাশে কিংবা খোলা জায়গায় সময় কাটাচ্ছেন। রাতে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় অনেক পরিবার নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছে। নিয়মিত বিদ্যুৎ না থাকায় মোবাইল চার্জ দেওয়া, পানির মোটর চালানোসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজেও চরম দুর্ভোগ সৃষ্টি হয়েছে।
উপজেলার বিভিন্ন বাজারে গিয়ে দেখা গেছে, ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে দোকানপাটে ক্রেতা উপস্থিতি কমে গেছে। বিদ্যুৎনির্ভর ব্যবসা ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ফটোকপি, কম্পিউটার ও মোবাইল সার্ভিসিং, কোল্ড ড্রিংকস ও ফ্রিজভিত্তিক ব্যবসা, উৎপাদনমুখী কারখানাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম চরম ব্যাহত হচ্ছে। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, বিদ্যুতের ভোল্টেজ ওঠানামার কারণে বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কাও বেড়েছে।
স্থানীয় ভ্যানচালক করিম খান বলেন, রাতে ভ্যানের ব্যাটারি ঠিকমতো চার্জ দিতে পারি না। তাই দিনে অর্ধেক সময়ও ভ্যান চালাতে পারি না। আগে যেখানে ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা আয় হতো, এখন ৪০০ টাকাও হয় না। পরিবার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী তরিকুল ইসলাম জানায়, ‘১ তারিখ থেকে অর্ধবার্ষিক পরীক্ষা শুরু হবে। কিন্তু সন্ধ্যার পর লোডশেডিং আর প্রচণ্ড গরমে ঠিকমতো পড়াশোনা করতে পারছি না। আমাদের সিলেবাস শেষ করতেই কষ্ট হয়ে যাবে।’
৬৫ বছর বয়সী জব্বার মাদবর বলেন, ‘এই গরমে বিদ্যুৎ চলে গেলে খুব কষ্ট হয়। আমি উচ্চ রক্তচাপের রোগী। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকলে অসুস্থ হয়ে পড়ি।’
শিবচর বাজারের ব্যবসায়ী দিন ইসলাম বলেন, ‘দিনে কয়েকবার বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় ব্যবসা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। ফ্রিজে রাখা পণ্য নষ্ট হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। প্রতিদিন আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছি।’
পাচ্চর বাজারের ব্যবসায়ী রফিক মিয়া বলেন, ‘হঠাৎ বিদ্যুৎ যাওয়া-আসার সময় ভোল্টেজ ওঠানামা করছে। এতে বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে, যা ব্যবসায়ীদের জন্য বড় ক্ষতির কারণ হবে।’
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০২২ সালে শিবচরকে শতভাগ বিদ্যুতায়িত উপজেলা হিসেবে ঘোষণা করা হয়। বর্তমানে উপজেলার ১৮টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভায় প্রায় ১ লাখ ৩৫ হাজার গ্রাহককে ৫টি উপকেন্দ্রের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে। এছাড়া প্রায় ২ হাজার ৮৪৫ কিলোমিটার বিদ্যুৎ লাইনের মাধ্যমে সেবা প্রদান করা হচ্ছে। তবে অফিস সূত্রে জানা গেছে, গ্রাহকদের কাছে প্রায় ১০ কোটি টাকার বিদ্যুৎ বিল বকেয়া রয়েছে।
এ বিষয়ে শিবচর পল্লী বিদ্যুতের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার অভিলাষ চন্দ্র পাল বলেন, ‘জনগণ আমাদের ওপর বিরক্ত হলেও আমাদের কিছু করার নেই। আমরা চাহিদার অর্ধেকেরও কম বিদ্যুৎ পাচ্ছি। তাই নির্দিষ্ট সময় পরপর লোডশেডিং দিয়ে সরবরাহ বজায় রাখার চেষ্টা করছি।’
তিনি জানান, ‘শিবচরে বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ৩৫ মেগাওয়াট হলেও বর্তমানে জাতীয় গ্রিড থেকে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ১৬ থেকে ১৭ মেগাওয়াট। ফলে বাধ্য হয়েই এলাকাভিত্তিক লোডশেডিং করতে হচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘লোডশেডিং একটি জাতীয় সমস্যা। বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহ বৃদ্ধি পেলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে আমরা আশা করছি।’
এদিকে দীর্ঘস্থায়ী লোডশেডিংয়ে ক্ষুব্ধ ব্যবসায়ী ও স্থানীয় বাসিন্দারা দ্রুত বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক করার দাবি জানিয়েছেন। তাদের অভিযোগ, অতিরিক্ত গরমে বিদ্যুৎবিহীন দোকানে ক্রেতা কমে যাচ্ছে, উৎপাদনমুখী প্রতিষ্ঠানে শ্রমিকদের কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে এবং অর্থনৈতিক ক্ষতি বাড়ছে। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের দাবিতে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের কর্মসূচি দেওয়ারও ইঙ্গিত দিয়েছেন স্থানীয়রা।যেকোনো সময় বিদ্যুৎ নিয়ে ঘটে যেতে পারে বড় ধরনের দুর্ঘটনা।
এমএইচ