দস্যু তৎপরতায় ফের অস্থিরতা
দস্যু তৎপরতায় ফের অস্থির হয়ে উঠেছে সুন্দরবন। অপহরণ-মুক্তিপণ আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে উপকূলবাসী ।
গত দেড় বছরে একের পর এক অপহরণ, মুক্তিপণ আদায় ও সশস্ত্র দস্যু তৎপরতা বৃদ্ধির ধারাবাহিকতায় আবারও অস্থির হয়ে উঠেছে সুন্দরবন ও এর উপকূলীয় অঞ্চল। সাতক্ষীরার শ্যামনগর, খুলনার কয়রা এবং আশপাশের বিস্তীর্ণ বনাঞ্চল ঘিরে নতুন করে ছড়িয়ে পড়েছে দস্যু আতঙ্ক। একসময় কঠোর অভিযান ও যৌথ বাহিনীর টানা তৎপরতায় যে দস্যুমুক্তির স্বস্তি ফিরেছিল, তা আবার হারিয়ে গিয়ে পুরো অঞ্চলকে ঠেলে দিচ্ছে ভয়ংকর অনিশ্চয়তার দিকে। পশ্চিম সুন্দরবনের নদী-খাল, চর ও বনপথে সক্রিয় হয়ে উঠেছে একাধিক দস্যু বাহিনী। আর এতে জেলে, মৌয়াল ও বনজীবীদের জীবন ফিরেছে ভয়, আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতায়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, অপহরণ, মুক্তিপণ আদায়, অস্ত্রের মুখে জিম্মি করা, মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে চাঁদা আদায় এবং বনজীবীদের চলাচলের তথ্য সংগ্রহ করে নজরদারির মাধ্যমে উপকূলজুড়ে এখন চরম উদ্বেগ বিরাজ করছে। তাদের ভাষায়, সুন্দরবন আবারও ভয়ংকর পরিস্থিতির দিকে এগোচ্ছে। ১৪ মে সকাল থেকে দুপুরের মধ্যে পশ্চিম সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জের চুনকুড়ি নদীসংলগ্ন সুবদেব খাল, গুবদেব খাল ও ধান্যখালী চর এলাকায় অভিযান চালিয়ে আট বনজীবীকে অস্ত্রের মুখে তুলে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। অপহৃতরা হলেন শ্যামনগর উপজেলার মুন্সীগঞ্জ ইউনিয়নের মীরগাঙ এলাকার বারি তরফদারের ছেলে নজরুল তরফদার, আমির আলী গাজীর ছেলে আব্দুর রহমান, ছোট ভেটখালী এলাকার আব্দুল হামিদ মোড়লের ছেলে আব্দুল আলিম গাজী, একই এলাকার হাবিবুর রহমান, আনোয়ারুল ইসলাম, আব্দুস সাত্তার, শাহিনুর রহমানসহ আটজন বনজীবী।
ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি, অপহরণকারীরা নিজেদের নানা ভাই/ডন বাহিনী ও ছোট জাহাঙ্গীর বাহিনী পরিচয় দেয়। পরে অপহৃতদের পরিবার ও মহাজনদের কাছে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করে মুক্তিপণ দাবি করা হয়। ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর অভিযোগ, প্রত্যেকের মুক্তির জন্য ২০ হাজার থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত মুক্তিপণ দাবি করা হচ্ছে। বিকাশ ও নগদের মাধ্যমে টাকা পাঠাতে চাপ দেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
অপহৃত এক বনজীবীর স্ত্রী কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আমার স্বামী বনে গিয়েছিল সংসারের জন্য। এখন ফোন করে টাকা চায়। টাকা না দিলে মেরে ফেলার হুমকি দিচ্ছে। আমরা গরিব মানুষ, এত টাকা কোথায় পাব।’ শ্যামনগরের গাবুরা এলাকার জেলে রহিম গাজী বলেন, এখন সুন্দরবনে মাছ ধরতে যাওয়া মানে জীবনের ঝুঁকি নেওয়া। কখন কোন খালে দস্যুরা ধরে নিয়ে যাবে সেই ভয় নিয়ে থাকতে হয়। কয়রার মহেশ্বরীপুর এলাকার মৌয়াল রফিকুল ইসলাম বলেন, আগে শুধু অস্ত্রের ভয় ছিল। এখন দস্যুরা মোবাইল ফোনে সব খবর রাখে—কে কোথায় যাচ্ছে, কতজন যাচ্ছে, কার কাছে টাকা আছে, সব জেনে যায়।
স্থানীয় মহাজন আব্দুস সামাদ বলেন, অনেক সময় জেলেদের বাঁচাতে বাধ্য হয়ে টাকা জোগাড় করতে হয়। পরিবারগুলো তাদের কাছে এসে কান্নাকাটি করে। মুক্তিপণ না দিলে মানুষ ফিরে আসে না বলেও জানান তিনি। স্থানীয় বনজীবীদের অভিযোগ, মধু আহরণ মৌসুম শুরুর আগেই দস্যু চক্রগুলো বিভিন্ন এলাকায় অগ্রিম চাঁদা আদায় শুরু করে। টাকা না দিলে বনে ঢুকতে বাধা দেওয়া হয়।
একাধিক বনজীবী জানান, সরকারি বৈধ পাশ নিয়েও বনে গেলে দস্যুদের আলাদা টাকা দিতে হয়। না দিলে ট্রলার আটকে দেওয়া, মারধর ও অপহরণের ঘটনাও ঘটে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ৪ ও ৫ মে সাতক্ষীরা রেঞ্জের চালতেবের খাল, ধান্যখালী খাল, মামুন্দ নদীর মাথাভাঙ্গা খালসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে অন্তত ২০ থেকে ২২ জন জেলে ও মৌয়ালকে অপহরণের অভিযোগ রয়েছে। পরে প্রায় সাত লাখ টাকা মুক্তিপণ দেওয়ার পর তাদের বেশির ভাগ ফিরে এলেও কয়েকজনের খোঁজ মেলেনি বলে অভিযোগ রয়েছে। এর আগে চলতি বছরের মার্চ মাসে তিন বনজীবীকে অপহরণ করে প্রত্যেকের কাছে এক লাখ টাকা করে মুক্তিপণ দাবি করা হয়। জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত অন্তত ডজনখানেক অপহরণের ঘটনা ঘটেছে বলেও স্থানীয়ভাবে জানা গেছে।
জানা যায়, বর্তমানে সুন্দরবনে নানা ভাই/ডন বাহিনী, ছোট জাহাঙ্গীর বাহিনী, আলিম ওরফে আলিফ বাহিনী, করিম শরীফ বাহিনী, ছোট সুমন বাহিনী ও আসাবুর বাহিনীসহ একাধিক দস্যু চক্র সক্রিয় রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, আত্মসমর্পণ করা কিছু সদস্য নতুন করে সংঘবদ্ধ হয়ে আবারও দস্যুতায় জড়িয়ে পড়েছে। সীমান্তবর্তী নদীপথ ব্যবহার করে তারা দ্রুত অবস্থান পরিবর্তন করায় অভিযানেও অনেক সময় তাদের ধরা কঠিন হয়ে পড়ছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী আবুল কাশেম বলেন, উপকূলে ভুয়া পরিচয়ের লোক বেড়ে যাওয়ায় প্রকৃত সাংবাদিকরাও বিব্রত হচ্ছেন। প্রশাসনের বিষয়টি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে তিনি মন্তব্য করেন।
বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড জানিয়েছে, সুন্দরবনে দস্যুতা দমনে নিয়মিত যৌথ অভিযান চলছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় পরিচালিত ‘অপারেশন ম্যানগ্রোভ শিল্ড’-এর আওতায় গত দেড় বছরে ৬০ জনের বেশি দস্যু আটক এবং বিপুল পরিমাণ অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। সুন্দরবন ঘিরে সাতক্ষীরা ও খুলনার উপকূল অঞ্চলের হাজারো পরিবার মাছ ধরা, কাঁকড়া আহরণ ও মধু সংগ্রহের ওপর নির্ভরশীল। দস্যু আতঙ্কে অনেকেই এখন বনে যেতে ভয় পাচ্ছেন, এতে তাদের জীবিকা ও ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে শতশত পরিবার।
কোস্ট গার্ডের এক কর্মকর্তা বলেন, সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত রাখতে নিয়মিত অভিযান, গোয়েন্দা নজরদারি ও টহল জোরদার করা হয়েছে।
বন বিভাগ জানিয়েছে, বনজীবীদের নিরাপত্তায় নিয়মিত টহল ও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। অপহরণ বা দস্যুতার ঘটনায় তথ্য পেলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি বৈধ অনুমতি নিয়ে সতর্কভাবে বনে প্রবেশের আহ্বান জানানো হয়েছে।
শ্যামনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা খালেদুর রহমান বলেন, ভুক্তভোগীদের পক্ষ থেকে অভিযোগ পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিক আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বনজীবীদের নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্বসহকারে দেখা হচ্ছে।