হোম > সারা দেশ > রাজশাহী

বগুড়ার নবাব, রাজা ও সাতানিবাড়ী নামমাত্র মূল্যে বিক্রির অভিযোগ

নব্য জমিদারদের হাতে চলে যাচ্ছে এসব গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক নিদর্শন

সবুর শাহ্ লোটাস, বগুড়া

এক পুরুষে গড়ে ধন, এক পুরুষে খায়— এই কথাগুলো সত্য হতে চলছে বগুড়ায়। বিগত কয়েক বছরে বগুড়ার ঐতিহাসিক নবাববাড়ী মোহাম্মদ আলী প্যালেস, তারপর রাজাবাজারের রাজাবাড়ী, হিন্দুমঠ বিক্রি হয়েছে। এবার বিক্রি হয়ে গেল ঐতিহাসিক সাতানিবাড়ীর একাংশ। অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক প্রভাব ও সিন্ডিকেট দৌরাত্ম্যে দলিল-কারসাজির মাধ্যমে নব্য জমিদারদের হাতে চলে যাচ্ছে বগুড়ার এসব গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক নিদর্শন।

বগুড়ার নবাববাড়ী, রাজাবাড়ী ও সাতানিবাড়ীর অংশবিশেষ মূলত এখন নতুন জমিদারদের হাতে। এই জমিদাররা রাজনৈতিক বলয়ে এবং ক্ষমতার মসনদে থাকা ব্যবসায়ীদের একটি সংঘবদ্ধ দল, গত ১০ বছর ধরে সক্রিয়।

ক্রেতা ও বিক্রেতারা সবাই খুব প্রভাবশালী ও উঁচুতলার মানুষ। এ কারণেই সাতানিবাড়ী বিক্রির কাজটা হয়েছে গোপনে, ১৪ এপ্রিল বা পহেলা বৈশাখ ছুটির দিনে যাতে আইনি প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন না ওঠে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, বগুড়ার ঐতিহাসিক সাতানি জমিদারবাড়ীর প্রভাবশালীদের মধ্যে ছিলেন চারজন মন্ত্রী যাদের নাম মরহুম হাবিবুর রহমান চৌধুরী, ইসমত আরা চৌধুরী ও তার স্বামী এস কে সাদেক এবং মরহুম মামদুদুর রহমান চৌধুরী।

বগুড়া শহরের প্রাণকেন্দ্র সাতমাথার খুব কাছাকাছি অবস্থিত সাতানি জমিদারবাড়ীর একাংশ ৫৭ শতক জমি সাফ কবলা হিসেবে বিক্রি হলো গত ১৪ এপ্রিল। ক্রেতা ও বিক্রেতা দু’পক্ষই খুব গোপনে কেনাবেচার কাজটি সেরেছেন।

বগুড়া সাবরেজিস্ট্রি অফিসের বদলে শাজাহানপুর উপজেলায় দলিল লেখার কাজ করানো হয়েছে। মোট ৫৭ শতাংশ জমি ৪৩ কোটি টাকায় বিক্রি হলেও সরকারি মৌজা ভ্যালু অনুযায়ী রেজিস্ট্রেশন মূল্য দেখানো হয়েছে ৩৫ কোটি টাকা।

নির্ভরযোগ্য সূত্র মতে, সাতানি জমিদারবাড়ীর একাংশের মালিক হিসেবে বাহলুল চৌধুরী, বেহরুজ চৌধুরী, শাহীন আফরোজ চৌধুরীত্রয়ের দেওয়া পাওয়ার অব অ্যাটর্নিমূলে এটি বিক্রি করেছেন নুমান হেফজুর রহমান চৌধুরী। আর মহামূল্যবান এই জমিটি কিনেছে ২২৪ জনের একটি সিন্ডিকেট। যারা ক্রয়কৃত জমিতে বহুতলাবিশিষ্ট প্রজেক্ট করবেন বলে জানা যাচ্ছে। ২২৪ জনের এই ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের মধ্যে রয়েছেন ধনাঢ্য ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ, সরকারি কর্মকর্তা প্রভৃতি।

তবে ক্রেতাদের মধ্যে একজন ওই তথ্য নিশ্চিত করে জানান, সবকিছু বৈধ পন্থায় হয়েছে। জমিদার ও নবাব পরিবারের এই প্রজন্মের কাছে বাপ-দাদার ঐতিহ্য ও গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের চেয়ে নগদ অর্থটাই যেন গুরুত্বপূর্ণ।

রাজাবাজার ও রাজাবাড়ী

সমসাময়িককালে বগুড়ার ঐতিহাসিক রাজাবাজারে অবস্থিত রাজাবাড়ীটিও বিক্রি করে দেন এর সর্বশেষ উত্তরাধিকারী রাজা আবু নাসেহ আরিফ। এ বাজারটি থাকলেও এর ভিতরে মূল্যবান জায়গা বিক্রি করে গড়ে ওঠে অট্টালিকা।

দখল হয়ে গেছে হিন্দুদের মঠও

বগুড়ার ব্যস্ততম দত্ত বাড়িতে ৬০ শতক জমি বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় চেম্বার সভাপতি মাসুদুর রহমান কৌশলে কিনে নেন, সেখানে তোলেন ১০ তলা ভবন। এটি ছিল হিন্দুদের মঠ। জমিটির অধিকাংশ জুড়ে বগুড়া ট্রেড সেন্টার নামে একটি ভবন রয়েছে। বাকি অর্ধেক অংশ এখন ফাঁকা। ব্যবসায়ী ষষ্ঠী-এর দখলে থাকা সিএনজি স্ট্যান্ড রয়েছে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় একটি চক্র বগুড়ার দামি দামি জায়গাগুলো এভাবেই নিজেদের কবজায় নিয়ে নেয়।

বগুড়ায় নবাবের প্যালেস

বগুড়ায় ঐতিহ্যবাহী নবাব এস্টেটের পৌনে চার একর জায়গা এখন প্রভাবশালীদের নিয়ন্ত্রণে। প্রায় দেড়শ’ বছরের পুরোনো শত কোটি টাকা মূল্যের এই সম্পত্তি ব্যক্তিমালিকানা দেখিয়ে বিক্রিও হয়েছে। সর্বশেষ পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী সৈয়দ মোহাম্মদ আলী চৌধুরীর মূল বাড়িটি বিক্রির পর (প্যালেস) ভেঙে ফেলা হয়েছে। জেলা আওয়ামী লীগের একজন প্রভাবশালী নেতা ওই স্থানে বহুতল ভবন নির্মাণ করবেন বলে জানা গেছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ১৮৯০ সালে নবাব ওয়াক্‌ফ এস্টেটের জন্ম। ওয়াক্‌ফ অফিস সূত্র জানিয়েছে, ইসি ৩৬৭৫, ইসি ৩৬৭৫(এ) এবং ইসি ৩৬৭৫(বি) এ তিনটি ওয়াক্‌ফ মিলে বগুড়া নবাব ওয়াক্ফ এস্টেট গঠিত। সাবেক পাকিস্তান ও বর্তমান বাংলাদেশ আমলে প্রতি বছর চাঁদার টাকাও জমা হচ্ছে সরকারি কোষাগারে। সর্বশেষ ২০২০-২১ অর্থবছরে ৩৬৭৫ ইসির বিপরীতে এক হাজার ৬৮২ টাকা জমার বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে।

ওয়াক্ফ নথিতে রয়েছে, ১৮৯০ থেকে শুরু করে ১৯১৪ সাল পর্যন্ত এই এস্টেটের মোতাওয়াল্লি ছিলেন মোহাম্মদ আলীর পিতার নানা (প্রপিতামহ) নবাব সোবহান চৌধুরী। তিনি মারা গেলে ১৯১৪ থেকে ১৯৪৪ সাল পর্যন্ত মোতাওয়াল্লি ছিলেন মোহাম্মদ আলীর পিতা সৈয়দ আলতাফ আলী চৌধুরী। তার মৃত্যুর পর ১৯৪৪ থেকে ১৯৬৩ সাল পর্যন্ত এই এস্টেটের মোতাওয়াল্লি হন সৈয়দ মোহাম্মদ আলী চৌধুরী। তিনি মারা গেলে ১৯৬৩ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত মোতাওয়াল্লি ছিলেন বড় ছেলে সৈয়দ হাম্মাদ আলী চৌধুরী। এরপর ১৯৭০ থেকে ১৯৯৯ পর্যন্ত মোতাওয়াল্লি ছিলেন মোহাম্মদ আলী বৈমাত্রীয় ভাই সৈয়দ ওমর আলী চৌধুরী। সর্বশেষ ১৯৯৯ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত (চলতি) মোতাওয়াল্লি হিসেবে দায়িত্বে রয়েছেন মোহাম্মদ আলীর নাতি সৈয়দ রায়হান আলী চৌধুরী।

বগুড়ার ইতিহাস গবেষকদের ভাষ্য, পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী সৈয়দ মোহাম্মদ আলী চৌধুরীর স্মৃতিবিজড়িত প্রাচীন ঐতিহ্যের সাক্ষী এই ‘নওয়াব প্যালেস’। বগুড়া শহরের সূত্রাপুর মৌজার ১৭০৮ নং দাগে অবস্থিত নবাববাড়ীর মোট সম্পত্তির পরিমাণ তিন একর ৭৫ শতক বা প্রায় ১০ বিঘা। এ সম্পত্তির সবই ধাপে ধাপে বিক্রি হয়েছে। মূল ভবন ছাড়া অন্যান্য জায়গার ওপর ক্রেতারা গড়ে তুলেছেন বহুতল ভবন— টিএমএসএস মহিলা মার্কেট, শরীফ উদ্দিন সুপার মার্কেট ও আল-আমিন কমপ্লেক্স, র‌্যাংগস ভবন, রানার প্লাজা নামের বহুতল বাণিজ্যিক ভবন। এক একর ৫৮ শতক জমির ওপর ছিল সাবেক প্রধানমন্ত্রী সৈয়দ মোহাম্মদ আলী চৌধুরীর মূল প্যালেস ভবন।

বাড়িটির সঙ্গেই রয়েছে তাদের স্বামী-স্ত্রী ও পরিবারের সদস্যদের কবর । রেকর্ড বলছে, ১৮৮৪ সালে নবাব বংশের উত্তরসূরিরা এই বাড়ি নির্মাণ করেছিলেন। তার মানে নবাবদের এ বাড়িটির বয়স ১৩৮ বছর।

এরপরও সরকারি মূল্য হিসেবে স্থাপনাসহ এই বাড়ি বিক্রি দেখানো হয়েছে ২৭ কোটি ৪৫ লাখ সাত হাজার টাকা। এটির ক্রেতা তৎকালীন বগুড়া জেলা আওয়ামী লীগের অর্থ সম্পাদক ও বগুড়া চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মাছুদুর রহমান মিলন, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও শিল্পপতি শফিকুল হাসান জুয়েল এবং আবাসন ব্যবসায়ী আবদুল গফুর।

সূত্র বলছে, ১.৫৫ একর সম্পত্তির মধ্যে আবদুল গফুর ৬২ শতাংশ, শফিকুল হাসান ৬২ শতাংশ এবং মাসুদুর রহমান ৩১ শতাংশের মালিক। ২০১৬ সালের ১৫ এপ্রিল মরহুম মোহাম্মদ আলীর দুই পুত্র সৈয়দ হামদে আলী চৌধুরী ও সৈয়দ হাম্মাদ আলী চৌধুরী ইংল্যান্ড থেকে ঢাকায় এসে বিক্রি দলিলে স্বাক্ষর করেন। দু’দিন পর ১৭ এপ্রিল বগুড়া সদর রেজিস্ট্রি অফিসে গোপনীয়তার সঙ্গে দলিল রেজিস্ট্রি (দলিল নং-৪৩১৮) সম্পন্ন হয়। এছাড়া জমিটি ব্যক্তিগত সম্পত্তি হিসেবে ভূমি অফিস থেকে খারিজ করা ছিল। একই ব্যক্তি পরবর্তী সময়ে প্রশাসনকে ম্যানেজ করে নবাবদের সম্পত্তি ব্যক্তিগত দেখিয়ে নিজ নামে খারিজ করেন।

২০১৬ সালে ব্যক্তিমালিকানার সম্পত্তি দেখিয়ে ‘নওয়াব প্যালেস’ বিক্রির তৎপরতা শুরু হয়। তখন সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় বাড়িটি প্রত্নসম্পদ হিসেবে ঘোষণার কাজ শুরু করে। সেই প্রক্রিয়ার মধ্যেই নওয়াব পরিবারের দুই উত্তরসূরির কাছ থেকে নওয়াব প্যালেস কিনে নেন শহরের তিন ব্যবসায়ী। নওয়াব প্যালেসের এক একর ৫৫ শতাংশ সম্পত্তি ওই তিনজনের নামে দলিল সম্পাদন করা হয়।

এর আগে ২০১৬ সালের মে মাসে নওয়াব প্যালেসকে ‘সংরক্ষিত পুরাকীর্তি’ ঘোষণা করে গেজেট প্রকাশ করে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়। ‘সংরক্ষিত পুরাকীর্তি’ হিসেবে সাইনবোর্ডও টাঙিয়েছিল প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর।

নওয়াব প্যালেস বগুড়ার অমূল্য সম্পদ। এটি কোনোভাবেই বিক্রয়যোগ্য সম্পত্তি নয়। এমন কথা বলেছেন বগুড়ার বেশ কয়েকজন আইনজীবী। তৎকালীন বগুড়া জেলা আওয়ামী লীগের অর্থবিষয়ক সম্পাদক ও বগুড়া চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মাছুদুর রহমান মিলন বর্তমানে পলাতক রয়েছেন।

বগুড়ায় সাতানিবাড়ি, নবাব প্যালেস ও রাজাবাড়ি বিক্রির প্রক্রিয়া অস্বচ্ছ থাকার পরেও এখানকার ঐতিহ্যগুলো আজ হারাতে বসেছে। এ প্রসঙ্গে আমার দেশকে সুশাসনের জন্য প্রশাসন (শুপ্র) কেজিএম ফারুক ইতিহাস চর্চা নিয়ে কাজ করা সাংবাদিক ফজলে রাব্বি ডলার জানান, বগুড়ার ঐতিহ্যগুলো এখন নব্য জমিদারদের হাতে। সচেতন মহলের মতে, প্রশাসনের যথেষ্ট উদাসীনতা রয়েছে বলেই এসব জমি অন্যদের হাতে চলে যাচ্ছে।

মুফতি আমির হামজার বিরুদ্ধে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের নির্দেশ আদালতের

নিখোঁজের এক সপ্তাহ পর সীমান্তে বাংলাদেশির লাশ উদ্ধার

মোটরসাইকেলের ধাক্কায় রূপপুর প্রকল্পের শ্রমিক নিহত

জনগণ কার্ডের সুফল না পেলে আমরাও ‘লাল কার্ড’ বানাব: নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী

জাতীয় নির্বাচনে ছাড় দিয়েছি, স্থানীয় নির্বাচনে নয় : সারজিস আলম

রাজশাহীতে শতাধিক রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের এনসিপিতে যোগদান

বানেশ্বরে উঠতে শুরু করেছে গুটি আম, আশাবাদী চাষি-ব্যবসায়ীরা

ট্রাকের চাকায় পিষ্ট হয়ে মোটরসাইকেল আরোহী নিহত

পত্নীতলায় সড়কের বেহাল দশা, দ্রুত সংস্কারের দাবি স্থানীয়দের

সোনামসজিদ বন্দরে আমদানি বন্ধ, অলস সময় পার করছেন শ্রমিকেরা