সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জে জলাবদ্ধতায় ৮৩৩ হেক্টর জমি এখন অনাবাদি হয়ে পড়েছে। উপজেলার চান্দাইকোনা মৌজার চান্দাইকোনা ইউনিয়নের ছয়টি গ্রামের আবাদি জমি এখন জলাবদ্ধতার কারণে অনাবাদি হয়ে পড়ে আছে।
উপজেলা প্রশাসন ও কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, উপজেলার ধামাইনগর, ধুবিল, সোনাখাড়া, পাঙ্গাসী, নলকা, ঘুড়কা, ধানগড়া, চান্দাইকোনা ও ব্রহ্মগাছা ইউনিয়নের প্রায় ২৪টি এলাকায় প্রতিবছরই জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। কোথাও খাল-নালা ভরাট হয়ে পানিপ্রবাহ বন্ধ হয়ে গেছে, আবার কোথাও অপর্যাপ্ত কালভার্ট এবং অপরিকল্পিত পুকুর খনন ও বসতঘর নির্মাণের কারণে পানি নিষ্কাশনের স্বাভাবিক পথ বাধাগ্রস্ত হয়ে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে।
খাল-নালা ভরাট, অপর্যাপ্ত ব্রিজ-কালভার্ট, অপরিকল্পিত পুকুর খনন এবং প্রয়োজনীয় পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকায় বছরের অধিকাংশ সময়ই বিস্তীর্ণ ফসলি জমিতে পানি জমে থাকে। এতে উপজেলার ৯টি ইউনিয়নের ২৪টি গ্রামের প্রায় ৮৩৩ হেক্টর ফসলি জমি অনাবাদি হয়ে পড়ায় বছরে অন্তত দুই হাজার ৯০০ থেকে তিন হাজার ৩০০ টন ধান উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। সরেজমিন উপজেলার ৯টি ইউনিয়নের ২৪টি গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে, পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি নিষ্কাশনের কোনো ব্যবস্থা না থাকায় বিস্তীর্ণ ফসলি জমির মাঠ জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। এ সব জলাবদ্ধ জমির মধ্যে কিছু এলাকায় বোরো মৌসুমে সামান্য পরিসরে ধান চাষ করা সম্ভব হলেও রোপা আমন আবাদ প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
ধুবিল ইউনিয়নের চকদাদপুর গ্রামের কৃষক আব্দুস সালাম শেখ বলেন, বছরের পর বছর ধরে এ জলাবদ্ধতার সঙ্গে যুদ্ধ করে আমরা ক্লান্ত। জমিতে পানি জমে থাকায় সময়মতো চাষ করা যায় না, ফলে ধার-দেনা করে সংসার চালাতে হচ্ছে। ফসলের বদলে এখন আমাদের জীবনজুড়ে শুধু অনিশ্চয়তা।
সোনাখাড়া এলাকার কৃষক আরিফুল ইসলাম বলেন, ‘আগে এ জমিতে দুইটা ফসল হতো। এখন পানি থাকায় একটা ফসলও ঠিকমতো হয় না। জমি আছে, কিন্তু ফসল নেই এটা আমাদের সবচেয়ে বড় কষ্ট’।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মমিনুল ইসলাম বলেন, রায়গঞ্জের কিছু এলাকায় জলাবদ্ধতা দীর্ঘদিনের সমস্যা। এতে কৃষি উৎপাদনে বড় ধরনের প্রভাব পড়ছে। আমরা মাঠ পর্যায়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি এবং কৃষকদের পরামর্শ দিচ্ছি। তবে স্থায়ী সমাধানের জন্য খাল খনন, ড্রেনেজব্যবস্থার উন্নয়ন ও অবকাঠামোগত উদ্যোগ প্রয়োজন।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবদুল খালেক পাটোয়ারী বলেন, জলাবদ্ধতাপ্রবণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে। ইতোমধ্যে ঘুড়কা ইউনিয়নের নতুনপাড়া এলাকায় উপজেলা প্রশাসন ও গ্রামবাসীর সহযোগিতায় পাইপ লাইন স্থাপনের মাধ্যমে এলাকার বিশ বছরের জলাবদ্ধতা নিরসন করা হয়েছে।
এছাড়া কোথায় খাল খনন, ড্রেন সংস্কার, পাইপলাইন স্থাপন প্রয়োজন তা নির্ধারণ করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। পর্যায়ক্রমে এসব সমস্যার স্থায়ী সমাধানে উদ্যোগ নেওয়া হবে। কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রায়গঞ্জের স্থায়ী জলাবদ্ধতা শুধু মৌসুমি সংকট নয়, এটি দীর্ঘমেয়াদে মাটির উর্বরতা ও কৃষি উৎপাদন কমিয়ে কৃষকের আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি খাদ্য ঘাটতির ঝুঁকি তৈরি করছে এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে চাপ ফেলছে, যার পরোক্ষ প্রভাব দেশের অর্থনীতিতেও পড়তে পারে। স্থানীয়দের মতে, খাল-নালা পুনঃখনন, দখলমুক্তকরণ, পরিকল্পিত ড্রেনেজ ও প্রয়োজনীয় স্থানে পাইপলাইন-কালভার্ট স্থাপন ছাড়া স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয় এবং এ বিষয়ে দ্রুত উদ্যোগ না নিলে প্রতিবছরই কৃষিজমি অনাবাদি থেকে এলাকার অর্থনৈতিক ক্ষতি আরো বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।