পাবনার ঈশ্বরদীতে পদ্মা নদীর ওপর দাঁড়িয়ে আছে লক্কড়ঝক্কড় একটি সেতু। উপজেলার পাকশীর এই ব্রিজ এখন বয়সের ভারে ন্যুব্জ। ১১০ বছর ধরে সেবা দিয়ে গতিশীল রেখেছে উত্তরাঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকা। এবার বিদায়ের পালা, মেরামতে অযোগ্য হতে থাকায় ভেঙে ফেলা হবে সেতুটি। ট্রেন চলাচল অব্যাহত রাখতে নির্মাণ করা হবে নতুন ব্রিজ। ইতোমধ্যে এমন পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে রেলপথ বিভাগ।
ট্রেন চলাচলে শতবর্ষী হার্ডিঞ্জ ব্রিজের ওপর এখন আর আগের মতো ভরসা করা যায় না। ক্রমেই বাড়ছে ঝুঁকি। তাই এ সেতুর পাশেই নতুন রেলসেতু নির্মাণের প্রক্রিয়া চলছে।
রেলওয়ে সূত্র জানায়, নতুন সেতু নির্মাণে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের খসড়া প্রতিবেদন রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের হাতে এসেছে। এতে বলা হয়েছে, পুরোনো ব্রিজের ৩০০ মিটার উত্তরে নতুন সেতু নির্মাণের প্রাথমিক পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। প্রস্তাবিত ব্রিজটি হবে ১ দশমিক ৮ কিলোমিটার দীর্ঘ এবং দুই পাশে থাকবে পাঁচ কিলোমিটার ভায়াডাক্ট (সংযোগ সড়ক)। পুরো প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৯ হাজার ৫৭০ কোটি টাকা। যদিও চূড়ান্ত নকশা ও যাচাই-বাছাইয়ের পর এ ব্যয় কিছুটা কমবেশি হতে পারে।
রেলওয়ের মহাপরিচালক আফজাল হোসেন বলেন, হার্ডিঞ্জ ব্রিজের পাশেই নতুন একটি রেলসেতু হবে। এর সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ চলছে। নতুন করে ডিজাইনসহ সব পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।
জানা গেছে, এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে রেল যোগাযোগ উন্নয়নবিষয়ক একটি কারিগরি সহায়তা প্রকল্পের আওতায় চলছে নতুন ব্রিজের সম্ভাব্যতা যাচাই। ২০২৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি এ কাজের জন্য পরামর্শক নিয়োগ দেয় রেলওয়ে। জাপানের ওসিজি, ফ্রান্সের ইজিআইএস, মালয়েশিয়ার এইচএসএস ও বাংলাদেশের সুদেব কনসাল্ট ইন্টারন্যাশনাল যৌথভাবে কাজটি করছে। এতে পরামর্শ ফি ধরা হয়েছে প্রায় ১৯৩ কোটি ৬৪ লাখ টাকা।
প্রকল্প পরিচালক আবিদুর রহমান বলেন, সম্ভাব্যতা যাচাই এখনো শেষ হয়নি। কাজ চলমান। পরে বিস্তারিত নকশা তৈরি করে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) করা হবে। ডিটেইল ডিজাইন এবং সম্ভাব্যতা সমীক্ষা চূড়ান্ত হলে ডিপিপি তৈরি করা হবে। তারপর ডিপিপি রেলপথ মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হবে। সেখান থেকে সেটি পরিকল্পনা কমিশনে যাবে। এ প্রকল্পের আওতায় ১১টি কার্যক্রমের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা চলছে, যেগুলোর কাজ ২০২৬ সালের জুনে শেষ হবে।
রেলওয়ের প্রকৌশলীরা বলছেন, ১১০ বছরের পুরোনো হার্ডিঞ্জ ব্রিজ দিয়ে বর্তমানে সর্বোচ্চ ২৫ কিলোমিটার গতিতে ট্রেন চলতে পারে। ব্রিজটি রক্ষণাবেক্ষণ করা হলেও এটি এখন সীমিত ক্ষমতায় চলছে। তাই ডুয়েলগেজ ডাবল লাইনের নতুন ব্রিজ নির্মাণ হলে রেল চলাচলে গতি বাড়বে, সেবা থাকবে নিরবচ্ছিন্ন।
একনজরে হার্ডিঞ্জ ব্রিজ
১৯১৫ সালে নির্মিত হার্ডিঞ্জ ব্রিজ শুধু একটি রেলসেতু নয়, এটি ইতিহাসের অংশ। মুক্তিযুদ্ধের সময় ক্ষতিগ্রস্ত হলেও এখনো এর ওপর দিয়ে দৈনিক প্রায় ২৮টি ট্রেন চলাচল করে। এর মধ্যে ১৮টি যাত্রীবাহী এবং ১০টি পণ্যবাহী।
অবিভক্ত ভারতের কলকাতার সঙ্গে আসাম ও ইস্টার্ন বেঙ্গলের যোগাযোগ সহজ করতে ১৮৮৯ সালে পদ্মা নদীর ওপর একটি রেলসেতু নির্মাণের প্রস্তাব দেয় ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ে। দীর্ঘ আলোচনা শেষে ১৯০৮ সালে অনুমোদন পায় প্রকল্পটি। প্রথমে একমুখী লাইনের পরিকল্পনা থাকলেও পরে ডাবল লাইন করা হয়। ১৯১০ সালে শুরু হয়ে ১৯১৫ সালে শেষ হয় নির্মাণকাজ। মোট ব্যয় হয়েছিল চার কোটি ৭৫ লাখ রুপি। প্রথম ট্রেন চলে ১৯১৫ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি। উদ্বোধন করা হয় ওই বছরের ৪ মার্চ।
বর্তমানে রেলওয়ের নিয়মানুযায়ী প্রতি পাঁচ বছরে একবার ব্রিজটি রঙ করা হয় আর তিন বছর পরপর হয় বিয়ারিংয়ের রক্ষণাবেক্ষণ। নিয়মিত মেরামতের মাধ্যমে ট্রেন চলাচল সচল রাখা হলেও ভবিষ্যতের জন্য নতুন ব্রিজের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ঈশ্বরদীর প্রবীণ রাজনীতিবিদ রেল শ্রমিক দলের কেন্দ্রীয় কার্যকরী কমিটির সভাপতি আহসান হাবিব বলেন, নতুন রেলসেতু নির্মাণের সম্ভব্যতা যাচাইয়ের পাকশী ইউনিয়ন পরিষদে অনুষ্ঠিত বৈঠকে আমি ছিলাম। হার্ডিঞ্জ ব্রিজের পাশে নতুন সেতু নির্মাণ করা হলে এ অঞ্চলের মানুষ আরো উপকৃত হবে।
পাবনা-৪ (ঈশ্বরদী-আটঘরিয়া) আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী শিক্ষাবিদ অধ্যাপক আবু তালেব মণ্ডল বলেন, হার্ডিঞ্জ ব্রিজ সেবা দিতে দিতে বয়সের ভারে কুঁজা হয়ে যাচ্ছে। পাশেই আধুনিক মানের নতুন রেলসেতু নির্মাণ করা হলে ঈশ্বরদীসহ আশপাশের মানুষের জীবন-জীবিকায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে, উন্নয়নে আরেকটি মাইলফলক স্পর্শ করবে। প্রকল্পটি দ্রুত বাস্তবায়ন করে ট্রেন চলাচলে গতি বাড়ানো উচিত।