সময়ের সঙ্গে আধুনিক ইফতারির পসরার ভিড়ে হারিয়ে যেতে বসেছে পুরোনো দিনের সব ঐতিহ্যবাহী খাবার। কিন্তু রাজশাহী মহানগরী যেন তার ব্যতিক্রম। সাত দশকের বেশি সময় ধরে এখানে এখনো টিকে আছে স্বাদ আর ঐতিহ্যের অনন্য সংমিশ্রণ।
ইফতারের আয়োজনে স্থানীয়দের কাছে জিলাপি আর ফিরনি মানেই যেন আলাদা এক মাত্রা। আর সেই তালিকায় সবার আগে আসে বাটার মোড়ের নামহীন দোকানের মচমচে ‘জিলাপি’ এবং গণকপাড়া মোড়ের রহমানিয়া হোটেলের মাটির পাত্রের ‘শাহী ফিরনি’। নামহীন, তবু পরিচিতি আকাশছোঁয়া রাজশাহী মহানগরীর বাটার মোড়ে একটি দোকান। নেই কোনো সাইনবোর্ড,
নেই কোনো নাম। কিন্তু ইফতারের সময় ঘনিয়ে এলে ক্রেতাদের পদচারণায় মুখরিত হয়ে ওঠে দোকানের সামনের এলাকা। কড়াইয়ের পর কড়াই জিলাপি ভাজছেন কারিগর সাফাত আলী। তবুও কুলিয়ে উঠতে পারছেন না ক্রেতাদের চাহিদা মেটাতে। কড়াই থেকে সরাসরি দাঁড়িপাল্লায় গিয়ে ক্রেতার হাতে উঠছে গরম গরম জিলাপি।
গত শনিবার বিকেলে জিলাপি কিনতে আসা নগরীর শালবাগানের ব্যবসায়ী শাজাহান মিঞা বলেন, এদের স্বাদের একটা ব্যাপার আছে, ঐতিহ্যও আছে। প্রতিবছর ইফতারের জন্য এখান থেকেই জিলাপি কিনি। আমরা ছোটবেলা থেকে দেখে আসছি, বাবাও এখান থেকে জিলাপি কিনতেন।
দোকানের মালিক শামীম খান জানান, ১৯৫০-এর দশকে তার পিতা সোয়েব উদ্দিন এই ব্যবসা শুরু করেন। তখন দোকানের নাম ছিল ‘রানিবাজার রেস্টুরেন্ট’। এক সময় সেই সাইনবোর্ড নষ্ট হয়ে গেলেও বাটার মোড়ের জিলাপি নামেই পরিচিতি পেয়েছে দোকানটি। প্রথম কারিগর ছিলেন জামিলী সাহা। পরে তার ছেলে কালীপদ সাহা জিলাপি ভাজার দায়িত্ব নেন।
২০১৭ সালে কালীপদ সাহা মারা গেলে তার শিষ্য সাফাত আলী এই ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন। বর্তমানে সোয়েব উদ্দিনের চার ছেলে দোকানটি পরিচালনা করছেন। তাদের একজন হাসিম উদ্দীন বলেন, ভালো মানের উপকরণ আর সততার কারণেই এত বছর ধরে আস্থার সঙ্গে টিকে আছে এই দোকান। রমজানে বিক্রি কয়েকগুণ বেড়ে যায়। প্রতি কেজি জিলাপি বিক্রি হচ্ছে ২২০ টাকায় ।
কারিগর সাফাত আলী জিলাপি ভাজতে ভাজতে বলেন, ওস্তাদ কালীবাবুর কাছ থেকে জিলাপি বানানো শিখেছি। উপকরণ, চিনি, ভাজার পরিমাণ ঠিকঠাক রাখতে হয়। তাহলেই জিলাপিতে একটি আলাদা রঙ আসে, মচমচে ও টসটসে হয়।
মাটির পাত্রে রাজকীয় ফিরনি
বাটার মোড়ের অদূরে গণকপাড়া মোড়ে অবস্থিত রহমানিয়া হোটেল অ্যান্ড রেস্তোরাঁয় মিলে অন্য একরকম ইফতার । ছোট ছোট মাটির পাত্রে সাজানো ‘শাহী ফিরনি’। গরুর খাঁটি দুধ, চালের গুঁড়া, চিনি ও বিভিন্ন ফলের সমন্বয়ে তৈরি এই ফিরনির যাত্রা শুরু ১৯৫২ সালে। হোটেলের প্রতিষ্ঠাতা আনিছুর রহমান খান এই ফিরনি চালু করেন। দাদার মৃত্যুর পর তার বাবা আবদুল বারি খান এবং বর্তমানে নাতি রিয়াজ আহাম্মেদ খান এই ব্যবসার দেখাশোনা করছেন।
রিয়াজ আহাম্মেদ জানান, শুরুতে এক বাটি ফিরনির দাম ছিল মাত্র চার আনা। এখন তার দাম ৩৫ টাকা হলেও মান ও পরিমাণে কোনো আপস করেন না তারা। প্রতিটি বাটিতে ১০০ গ্রাম করে ফিরনি দেওয়ার এই নিয়ম আজও অটুট। তিনি বলেন, এখন এটা শুধু ব্যবসা নয়, এটা আমাদের দাদার স্মৃতি ও ঐতিহ্য। বাপ-দাদার শুরু করা ফিরনি এখনো চালু রেখেছি। কারণ, এটি এখন একটা ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে। রমজান মাসে আমরা প্রতিদিন প্রায় এক হাজার বাটি পর্যন্ত ফিরনি বিক্রি করে থাকি।
প্রায় ২০ বছর ধরে এই ফিরনি কিনছেন আসাদুজ্জামান। তিনি বলেন, ইফতারের আয়োজনে এই ফিরনি না থাকলে যেন কিছুই হয় না। স্বাদ ও ঐতিহ্যের জন্যই আমরা এটা কিনি। এখনকার জেনারেশনের অনেকেই হয়তো নতুন সব খাবার কিনতে পছন্দ করে, কিন্তু আমাদের মতো বয়োজ্যেষ্ঠদের কাছে এই ফিরনির গুরুত্ব আলাদা।
নগরীর আলুপট্টি এলাকার বাসিন্দা জয়নাল আবেদিন দুই পাত্র ফিরনি কিনলেন। তিনি বলেন, আরো অনেক কিছু কেনা হয়েছে। কিন্তু ইফতারে ফিরনির একটা আলাদা মূল্য আছে আমার কাছে।
সাত দশকের বেশি সময় পেরিয়েও রাজশাহীর ইফতার সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে আছে বাটার মোড়ের জিলাপি ও রহমানিয়ার শাহী ফিরনি। শনিবার বিকেল থেকে শুরু হওয়া এই দুই দোকানে ক্রেতাদের ভিড় প্রমাণ করে, শহরের বুকে আজও অটুট আছে এই ঐতিহ্যের স্বাদ। আধুনিকতার ভিড়ে পুরোনোরা হারিয়ে গেলেও রাজশাহীতে আজও টিকে আছে স্বাদ আর ঐতিহ্যের এই মেলবন্ধন।