কোরবানির ঈদ ঘিরে পদ্মা নদী দিয়ে ঢুকছে ভারতীয় গরু। রাত গভীর হলেই সীমান্তপথে বেড়ে যায় চোরাকারবারিদের দৌরাত্ম্য। ভারতীয় গরু লাভজনক হওয়ায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পদ্মা পেরিয়ে সীমান্ত দিয়ে ভারতে ঢুকে পড়ছে চোরাকারবারিরা। গরু আনতে গিয়ে কেউ বিজিবি-বিএসএফের হাতে আটক হচ্ছে, কেউ নিহত হচ্ছে, অনেকে হচ্ছে চিরতরে পঙ্গু। এর পরও বন্ধ হচ্ছে না গরু চোরাচালান। গরু চোরাচালান বন্ধ না হওয়ায় আতঙ্কে রয়েছেন খামারিরা। এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন জেলার শীর্ষ ব্যবসায়ী ও স্থানীয় সংসদ সদস্য।
এদিকে সীমান্তে অবৈধ অনুপ্রবেশ, চোরাচালান ও আন্তঃসীমান্ত অপরাধ দমনে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করছে।
গত শনিবার বিকেলে সোর্সের মাধ্যমে খবর আসে অর্ধশত ভারতীয় গরুর চালান ঢুকবে সীমান্তপথে। খবর পেয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্তের কাছাকাছি একটি দুর্গম চর থেকে দেখা যায়, গভীর রাতে আনাগোনা বাড়তে থাকে গরু চোরাচালান চক্রের নিয়োগ করা লাইনম্যানদের। তাদের গ্রিন সিগন্যাল পেয়েই রাখালেরা একে একে গরু নিয়ে আসতে থাকে বাংলাদেশি ভূখণ্ডে, যার কিছু চিত্র ধরা পড়ে ক্যামেরায়। এ সময় চোখে পড়েনি সীমান্ত সুরক্ষার দায়িত্বে থাকা একজন বিজিবি সদস্যকেও। এভাবেই নির্বিঘ্নে গরু পার করে গন্তব্যে পৌঁছে দিচ্ছে রাখালেরা। তবে মাঝেমধ্যে দু-একটি গরুর চালান আটক করতে দেখা গেছে বিজিবি সদস্যদের পাঠানো ফুটেজে।
সীমান্তপথে অবাধে গরু আসায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন খামারিরা। তারা বলছেন, ঈদুল আজহায় বিক্রির জন্য ধারদেনা, এমনকি ব্যাংকঋণ নিয়ে গরু লালন-পালন করছেন তারা। গোখাদ্যের দাম বাড়ায় খরচ বেড়েছে দ্বিগুণ। জেলায় চাহিদার তুলনায় পর্যাপ্ত উদ্বৃত্ত পশু থাকার পরও ভারত থেকে চোরাই পথে গরু আসায় এবং গোখাদ্য ও পরিচর্যা খরচ বেড়ে যাওয়ায় লোকসানের শঙ্কায় পড়েছেন তারা। চোরাই পথে আসা ভারতীয় গরু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সামনেই বিক্রি হচ্ছে হাটবাজারে। এর পরেও ব্যবস্থা নিচ্ছে না প্রশাসন। গরু চোরাচালান বন্ধ না হলে পথে বসতে হবে স্থানীয় খামারিদের।
শিবগঞ্জ উপজেলার আটরশিয়া গ্রামের ক্ষুদ্র খামারি পলাশ উদ্দিন জানান, সব পুঁজি খাটিয়ে তিনি খামারটি গড়ে তুলেছেন। কিন্তু ভারত থেকে গরু আসার খবরে তিনি চরম আতঙ্কে রয়েছেন।
একই উপজেলার কালুপুর গ্রামের জাহিদ হাসান জানান, তিনটি গরু হাটে নামিয়েও তিনি আশানুরূপ দাম পাননি। পরিচর্যা ও গোখাদ্যের দাম বাড়লেও ক্রেতারা যে দাম বলছেন, তাতে তিনটি গরুতে তার ৩০ হাজার টাকা লোকসান হবে। এ পরিস্থিতির জন্য তিনি চোরাই পথে আসা ভারতীয় গরুকে দায়ী করেন।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ ডেইরি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মুনজের আলম মানিক বলেন, করোনার পর থেকেই লোকসান করে খামার টিকিয়ে রেখেছিলেন জেলার খামারিরা। এবার ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন নিয়ে বাড়ে খামারের সংখ্যা। তবে ভারতীয় গরুতে কৃষকের স্বপ্ন ফিকে হতে বসেছে। তিনি খামারিদের বাঁচাতে সরকারকে দ্রুত উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানান।
৫৩ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল কাজী মোস্তাফিজুর রহমান টেলিফোনে দাবি করেন, সীমান্ত দিয়ে বিচ্ছিন্নভাবে কিছু গরু রাতের অন্ধকারে এলেও সেগুলো জব্দ করা হচ্ছে।
ভারতীয় গরু চোরাচালান বেড়ে যাওয়ায় সম্প্রতি আইনশৃঙ্খলা কমিটির মাসিক সভায় চরম উদ্বেগ প্রকাশ করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেন স্থানীয় সংসদ সদস্য নূরুল ইসলাম বুলবুল।