হোম > সারা দেশ > রংপুর

জ্বালানি সংকট ও লোডশেডিংয়ে বিপর্যস্ত রংপুরের জনজীবন

বাদশাহ ওসমানী, রংপুর

জ্বালানি তেল ও বিদ্যুতের তীব্র সংকটে রংপুর অঞ্চলের জনজীবন কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। লোডশেডিং বেড়ে যাওয়ায় শিল্প উৎপাদন ব্যাহত, কৃষিতে সেচ বন্ধের উপক্রম, পরিবহন খাত অচল এবং শিক্ষার্থীদের পড়ালেখা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে থাকায় বাড়ছে অপরাধ প্রবণতাও, যা স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।

বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ জানান, একদিকে জ্বালানি তেলের সংকট, অন্যদিকে বিদ্যুতের বিপর্যয়। এ দুই কারণে কৃষিনির্ভর উত্তরাঞ্চলে মহাবিপর্যয় নেমে এসেছে। বিদ্যুৎ ও তেলের সংকটের কারণে সেচ পাম্পগুলো চালাতে পারছেন না তারা। ফলে ইরি-বোরো মৌসুমেও ঠিকমতো চাষ করা সম্ভব হচ্ছে না। পাশাপাশি রবিশস্য ও ভুট্টাক্ষেতেও পানি সেচ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। আবার কিছু ক্ষেতে ধান পাকতে শুরু করেছে। সেই জমিগুলোতে পর্যাপ্ত পানির দরকার। কিন্তু একই কারণে সেখানেও পানি সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। এ কারণে ধানক্ষেতে ফলন ভালো দেখা গেলেও শিষে চিটা বেশি দেখা যাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবে না বলে কৃষকেরা আশঙ্কা করছেন।

শিল্প খাতে ইতোমধ্যে এর নেতিবাচক প্রভাব স্পষ্ট। নীলফামারীর উত্তরা ইপিজেড, গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জসহ দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়, লালমনিরহাট ও রংপুরের বিসিক শিল্পনগরীগুলোতে ছোট, মাঝারি ও বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। উদ্যোক্তারা বলছেন, শ্রমিকদের কর্মঘণ্টা ঠিক থাকলেও ঠিকমতো উৎপাদন না হওয়ায় অর্থনৈতিক সংকটে পড়ছেন প্রতিষ্ঠানের মালিক ও ব্যবসায়ীরা।

কারখানা মালিকেরা বলছেন, প্রতিষ্ঠান ও বাসাবাড়ি বন্ধক রেখে ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে আমরা ছোট ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করেছি। উৎপাদন যা-ই হোক, শ্রমিকদের পাওনা দিতেই হবে। কিন্তু জ্বালানি তেলের এই সংকট এবং লোডশেডিং চলতে থাকলে আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধই হয়ে যাবে। সে ক্ষেত্রে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি শ্রমিকেরাও বেকার হয়ে পড়বেন। তাই সরকারের উচিত দ্রুত জ্বালানি তেলের সংকট কাটিয়ে বিদ্যুতের সরবরাহ ঠিক রাখার ব্যবস্থা করা।

বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকেরা জানান, চলমান এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার সময় বিদ্যুদ্বিভ্রাটে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা করতে পারছে না। ঠিকমতো পড়ালেখা করতে না পারার প্রভাব পরীক্ষার রেজাল্টে পড়বে বলে তারা মতামত ব্যক্ত করেন। অনেক পরীক্ষার্থী গরমে কেন্দ্রে অসুস্থ হয়ে পড়ছে বলেও জানা গেছে।

অটোরিকশা ও চার্জার ভ্যানচালকেরা অভিযোগ করে বলেন, আমরা যারা চার্জার ভ্যান অথবা অটোরিকশা চালিয়ে পরিবার চালাই, অব্যাহত লোডশেডিংয়ের কারণে তারাও বিপাকে পড়েছি। ভ্যান অথবা অটোরিকশায় চার থেকে ছয় ঘণ্টা চার্জ দিতে হয়। অথচ ২৪ ঘণ্টা মিলে বিদ্যুৎই পাওয়া যাচ্ছে চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা। ফলে যাদের উপার্জন পুরোপুরি এর ওপর নির্ভরশীল, তারা খুব কষ্টে দিন কাটাচ্ছে।

রংপুর অঞ্চলের তেলের পাম্পগুলো ঘুরে দেখা যায়, বেশির ভাগ পাম্প সপ্তাহে তিন থেকে চার দিন বন্ধ থাকছে। যে দু-তিন দিন তেল দেওয়া হয়ে থাকে, সেখানেও উপচেপড়া ভিড়। অনেক পাম্পে দেখা দেখা গেছে তেল দেওয়া শুরুর আগেই দেড় থেকে দুই কিলোমিটার পর্যন্ত মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন ধরনের যানবাহনের দীর্ঘ লাইন। যারা তেল পাচ্ছেন, তা-ও আবার চাহিদার তুলনায় অপর্যাপ্ত। চাহিদামতো তেল না পাওয়ায় অনেক পাম্পে গ্রাহক-মালিকদের মধ্যে বাগ্‌বিতণ্ডা, মারামারি ও ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটেছে।

হিমাগার মালিকেরা জানান, হিমাগারে রাখা আলুসহ অন্যান্য সবজি সব সময় ঠান্ডা রাখতে মেশিনগুলো ২৪ ঘণ্টা চালিয়ে রাখতে হয়। লোডশেডিং হলে আমরা জ্বালানি তেল দিয়ে এসব মেশিন চালাতাম। কিন্তু জেনারেটর চালাতে যে পরিমাণ তেলের দরকার, সে পরিমাণ তেল আমরা পাচ্ছি না। ফলে জেনারেটরগুলো ২৪ ঘণ্টা চালিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। সে ক্ষেত্রে কোল্ড স্টোরে রক্ষিত কৃষকের আলু পচে যাওয়া আশঙ্কা রয়েছে বলে তারা জানান।

রংপুর অঞ্চলের বিদ্যুৎ বিভাগের কয়েকজন নির্বাহী প্রকৌশলী নাম প্রকাশ না করার শর্তে আমার দেশকে বলেন, সরকার বলছেন সারা দেশে জ্বালানি তেলের কোনো সংকট নেই। কিন্তু বাস্তবে তেল সংকটের কারণে বিদ্যুতের বেশিরভাগ কেন্দ্র বন্ধ হয়ে গেছে। বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ ও ঠাকুরগাঁও বিদ্যুৎকেন্দ্রের কারণে কিছুটা হলেও এই অঞ্চলে চার-পাঁচ ঘণ্টা বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে। অতি দ্রুত চলমান এই জ্বালানি সংকট দূর করতে না পারলে বিদ্যুৎ নিয়ে হাহাকার দেখা দেবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জ্বালানি তেল সংকটের কারণে সবকিছুতেই এর ব্যাপক প্রভাব পড়েছে। যদিও বিষয়টি আন্তর্জাতিক সমস্যা। তাই শুধু মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভর করলে হবে না। জ্বালানি তেলের বিকল্প পথ খুঁজে দ্রুত সমাধান করতে হবে। এই সমস্যার সমাধান করতে না পারলে বর্তমান সরকারকে চরম মূল্য দিতে হবে।

পিডিবির জেনারেল ম্যানেজার আশরাফ উদ্দিন খান বলেন, জ্বালানি তেলের সংকটের কারণে বিদ্যুতের অনেক উৎপাদনকেন্দ্র বন্ধ হয়ে গেছে। সরকারের উচিত দ্রুত বন্ধ কেন্দ্রগুলো চালু করার ব্যবস্থা নেওয়া। জ্বালানি সংকট দূর করতে না পারলে গ্রাহকের বিদ্যুৎ সরবরাহ করা কঠিন হয়ে পড়বে।

রংপুর চেম্বারের পরিচালক ব্যবসায়ী প্রণয় কুমার আমার দেশকে বলেন, জ্বালানি তেলের সংকট ও মূল্যবৃদ্ধির কারণে এর প্রভাব পড়েছে মালামাল পরিবহন থেকে শুরু করে সবকিছুতে। এখন ব্যবসায়ীদের প্রতিটি পণ্যের দাম বাড়াতে হচ্ছে। বিপাকে পড়ছেন ক্রেতারা। পাশাপাশি বিদ্যুতের তীব্র সংকটের কারণে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। সরকারের উচিত বিকল্প ব্যবস্থা নিয়ে দ্রুত সব সমস্যার সমাধান করার।

এ বিষয়ে রংপুর জেলা প্রশাসক ও বিভাগীয় কমিশনারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

সৈয়দপুরে বিহারি ক্যাম্পে ৬৬ কোটি টাকার বিদ্যুৎ বিল বকেয়া

পীরগঞ্জ-তারাগঞ্জের মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তাকে শোকজ

নীলফামারীতে ট্রাকের ধাক্কায় স্কুলছাত্রী নিহত

নীলফামারীতে জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সপ্তাহ শুরু

গাইবান্ধায় নারীসহ দুইজনের লাশ উদ্ধার

বাংলাবান্ধা স্থলবন্দরে ডলারসহ ভারতীয় নাগরিক আটক

দুই বছরের শিশুর মৃত্যু নাকি হত্যাকাণ্ড: এক সপ্তাহেও কাটেনি ধোঁয়াশা

‘মানুষ বিক্রির হাটে’ টিকে থাকার সংগ্রাম

পাবর্তীপুরে পার্টনার কংগ্রেস অনুষ্ঠিত

১১ বছরে ৬৬ কোটি টাকার বিদ্যুৎ বিল বকেয়া