আজ পহেলা বৈশাখ, বাংলা ভাষাভাষী মানুষের জীবনে একটি ঐতিহাসিক ও ঐতিহ্যবাহী দিন। এই দিনকে ঘিরে দেশের বিভিন্ন স্থানে উৎসবের আমেজ থাকলেও কুড়িগ্রামের চরাঞ্চলে নেই ছিটেফোঁটাও। চরাঞ্চলের অধিকাংশ মানুষই জানে না কবে পহেলা বৈশাখ। দুই-একজন জানলেও বাস্তব জীবনের চরম কশাঘাতে বৈশাখের আনন্দ তাদের কাছে ম্লান। প্রতিমুহূর্ত প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ করে যাদের বেঁচে থাকতে হয়, পহেলা বৈশাখের সাময়িক আনন্দ তাদের কাছে চরম বিলাসিতা ছাড়া কিছুই না।
কুড়িগ্রামের রাজিবপুর, রৌমারী, চিলমারী ও উলিপুরের বিভিন্ন চর ঘুরে দেখা যায়, চরাঞ্চলের মানুষেরা তাদের দৈনন্দিন কাজ নিয়ে ব্যস্ত। পহেলা বৈশাখের আগমনী উৎসব নিয়ে তাদের সামান্যতম পরিকল্পনা নেই। নতুন জামা কেনা, পান্তা-ইলিশ খাওয়া কিংবা মেলার আয়োজন করার মতো দুঃসাহস তাদের নেই। অনেকের ইচ্ছা থাকলে অভাব-অনটনের কারণে তা সম্ভব হয়ে ওঠে না।
চিলমারীর কড়াই বড়িশাল চরের বাসিন্দা জাহিদুল ইসলাম অভিমত প্রকাশ করেন, ‘চরের অধিকাংশ মানুষ দিন আনে দিন খায়। পহেলা বৈশাখের আয়োজন করা আমাদের পক্ষে সম্ভব না। বৈশাখ ধনীদের জন্য, আমাদের মতো গরিব মানুষের জন্য না।’
রৌমারীর ধোনারচরের বাসিন্দা নাসিমা বেগম বলেন, ‘আমরা তো জানিই না পহেলা বৈশাখ কবে, তবে স্কুল বন্ধ দেওয়ার কারণে ছেলে-মেয়েরা জানতে পারে। তারা নতুন জামা চায়, মেলায় ঘুরতে যেতে চায়, কিন্তু আমাদের তো সে সাধ্য নেই ‘
নদীময় কুড়িগ্রামের প্রায় ৪০০ চরের বাসিন্দারা যুগ যুগ ধরে সব ধরনের মৌলিক চাহিদা থেকে বঞ্চিত। বন্যা, নদীভাঙনে প্রতি বছর হারাতে হচ্ছে ভিটেমাটি ও ফসলি জমি। চরম দারিদ্র্যের আঘাতে বৈশাখী মেলা কিংবা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে পারে না তারা। শহরে শোভাযাত্রা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, মেলার আয়োজন থাকলেও যোগাযোগব্যবস্থা অনুন্নত হওয়ার কারণে সেখানেও অংশ নিতে পারে না। ফলে বৈশাখের আনন্দ থেকে তারা বঞ্চিতই থেকে যাচ্ছে।
বৈশাখের শোভাযাত্রা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, পান্তা-ইলিশ খাওয়া, নতুন জামা কেনার সাধ্য না থাকলেও বছরের সমস্ত দেনা পরিশোধ করার জন্য মহাজনের হালখাতা ঠিকই করতে হয়। হালখাতা না করলে পরবর্তীতে মহাজনেরা আর বাকি দেবেন না। এজন্য অল্প দামে খেতের ফসল বিক্রি, আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে ধারদেনা কিংবা চরা সুদের ওপর টাকা নিয়ে মহাজনের হালখাতা করে দায়মুক্ত হয় তারা।
অষ্টমীর চরের স্কুলশিক্ষক রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘চরের মানুষ শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিনোদনসহ সব দিক থেকেই বঞ্চিত। পহেলা বৈশাখ বাঙালি সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হওয়া সত্ত্বেও চরের ছেলে-মেয়েরা বৈশাখের কোনো আনন্দই উপভোগ করতে পারে না। সরকারিভাবে শহরে পহেলা বৈশাখ উদ্যাপনে নানা কর্মসূচি হাতে নেওয়া হলেও চরের মানুষের জন্য থাকে না কোনো আয়োজন। এমন বৈষম্য থাকা উচিত নয়।’
কুড়িগ্রাম সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ললিতকলার সভাপতি রফিকুল হায়দার বলেন, পহেলা বৈশাখ আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এটি শুধু একটি মাসের শুরু নয়, বাংলা ভাষার ঐতিহ্য। ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে প্রতিটি এলাকায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা সব শ্রেণির মানুষ যাতে বৈশাখের আনন্দে মেতে উঠতে পারে, এ জন্য প্রশাসনকে দায়িত্ব নেওয়া প্রয়োজন। তাহলেই সম্প্রীতির বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব।