নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও হাটবাজার ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ‘গ্রেনেট বাবু’র বিরুদ্ধে হাটের সরকারি খাস জমি দখল করে হোটেল, অফিস রুম, বসার রুম নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে।
হাটবাজার উন্নয়নের অর্থ দিয়ে পুকুর পাড় ভরাটের নামে টিভি রুম, কবুতর খামার ও পুকুর দখলে নেন। টিভি রুম ও বসার ঘরটি আড্ডাখানায় পরিণত হয়েছে।
ইউনিয়ন ভূমি অফিস সূত্র জানায়, কিশোরগঞ্জ প্রধান বাজারের ১ নম্বর খাস খতিয়ানে ৬৭ দাগে মোট জমি ২ একর ৬৩ শতাংশ। সড়ক সংলগ্ন ১৫ শতাংশ জমি ও ২৫ শতক পুকুর দখল করেছেন ইউপি চেয়ারম্যান। স্থানীয়রা জানান, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে লাঙ্গল প্রতীকে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। এরপর রাতের অন্ধকারে ও অফিস বন্ধের দিন এসব স্থাপনা নির্মাণ করে খাস জমি দখলে নেন।
এছাড়া পুকুর পাড়ে গাউডওয়াল নির্মাণ ও মাটি ভরাটের নামে কবুতর খামার, টিভি রুম, বসার রুম নির্মাণ করে। তিনি পুকুরটি লিজ নিয়েছেন বলে জনগণের মাঝে প্রচার চালান। স্থানীয়রা আরও জানান, ওই স্থানটি সন্ধ্যা হলে মাদকের আড্ডাখানায় পরিণত হয়। শতক ৩০ লাখ টাকা মূল্যে চেয়ারম্যানের দখলকৃত জমির দাম প্রায় ১২ কোটি টাকা।
এদিকে গত ১৪ মে নীলফামারী-৪ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল মুনতাকিম, সংরক্ষিত মহিলা সংসদ সদস্য বিলকিস ইসলাম, উপজেলা নির্বাহী অফিসার আরিফুর রহমান ও অফিসার ইনচার্জ লুৎফর রহমানসহ আইনশৃঙ্খলা কমিটির সদস্য, রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের সমন্বয়ে হাটের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা আনতে উচ্ছেদ অভিযানে গেলে চেয়ারম্যানের সরকারি জমি দখলের চিত্রটি ফুটে ওঠে। এ সময় চেয়ারম্যান উপস্থিতদের সঙ্গে তর্কে জড়ান এবং জমিগুলো তার বলে দাবি করেন। এ সময় সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য বিলকিস ইসলাম প্রশাসনকে নির্দেশ দেন, যাদের দখলেই সরকারি জমি রয়েছে সব অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে কিশোরগঞ্জ বাজারকে পরিকল্পিত বাজারে রুপ দেওয়ার।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, হাট বাজার উন্নয়ন অর্থে ২০২৩-২৪ অর্থ বছরে ‘কিশোরগঞ্জ হাট-বাজার সংলগ্ন গরুহাটি পুকুর পাড়ে ও গরু হাটীর বিভিন্ন স্থানে মাটি ভরাটকরণ’ ও ‘কিশোরগঞ্জ হাট বাজার সংলগ্ন পুকুর পাড়ে দক্ষিণ পাশে গাউড ওয়াল নির্মাণ’ এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ‘কিশোরগঞ্জ হাটবাজার সংলগ্ন গরুহাটিতে মাটি ভরাট ও গরুহাটি সংলগ্ন পুকুর পাড়ে প্যালাসাইডিংয়ের পাশে মাটি ভরাট’ নামে তিনটি প্রকল্পে ৫ লাখ ৫৭ হাজার ৮০০ টাকা ব্যয়ে চেয়ারম্যান হোটেলের রান্না ঘর, টিভি রুম, বসার ঘর ও কবুতর খামার করেছেন।
কিশোরগঞ্জ ইউনিয়ন ভূমি অফিসের ভূমি উপসহকারী কর্মকর্তা আফতাব আলম বলেন, ‘কিশোরগঞ্জ বাজারের জমিতে চেয়ারম্যানসহ কিছু প্রভাবশালী অবৈধ স্থাপনা করে কোটি কোটি টাকার সরকারি জমি দখল করেছেন। এসব অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে আমরা কাজ করছি’।
উপজেলা ভূমি অফিসের সার্ভেয়ার মিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘কিশোরগঞ্জ বাজারের খাস খতিয়ানের ৬৭ দাগে স্থাপনা ও পুকুরসহ প্রায় ৪০ শতাংশ জমি চেয়ারম্যানের দখলে রয়েছে। অবৈধ স্থাপনা কতগুলো আছে তা উচ্ছেদে তদন্ত চলমান রয়েছে।
এনসিপির উপজেলা সমন্বয়ক আব্দুল কাইয়ুম বলেন, রক্ষকই যখন ভক্ষক। চেয়ারম্যান সাহেব হাটবাজার ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি হয়ে তিনিই হাটবাজারের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা না করে হাটের কয়েক কোটি টাকার জমি দখল করেছেন।
বিএনপির সাধারণ সম্পাদক একেএম তাজুল ইসলাম ডালিম বলেন, অভিযোগের প্রেক্ষিতে সংসদ সদস্যদ্বয়, ইউএনও, ওসিসহ আমরা রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ সরেজমিন পরিদর্শন করে অবৈধ দখলের সত্যতা পেয়েছি। আমরা প্রশাসনের কাছে দাবি করেছি, চেয়ারম্যানের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ, পুকুর দখলসহ সব অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে হাটটিকে আধুনিক হাটে পরিণত করার।
কিশোরগঞ্জ সদর ইউপির চেয়ারম্যান হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী গ্রেনেট বাবু সরকারি জমি দখলে থাকার বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, ‘সরকারের প্রয়োজন হলে ছেড়ে দেব। শুধু আমার দখলে নয়, অনেকের দখলে হাটের জমি রয়েছে। সব অবৈধ দখল প্রশাসন উচ্ছেদ করলে আমিও জমি ছেড়ে দেব। পুকুর পাড় ভেঙে পড়েছিল, তখন ভাঙন রোধে প্রকল্প নিয়ে কাজ করা হয়েছে।’
উপজেলা নির্বাহী অফিসার আরিফুর রহমান বলেন, ‘কিশোরগঞ্জ বাজারে অবৈধ দখলদারদের চিহ্নিত করে আইনিভাবে উচ্ছেদ অভিযান প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। সরকারি অর্থ ব্যবহার করে পুকুর পাড়ে মাটি ভরাট ও গাইডওয়াল নির্মাণের নামে চেয়ারম্যান খাস জমিতে কবুতর খামার, হোটেলের রান্না ঘর, টিভি রুম, বসার রুম করেছেন বলে যে অভিযোগ উঠেছে, তা আমরা খতিয়ে দেখছি।’
এমএইচ