শেয়ারবাজারে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের স্বার্থরক্ষায় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের শেয়ার বিক্রিতে নির্ধারিত সময় পর্যন্ত ‘লক-ইন’ রাখা হয়। লক-ইন থাকাকালীন শেয়ার বিক্রি করা যায় না। গত রোববার পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) আইপিও বিধিমালার যে খসড়া প্রকাশ করেছে, তাতে লক-ইন পদ্ধতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে। বিদ্যমান বিধিমালায় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের ৫০ শতাংশ শেয়ার বিক্রিতে ৯০ দিনের লক-ইন থাকলেও খসড়া বিধিমালায় তা পুরোপুরি তুলে দেওয়া হয়েছে। এর ফলে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা লেনদেন শুরুর প্রথম দিনেই ৫০ শতাংশ শেয়ার বিক্রির বড় ধরনের সুযোগ পাচ্ছে।
৫০ শতাংশ শেয়ার বিক্রিতে কোনো ধরনের লক-ইন না থাকার কারণে শেয়ারবাজারে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আইপিও বিধিমালা অনুযায়ী, বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে শেয়ারের দর নির্ধারণের বিষয়টি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল। ইস্যুয়ার কোম্পানির প্রাইস ডিসকভারি, রোড শো ভ্যালুয়েশন এবং বিডিং ও চূড়ান্ত দর নির্ধারণের তিনটি ধাপেই প্রধান ভূমিকায় থাকবে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা। এখন প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের বরাদ্দকৃত শেয়ারের ৫০ শতাংশে কোনো লক-ইন না থাকার কারণে বেশি দরে বিডিং করলেও প্রথম দিনেই বেশি দরে বিক্রি করে মুনাফা তুলে নেওয়ার সুযোগ থাকছে। এ কারণে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে শেয়ারের মূল্য নির্ধারণে ‘যথাযথ আচরণে’ ঘাটতি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স বিভাগের অধ্যাপক ও পুঁজিবাজার বিশেষজ্ঞ ড. মাহমুদ ওসমান ইমাম আমার দেশকে বলেন, পুঁজিবাজারে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর শেয়ারে অবশ্যই লক-ইন থাকতে হবে। বিশ্বের উন্নত পুঁজিবাজারেও লক-ইন রয়েছে। লক-ইনের মেয়াদ ছয় থেকে ১২ মাস পর্যন্ত রয়েছে। আমাদের দেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে লক-ইনের মেয়াদ আরো বেশি হতে পারে। আমাদের দেশে যেহেতু প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের সক্ষমতা কম, সেক্ষেত্রে লক-ইনের মেয়াদ কম হতে পারে। কিন্তু তাই বলে ৫০ শতাংশ শেয়ারে কোনো ধরনের লক-ইন থাকবে না, এটা হতে পারে না। লক-ইন না থাকার কারণে শেয়ারের মূল্য কারসাজির সুযোগ থাকবে এবং এতে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন বলে মন্তব্য করেন তিনি। অতীতে লক-ইন না থাকার সুযোগ নেওয়ার ঘটনা ঘটেছে এবং এতে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। আবার একই ঘটনা ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
বিদ্যমান আইপিও বিধিমালা প্রণয়নে ওসমান মাহমুদ একজন বিশেষজ্ঞ পরামর্শক হিসেবে কাজ করেছিলেন।
ঢাকা ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের ট্রেডিং বিধিমালা অনুযায়ী, শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়া কোম্পানির লেনদেন শুরুর প্রথম দুদিন শেয়ারের কোনো মূল্যসীমা নেই। ২০২১ সালের ১৭ জুন বিএসইসি এক নির্দেশনার মাধ্যমে নতুন কোম্পানির জন্যও সার্কিট ব্রেকার আরোপ করে। সার্কিট ব্রেকার অনুযায়ী একটি কোম্পানির শেয়ারের দর আগের দিনের তুলনায় সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ ওঠানামা করতে পারবে। কিন্তু মাসুদ খানের নেতৃত্বে গঠিত কমিশন সার্কিট ব্রেকারের বিষয়েটি স্টক এক্সচেঞ্জের ওপর ছেড়ে দিয়েছে। ফলে নতুন তালিকাভুক্ত কোম্পানির লেনদেনে সার্কিট ব্রেকার প্রযোজ্য হবে কি না, সেটি এখনো স্পষ্ট নয়।
এ বিষয়ে সিএসইর প্রধান নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা (সিআরও) মোহাম্মদ মাহাদি হাসান আমার দেশকে বলেন, বিএসইসি সার্কিট ব্রেকারের বিষয়টি স্টক এক্সচেঞ্জের ওপর ছেড়ে দিয়েছে। কিন্তু এতদিন নতুন কোনো কোম্পানি বাজারে না আসার কারণে এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। এখন যেহেতু নতুন আইপিও বিধিমালা হচ্ছে, সেজন্য শিগগির দুই স্টক এক্সচেঞ্জ এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে।
এখন যদি আগের মতো প্রথম দিনে কোনো মূল্যসীমা না রাখা হয়, তাহলে প্রথম দিনেই প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা তাদের শেয়ার বিক্রি করে বাজার থেকে বড় ধরনের মুনাফা তুলে নেওয়ার সুযোগ পাবেন।
দেশের পুঁজিবাজারে নতুন কোম্পানি তালিকাভুক্তির পর প্রথম দিনে দুই থেকে তিনগুণ দরে শেয়ার লেনদেনের নজির রয়েছে।
অবশ্য খসড়া বিধিমালায় ৫০ শতাংশ শেয়ারে লক-ইন না রাখা হলেও বাকি ৫০ শতাংশে তা রাখা হয়েছে। তবে আগের থেকে মেয়াদ অর্ধেকে নামিয়ে আনা হয়েছে।
২০২৫ সালের বিধিমালা অনুযায়ী, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের বরাদ্দ করা শেয়ারের ৫০ শতাংশ ৯০ দিন, ২৫ শতাংশ ১২০ দিন এবং অবশিষ্ট ২৫ শতাংশ ১৮০ দিন লক-ইনে থাকবে। প্রস্তাবিত সংশোধনীতে ৫০ শতাংশ শেয়ারে লক-ইন থাকবে না। ২৫ শতাংশ শেয়ারে ৬০ দিন এবং বাকি ২৫ শতাংশ শেয়ারে ৯০ দিনের লক-ইন রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।
লক-ইনের বিষয়ে প্রাইম ব্যাংক সিকিউরিটিজের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মনিরুজ্জামান বলেন, ৫০ শতাংশ শেয়ারের ক্ষেত্রে লক-ইন রাখা হয়েছে, এটা যথেষ্ট। প্রথম দিনে শেয়ার বিক্রির সুযোগ থাকার ফলে শেয়ারের সরবরাহ থাকবে এবং বাজারে তারল্য প্রবাহও বাড়বে। লক-ইনের কারণে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের তারল্য আটকে থাকার কারণে তাদের বিনিয়োগের সক্ষমতা কমে যায়। বিক্রির সুবিধা থাকার কারণে তাদের বিনিয়োগের সক্ষমতা বাড়বে।
শেয়ারের দাম নির্ধারণে কারসাজির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ডাচ অকশন পদ্ধতিতে শেয়ারের বরাদ্দ (প্রতিষ্ঠান যে দরে বিড করবে, সেই দরে কিনতে হবে) হবে। বিধায় এ ধরনের সুযোগ থাকবে না। এছাড়া ইস্যুয়ার কোম্পানির আয়ের সঙ্গে সংগতি রেখেই শেয়ারের দর নির্ধারণ করা হয় বলে মত প্রকাশ করেন তিনি।
এদিকে, খসড়া বিধিমালায় বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের শেয়ার বরাদ্দের কোটা আগের ৪০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩৫ শতাংশ করা হয়েছে। তবে ফিক্সড প্রাইস মেথডে আগের মতো ১০ শতাংশ কোটা রাখা হয়েছে। তবে উভয় পদ্ধতিতে মিউচুয়াল ফান্ডের জন্য ১০ শতাংশ কোটা বহাল রাখা হয়েছে।