নতুন শুল্কারোপের শঙ্কা
বাংলাদেশ, ভারত ও চীনসহ কয়েকটি দেশের বিরুদ্ধে বাণিজ্য তদন্ত শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ আদালতে বাতিল হওয়ার পর বাণিজ্যিক অংশীদারদের বিরুদ্ধে নতুন করে তদন্ত শুরু করেছে মার্কিন প্রশাসন। এ পদক্ষেপের মাধ্যমে বিদেশি দেশগুলোর তথাকথিত ‘অন্যায্য বাণিজ্যচর্চা’ যাচাই করে তাদের পণ্যের ওপর নতুন আমদানি শুল্কারোপের আইনি ভিত্তি তৈরি করতে চাইছে ওয়াশিংটন। স্থানীয় সময় গত বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি দপ্তর এ তদন্তের ঘোষণা দেয়।
বাণিজ্য বিশ্লেষকদের মতে, যদি এ তদন্তে কোনো দেশের বিরুদ্ধে ‘অন্যায্য বাণিজ্যচর্চা’র প্রমাণ পাওয়া যায়, তবে সে দেশের পণ্যের ওপর বড় অঙ্কের আমদানি শুল্কারোপ করার সুযোগ পাবেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।
বিবিসির এক প্রতিবেদনে মার্কিন কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, তদন্তের মূল লক্ষ্য বিভিন্ন দেশের উৎপাদন খাতে ‘কাঠামোগত অতিরিক্ত সক্ষমতা’ এবং সংশ্লিষ্ট নীতিগত কার্যক্রম পর্যালোচনা করা। তাদের ধারণা, কিছু দেশ নিজেদের অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা আন্তর্জাতিক বাজারে ঠেলে দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের শিল্প খাতের ওপর চাপ তৈরি করছে।
দেশটির বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার জানান, ১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইনের সেকশন ৩০১-এর আওতায় এ অনুসন্ধান পরিচালিত হবে। তদন্তে কোনো দেশের বিরুদ্ধে বৈষম্যমূলক বা অযৌক্তিক বাণিজ্য নীতি প্রমাণ হলে যুক্তরাষ্ট্র সে দেশের পণ্যের ওপর অতিরিক্ত আমদানি শুল্কারোপ করতে পারবে।
এ তদন্তের আওতায় থাকা দেশগুলোর তালিকায় রয়েছে—বাংলাদেশ, চীন, ভারত, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, মেক্সিকো, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, কম্বোডিয়া, সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া, সুইজারল্যান্ড এবং নরওয়ে। পাশাপাশি ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো আঞ্চলিক জোটকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম বড় বাণিজ্যিক অংশীদার কানাডাকে এ তালিকার বাইরে রাখা হয়েছে।
ধারণা করা হচ্ছে, তদন্ত শেষ হলে আগামী গ্রীষ্মের মধ্যেই কয়েকটি দেশের ওপর নতুন শুল্কারোপের ঘোষণা আসতে পারে। বিশেষ করে চীন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ভারত, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও মেক্সিকোর মতো অর্থনীতিগুলোকে লক্ষ্য করে ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন মার্কিন কর্মকর্তারা।
এ পদক্ষেপের পেছনে রয়েছে কয়েক সপ্তাহ আগে দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টের একটি গুরুত্বপূর্ণ রায়। গত বছরের এপ্রিলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পণ্যের ওপর ১০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্পারোপের নির্দেশ দিয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। তবে আদালত ওই সিদ্ধান্তকে অবৈধ ঘোষণা করে জানায়, ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের ইন্টারন্যাশনাল ইমার্জেন্সি ইকোনমিক পাওয়ারস অ্যাক্ট (আইইইপিএ) প্রয়োগ করে ওই শুল্কারোপ করেছিলেন। কিন্তু আইনটি প্রেসিডেন্টকে এ ধরনের শুল্কারোপের ক্ষমতা দেয় না। সংবিধান অনুযায়ী এ ক্ষমতা মূলত কংগ্রেসের হাতে। সুপ্রিম কোর্টের রায়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জরুরি ক্ষমতা প্রয়োগ করে ঢালাও শুল্কারোপের ক্ষমতা সীমিত করা হয়েছে।
সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি জন রবার্টস রায়ে বলেন, শুল্কারোপের মতো বড় সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে হলে প্রেসিডেন্টকে অবশ্যই কংগ্রেসের স্পষ্ট অনুমোদন দেখাতে হবে। আন্তর্জাতিক জরুরি অর্থনৈতিক ক্ষমতা আইন ব্যবহার করে একতরফাভাবে শুল্ক বসানোর চেষ্টা কর্তৃত্বের সীমা অতিক্রম করেছে।
এ রায়ের পরপরই ট্রাম্প নতুন করে ১০ শতাংশ বৈশ্বিক শুল্কারোপের ঘোষণা দেন এবং ভবিষ্যতে তা ১৫ শতাংশে উন্নীত করার সম্ভাবনার কথাও জানান। প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ফেব্রুয়ারির শেষে আরোপ করা অস্থায়ী শুল্কের মেয়াদ আগামী জুলাইয়ে শেষ হওয়ার কথা। তার আগেই চলমান বাণিজ্য তদন্ত সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে।
পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান আমার দেশকে বলেন, উৎপাদন খাতে ‘কাঠামোগত অতিরিক্ত সক্ষমতা’ ও অতিরিক্ত উৎপাদন করা হচ্ছে কি না, তার বাণিজ্য তদন্ত শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এ তদন্তে বাংলাদেশের নাম আসাটা অস্বস্তির। তবে এটিকে বড় ধরনের ঝুঁকি হিসেবে দেখার প্রয়োজন নেই। কারণ যুক্তরাষ্ট্র যেসব বিষয়ে তদন্ত প্রক্রিয়া চালাবে, তার অনেক কিছু আমরা ইতোমধ্যে সমাধানের পথে আছি।
তিনি বলেন, এখানে দেশের উৎপাদন খাতে মেধাস্বত্ব ব্যবহারের পরিসর এখনো খুব সীমিত, পাশাপাশি মার্কিন ব্র্যান্ডের পণ্যের বাজারও তুলনামূলকভাবে ছোট। শ্রম অধিকারসংক্রান্ত বিষয়গুলোও ইতোমধ্যে সমাধান করা হয়েছে। রপ্তানিতে যে নগদ সহায়তা দেওয়া হয়, তার পরিমাণও খুব বেশি নয়। কৃষি খাতে ভর্তুকি নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে বটে, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র নিজেও কৃষিতে ব্যাপক সহায়তা দিয়ে থাকে। আমাদের ক্ষেত্রে মূলত সারের ওপরই সরকারি সহায়তা সীমাবদ্ধ রয়েছে।
তালিকায় বাংলাদেশের নাম আসাটা যৌক্তিক মনে করেন না জানিয়ে মাহমুদ হাসান খান বলেন, যুক্তরাষ্ট্র সম্ভবত তাদের নিজস্ব শিল্প খাতকে সুরক্ষা দেওয়ার লক্ষ্য থেকেই এমন তদন্ত শুরু করেছে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় ভোক্তা বাজার হওয়ায় দেশটি নিজেদের উৎপাদনকে শক্তিশালী করতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রপ্তানির প্রধান অংশই তৈরি পোশাক, আর এ ধরনের পোশাক উৎপাদনে মার্কিন ব্যবসায়ীরা সাধারণত আগ্রহী নন বলে জানান তিনি।
বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক ও ডেনিম এক্সপার্টের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল আমার দেশকে বলেন, যেহেতু তদন্ত প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশের নাম এসেছে, তাই আগাম প্রস্তুতি নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। এক্ষেত্রে সরকারের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে পর্যবেক্ষণ করতে হবে, যাতে প্রয়োজনীয় কৌশল গ্রহণের মাধ্যমে সম্ভাব্য পরিস্থিতি কার্যকরভাবে সামাল দেওয়া যায়। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শিগগির একটি ফলপ্রসূ আলোচনার মাধ্যমে এ পরিস্থিতি সামাল দিতে হবে। কোনোভাবেই যেন আমাদের ওপর ১৯ শতাংশের বেশি শুল্কারোপ না হয়।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, নতুন অনুসন্ধান মূলত ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য শুল্কারোপের একটি শক্তিশালী আইনি হাতিয়ার তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে এটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য অংশীদারদের ওপর চাপ বাড়ানোর কৌশল হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
এদিকে, উত্তেজনাপূর্ণ এ পরিস্থিতির মধ্যেই চলতি সপ্তাহের শেষদিকে প্যারিসে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের মধ্যে বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। ওই আলোচনা মার্চের শেষদিকে বেইজিংয়ে ট্রাম্প ও চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সম্ভাব্য বৈঠকের জন্য একটি কূটনৈতিক ভিত্তি তৈরি করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এ তদন্তের ফলাফল বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় নতুন অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে উন্নয়নশীল অর্থনীতিগুলোর জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য শুল্কনীতি ভবিষ্যতে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।