দেশের বাজেট ইতিহাসে ২০২৬-২৭ অর্থবছর বিশেষ অধ্যায় হয়ে থাকছে। কারণ মাত্র তিন বছরের ব্যবধানে দেশ দেখেছে তিন সরকারের তিন ধরনের বাজেট। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ছিল ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ বাজেট, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে অন্তর্বর্তী সরকারের সংকোচনমুখী বাজেট এবং এবার ২০২৬-২৭ অর্থবছরে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকারের প্রথম বাজেট।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতায় বড় পরিবর্তন আসে। প্রায় দেড় বছর দায়িত্ব পালন করে অন্তর্বর্তী সরকার। এরপর ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেয় বিএনপি। সরকার গঠনের কয়েক মাসের মধ্যেই দলটির শীর্ষ নেতা তারেক রহমানের রাজনৈতিক নেতৃত্বে জাতীয় সংসদে প্রথম বাজেট উপস্থাপন করেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
আওয়ামী লীগের শেষ বাজেট
২০২৪-২৫ অর্থবছরে আওয়ামী লীগ সরকার সাত লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকার জাতীয় বাজেট পাস করে, যা ছিল দলটির শেষ বাজেট। তৎকালীন অর্থমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলীর উপস্থাপিত এই বাজেটে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য ধরা হয় পাঁচ লাখ ৪১ হাজার কোটি টাকা এবং অনুদান ছাড়া ঘাটতি নির্ধারণ করা হয় দুই লাখ ৫৬ হাজার কোটি টাকা। ঘাটতি মেটাতে বৈদেশিক উৎস থেকে এক লাখ ২৭ হাজার ২০০ কোটি টাকা এবং অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে এক লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়। ঋণের সুদ পরিশোধে বরাদ্দ রাখা হয়েছিল এক লাখ ১৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। এ বাজেটে উন্নয়ন ব্যয় ধরা হয়েছিল দুই লাখ ৮১ হাজার ৪৫০ কোটি টাকা। তবে বাজেট বাস্তবায়নের সময় উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ডলার সংকট, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা ও ঋণের চাপ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার।
তারেক রহমানের নেতৃত্বে প্রথম বাজেট
গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট উপস্থাপন করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এটি তারেক রহমানের রাজনৈতিক নেতৃত্বে প্রণীত বিএনপি সরকারের প্রথম জাতীয় বাজেট। আওয়ামী লীগের শেষ বাজেটের তুলনায় এবারের বাজেটের আকার প্রায় এক লাখ ৪১ হাজার কোটি টাকা বেশি। আর অন্তর্বর্তী সরকারের বাজেটের তুলনায় বৃদ্ধি প্রায় এক লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা।
অর্থনৈতিক বাস্তবতার পার্থক্য
পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময়ে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির বেশ কয়েকটি সূচকে অবনতি দেখা যায়। তথ্য অনুযায়ী, বিএনপির নেতৃত্বে ২০০৫-০৬ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ছয় দশমিক ৭৮ শতাংশ, যা আওয়ামী লীগের শেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তিন দশমিক ৪৯ শতাংশে নেমে আসে। তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকারের প্রথম জাতীয় বাজেটে জিডিপির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ছয় দশমিক পাঁচ শতাংশ। প্রস্তাবিত ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেটে জিডিপি ধরা হয়েছে ৬৮ লাখ ৩০ হাজার ২৪ কোটি টাকা।
বিএনপির নেতৃত্বে ২০০৫-০৬ অর্থবছরে সাধারণ মূল্যস্ফীতি ছিল সাত দশমিক ১৭ শতাংশ। সেখান থেকে বেড়ে হাসিনার পালিয়ে যাওয়ার সময় ২০২৪ সালের জুলাইয়ে মূল্যস্ফীতি ১১ দশমিক ৬৬ শতাংশে পৌঁছায়। আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাজেট প্রস্তাবনায় মূল্যস্ফীতি কমিয়ে সাত দশমিক পাঁচ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে তারেক রহমানের সরকার।
হাসিনার সম্পদের অসম বণ্টন ব্যবস্থা, সুশাসনের অভাব ও দুর্নীতির কারণে অর্থনৈতিক বৈষম্য বেড়েছে। ২০০৫ সালে আয়ভিত্তিক জিনি কোফিশিয়েন্ট ছিল শূন্য দশমিক ৪৬৭, যা বৃদ্ধি পেয়ে ২০২২ সালের সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী শূন্য দশমিক ৪৯-এ পৌঁছেছে। রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত নিম্নপর্যায়ে রয়ে গেছে; এখনো তা আট শতাংশের কাছাকাছি অবস্থান করছে। কর-জিডিপি অনুপাত ছয় দশমিক আট শতাংশ, যা দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বনিম্ন।
ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার ২০০৫ সালের ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশে পৌঁছেছে। একই সঙ্গে বৈদেশিক ঋণ এক লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা থেকে বেড়ে প্রায় আট লাখ ১২ হাজার কোটি টাকায় এবং অভ্যন্তরীণ ঋণ ৬৫ হাজার কোটি টাকা থেকে ১০ লাখ ৭৭ হাজার কোটি টাকায় হয়েছে। এছাড়া সুদ পরিশোধের ব্যয়, ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন এবং বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে যাওয়ায় আওয়ামী লীগের রেখে যাওয়া ভঙ্গুর অর্থনীতির অবস্থা বলে গণ্য করা হয়।