হোম > বাণিজ্য > বাজার বিশ্লেষণ

অকালবন্যায় বোরো বিপর্যয়, চালের বাজারে চাপের শঙ্কা

গাজী শাহনেওয়াজ

ছবি: সংগৃহীত

দেশের মানুষের প্রধান খাদ্যশস্য বোরো ধানের উৎপাদনে এবার বড় বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। হাওরাঞ্চলে আকস্মিক বন্যা ও উজানের ঢলে তলিয়ে গেছে হাজার হাজার একর জমির ধান। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের দাবি, গত বছরের তুলনায় অনেক এলাকায় এবার অর্ধেকেরও কম ফলন পাওয়া গেছে। অকাল বন্যার এই বোরো বিপর্যয়ের কারণে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও চালের বাজারে নতুন করে বড় ধরনের চাপের শঙ্কা দেখা দিয়েছে। স্থানীয় কৃষক, কৃষি বিভাগ ও খাদ্য কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে এ উদ্বেগজনক চিত্র পাওয়া গেছে।

প্রাপ্ত তথ্যমতে, বোরো, আমন ও আউশ এ তিন মৌসুমের মধ্যে বোরো থেকে সবচেয়ে বেশি চাল পেয়ে থাকে সরকার। যার পরিমাণ মোট চাহিদার ৫২ দশমিক ৪৬ শতাংশ। আমন ও আউশ থেকে যথাক্রমে আসে ৩৯ দশমিক ৯০ ও আট শতাংশ চাল।

পরিসংখ্যান বলছে, গত বছর যে জমিতে কৃষকের আড়াই হাজার টন ধান উৎপাদন হয়েছিল। এ বছর বন্যার কারণে তা নেমে ৯০০ থেকে এক হাজার টনে দাঁড়িয়েছে। ঘরে তোলা এসব ধানও মানসম্মত নয়। এই আকস্মিক ক্ষতিতে স্থানীয় কৃষকরা বড় ধরনের অর্থনৈতিক সংকটের মুখে পড়েছে।

তবে কৃষি মন্ত্রণালয় ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এসব পরিসংখ্যান মানতে নারাজ। তাদের দাবি, ক্ষতি তত বেশি হয়নি। মোট চাহিদার ১০ থেকে ১২ শতাংশ ক্ষতি হতে পারে। তবে কৃষি বিভাগের মাঠপর্যায়ের তথ্যে কৃষকের বাস্তব চিত্র উঠে এসেছে। মাঠ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কিছু এলাকায় আগাম কাটা সম্ভব হলেও যেসব এলাকায় ধান পাকতে দেরি হয়েছে সেখানে ১৫ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে খাদ্য মন্ত্রণালয় বলছে, এত কিছুর পরও দেশে খাদ্য সংকট দেখা দেবে না। তারা বলছে, বিকল্পভাবে হাওরের ওই ঘাটতি পূরণ করা হবে। কৃষি অর্থনীতিবিদদের মতে, ক্ষতির প্রকৃত পরিমাণ নির্ভর করবে শেষ পর্যন্ত মোট সংগ্রহ কত হয় তার ওপর।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক (মনিটরিং) আবু জাফর আল মুনছুর আমার দেশকে বলেন, চলতি বছরে সরকারের লক্ষ্যমাত্রা চার কোটি ৪১ লাখ টন। এর মধ্যে বোরো ধানের লক্ষ্যমাত্রা দুই কোটি ২৭ লাখ টন, আমন এক কোটি ৪৮ লাখ টন এবং আউশ ধানের লক্ষ্যমাত্রা ২৭ লাখ ৯৪ হাজার টন। অতীত অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে এ কর্মকর্তা আরো বলেন, চাতালমালিকদের ওপর নির্ভর না করে সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে ধান কেনা হলে সরকারের মজুত আরো বাড়বে।

এদিকে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সংগ্রহ ও সরবরাহ অনুবিভাগের উপসচিব আরিফুল ইসলাম আমার দেশকে জানান, খাদ্যের মজুত বাড়াতে ১৯ লাখ টন খাদ্যশস্য কেনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে কৃষকদের কাছ থেকে পাঁচ লাখ টন ধান সংগ্রহের সিদ্ধান্ত হয়েছে। এছাড়া মিল মালিকদের কাছ থেকে ১২ লাখ টন সিদ্ধ চাল এবং এক লাখ টন আতপ চাল কেনা হবে। এর বাইরে রয়েছে ৫০ হাজার টন গম। বর্তমানে সরকারের মজুত রয়েছে ১৭ লাখ এক হাজার ৯৭৫ টন।

প্রাপ্ত তথ্যমতে, চলতি বছরে সিদ্ধ চাল ও আতপ চাল সংগ্রহের সময় ধরা হয়েছে ১৫ মে থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত এবং গম ও ধান ৩ মে থেকে ৩১ আগস্ট। তবে গত ১৮ মে পর্যন্ত সংগ্রহ হয়েছে সিদ্ধ চাল ১৮ হাজার ৬৭৯ টন এবং আতপ ৫০৩ টন। এছাড়া গম সংগ্রহ না হলেও ধান সংগ্রহ হয়েছে তিন হাজার ৬৫০ টন। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার থেকে ক্রয়ে পিছিয়ে সরকার।

এদিকে, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, দেশের হাওর অধ্যুষিত সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, ময়মনসিংহ ও সিলেট অঞ্চলে মোট বোরো উৎপাদনের একটি বড় অংশ উৎপাদিত হয়। বিশেষ করে সুনামগঞ্জ ও কিশোরগঞ্জকে দেশের ‘ধানের ভাণ্ডার’ বলা হয়। সেই হাওরাঞ্চলে এবার চরম বিপর্যয় হয়েছে। ডিএই বলছে, দেশের মোট চাল চাহিদার প্রায় ৫২ শতাংশই আসে বোরো থেকে। চলতি বছর বোরো উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২ কোটি ২৭ লাখ টন।

কৃষি অর্থনীতিবিদ জাহাঙ্গীর আলম আমার দেশকে বলেন, দেশে কয়েক লাখ টন ধানের ঘাটতি তৈরি হলে সরকারকে আমদানির ওপর নির্ভর করতে হবে। অতীতে এমন পরিস্থিতিতে সরকার ভারত, ভিয়েতনাম, মিয়ানমার ও পাকিস্তান থেকে চাল আমদানি করেছে। একই সঙ্গে ওএমএস, খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি ও সরকারি গুদামের মজুত ব্যবস্থাপনা জোরদার করা হয়।

এই অর্থনীতিবিদ আরো বলেন, দেশের খাদ্য নিরাপত্তা এখনো তাৎক্ষণিক সংকটে না পড়লেও বোরো উৎপাদনের বড় ঘাটতি থেকে চালের বাজারে চাপ বাড়বে। কারণ, দেশের বার্ষিক খাদ্য চাহিদার বড় অংশই বোরো ধান থেকে পূরণ হয়। সাধারণ হিসাবে দেশে উৎপাদিত বোরো চাল দিয়ে প্রায় ছয় থেকে সাত মাসের খাদ্য চাহিদা মেটানো হয়। ফলে হাওরের ক্ষতি দীর্ঘমেয়াদে বাজারে প্রভাব ফেলতে পারে।

খাদ্য ঘাটতি বিষয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞদের মতে, বৈশ্বিক বাজার অস্থিতিশীল থাকলে আমদানি ব্যয় বেড়ে যায় এবং এর প্রভাব পড়ে খুচরা বাজারে। এতে নিম্নআয়ের মানুষের ওপর চাপ বাড়ে। তারা বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হাওরাঞ্চলের ঝুঁকি বাড়ছে। তাই শুধু ক্ষতিপূরণ নয়, হাওরাঞ্চলের জন্য ‘বন্যা বা জলমগ্নতা-সহনশীল জাত’ ব্যবহার করা যেতে পারে।

খাদ্য পরিকল্পনা ও তদারকি ইউনিটের (এফপিএমইউ) পরিচালক গবেষক মোস্তফা ফারুক আল বান্না আমার দেশকে জানান, সরকার আমন, বোরো ও আউশ এ তিন মৌসুমে চাল আমদানির অনুমতি দেয় না। তবে সমস্যা তৈরি হয় ধানের অন্তর্বর্তী সময়ে বা অফ-সিজনে। এ সুযোগে নিজেদের আখের গোছাতে অসাধু কিছু ব্যবসায়ী বাজারে চালের কৃত্রিম সংকট দেখিয়ে দাম বাড়িয়ে দেন। সংকট কাটাতে সে সময়ে সরকার বেসরকারি ব্যবসায়ীদের চাল আমদানির অনুমোদন দেয়। পাশাপাশি সরকারের মজুত থেকে ওএমএস ও খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির আওতায় ট্রাকসেলের মাধ্যমে চাল বিক্রি শুরু করা হয়। ফলে অল্প কয়েকদিনের মধ্যে বাজারে চালের সরবরাহ স্বাভাবিক হয়ে আসে।

এদিকে, হাওরাঞ্চলের কৃষকদের অভিযোগ, উৎপাদন খরচ বেড়ে গেলেও বাজারে ধানের দাম অনেক ক্ষেত্রেই বাড়েনি। অথচ সার, সেচ, শ্রমিক ও যন্ত্র খরচ বৃদ্ধির কারণে প্রতি মণ ধানের উৎপাদন ব্যয় অনেকখানি বেড়েছে। এর ফলে মৌসুমের শুরুতে অনেক এলাকায় কৃষককে কম দামে ধান বিক্রি করতে হয়েছে। এতে লাভ তো দূরের কথা, অনেক কৃষক মূলধন তুলতেই হিমশিম খাচ্ছেন।

কিশোরগঞ্জের নিকলী উপজেলার সিংপুর ইউনিয়নের কৃষক জুলহাস উদ্দিন আমার দেশকে বলেন, ডুবি হাওরে নিজ জমির সঙ্গে বর্গা নিয়ে ৫০ একর জমিতে বোরো আবাদ করেন তিনি। বর্গা নেওয়া ৪০ একর জমিতে একরপ্রতি প্রায় ৩০ হাজার টাকা দিতে হয়েছে। গতবার যেখানে লাভ হয়েছিল ১৮ লাখ টাকা; এবার ক্ষতি ১৫ লাখ টাকা। নেত্রকোনার খালিয়াজুরীর চাকুয়া ইউনিয়নের উচাকান্দা এলাকার হাজী আব্দুর রাজ্জাক ভূঁইয়া আমার দেশকে বলেন, গত বছর ৩৫ একর জমিতে প্রায় তিন হাজার মণ ধান পেয়েছিলাম। পাহাড়ি ঢল ও বন্যার কারণে এবার দুই হাজার মণ কম পেয়েছি। যা-ও পেয়েছি, সে ধানও শুকানো যায়নি।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মনিটরিং বিভাগের পরিচালক কৃষিবিদ ওবায়দুর রহমান মণ্ডল আমার দেশকে বলেন, হাওরাঞ্চলে ক্ষতি হলেও সার্বিক উৎপাদন পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। যেসব এলাকায় ক্ষতি হয়েছে, সেখানে কৃষকদের পুনর্বাসনে সরকার কাজ করছে। এবার ক্ষতির পরিমাণ দুই লাখ তিন হাজার টন। তবে তিনি বলেন, এরপরও দেশে খাদ্য সংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়নি। সরকারি মজুত, আমদানি সক্ষমতা ও বাজার তদারকি জোরদার করা হচ্ছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, কৃষককে টিকিয়ে রাখতে হলে শুধু প্রণোদনা নয়, ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করাও জরুরি। তারা বলছেন, হাওরাঞ্চলে ধান কাটার সময় আকস্মিক বন্যা এখন প্রায় নিয়মিত ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে। ফলে কৃষি বিমা, আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা ও দ্রুত ফসল কাটার অবকাঠামো ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে এই সংকট মোকাবিলা কঠিন হবে।

রাজধানীতে মুরগির দাম বাড়তি, চালের দামেও অস্বস্তি

কমেছে ডিম ও সবজির দাম, স্থিতিশীল চালের বাজার

স্বর্ণের দামে বড় পতন, ভরিতে কমল কত

ইরানের ওপর গুলি-বোমা হামলার হুমকি, বিশ্ববাজারে ফের বাড়ল তেলের দাম

হরমুজ খুলে দেওয়ায় ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াবে তেলের বাজার: আইইএ

বিশ্ববাজারে তেলের দাম ৩ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন, ব্যারেল ৮০ ডলার

আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দামে বড় পতন

রাজধানীর বাজারে প্রচুর ফল, ক্রেতা কম

ঈদের ছুটিতে ক্রেতা নেই, কমেছে পণ্যের চাহিদা

স্বর্ণবাজারে ধস, দুই মাসে সর্বনিম্নে দাম