রাজধানীর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল (ঢামেক) থেকে অপহৃত দুই বছরের শিশুকে ঘিরে দেশজুড়ে চাঞ্চল্যকর ঘটনায় অবশেষে বড় অগ্রগতি এসেছে। মুক্তিপণের উদ্দেশ্যে সংঘটিত এ অপহরণকাণ্ডে জড়িত আরো এক জন পলাতক আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব)।
র্যাব-৯ ও র্যাব-১০ এর যৌথ অভিযানে সোমবার (২৩ মার্চ ২০২৬) ভোররাতে হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ এলাকা থেকে শাহনেওয়াজ চৌধুরী বাপ্পারাজ (৩০) নামের ওই আসামিকে আটক করা হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি, এই গ্রেফতারের মাধ্যমে একটি সংঘবদ্ধ অপহরণ ও মুক্তিপণ চক্রের গুরুত্বপূর্ণ সূত্র পাওয়া গেছে এবং ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্যদের শনাক্তে অভিযান জোরদার করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, রাজধানীর ব্যস্ততম চিকিৎসাকেন্দ্র ঢামেক হাসপাতালকে টার্গেট করে একটি চক্র দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় থাকতে পারে—এমন সন্দেহও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ঘটনাটি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়েছে, যেখানে অনেকেই হাসপাতালের নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
ঘটনার পটভূমি
মামলার বিবরণ অনুযায়ী, কুমিল্লার সদর দক্ষিণ থানার বাসিন্দা মাজহারুল ইসলামের দুই বছর বয়সী ছেলে কাজী ফুজাইল গত ২১ মার্চ দুপুরে ঢামেক হাসপাতাল থেকে নিখোঁজ হয়। শিশুটির দাদা হাফেজ মাওলানা নাসির উদ্দিনকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে ভর্তি করা হলে পরিবারের সদস্যরা তাকে দেখতে যান।
দুপুর আড়াইটার দিকে হঠাৎ করেই শিশুটিকে খুঁজে পাওয়া যায় না। পরিবারের সদস্যরা হাসপাতালের কার্ডিওলজি বিভাগসহ আশপাশের বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি করেও ব্যর্থ হন। এর কিছুক্ষণ পর অজ্ঞাত ব্যক্তি ফোন করে জানায়, শিশুটি তাদের কাছে আছে এবং তাকে ফেরত পেতে হলে ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা মুক্তিপণ দিতে হবে। প্রথমে বিকাশের মাধ্যমে ৫০ হাজার টাকা পাঠানোর নির্দেশও দেওয়া হয়।
এ ঘটনায় শিশুটির বাবা বাদী হয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ-এর শাহবাগ থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা দায়ের করেন।
র্যাবের অভিযান ও গ্রেপ্তার
ঘটনার পরপরই র্যাব ছায়া তদন্ত শুরু করে এবং গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করে। প্রযুক্তিগত তথ্য ও গোপন সংবাদের ভিত্তিতে সোমবার রাত দেড়টার দিকে হবিগঞ্জ জেলার শায়েস্তাগঞ্জ থানার কেশবপুর বাজার এলাকায় অভিযান চালানো হয়।
অভিযানে অপহরণ মামলার পলাতক আসামি শাহনেওয়াজ চৌধুরী বাপ্পারাজকে গ্রেফতার করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তার কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে র্যাব। ধারণা করা হচ্ছে, এই চক্রটি পরিকল্পিতভাবে হাসপাতাল এলাকায় শিশুদের টার্গেট করে অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায়ের চেষ্টা করত।
র্যাব কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গ্রেফতারকৃত আসামিকে সংশ্লিষ্ট থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে এবং তার বিরুদ্ধে পরবর্তী আইনি ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন।
দেশের সবচেয়ে বড় সরকারি হাসপাতালগুলোর একটি ঢামেকে এ ধরনের ঘটনা নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতাকে সামনে নিয়ে এসেছে। প্রতিদিন হাজারো রোগী ও স্বজনদের আনাগোনা থাকায় হাসপাতাল চত্বরে অপরাধীদের জন্য সুযোগ তৈরি হয়।
সাম্প্রতিক সময়ে বড় হাসপাতালগুলোতে শিশু ও রোগী নিরাপত্তা জোরদারের দাবি উঠেছে। বিশেষ করে সিসিটিভি নজরদারি, প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ এবং সন্দেহজনক ব্যক্তিদের পর্যবেক্ষণে আরও কঠোরতা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
র্যাব'র আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক উইং কমান্ডার এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী বলেন, অপহরণ ও মুক্তিপণ আদায়কারী চক্রের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন এলাকায় সক্রিয় এ ধরনের চক্রের সদস্যদের তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে এবং তাদের গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত থাকবে।
একই সঙ্গে অভিভাবকদের প্রতি সতর্ক থাকার আহ্বান জানাচ্ছি। জনসমাগমপূর্ণ স্থান, বিশেষ করে হাসপাতাল, মার্কেট ও পরিবহন কেন্দ্রে শিশুদের প্রতি সর্বোচ্চ খেয়াল রাখার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।