টিএফআই সেলে গুম ও নির্যাতনের মামলার জবানবন্দি
র্যাবের টাস্কফোর্স ফর ইন্টারোগেশন (টিএফআই) সেলে গুম ও নির্যাতনের শিকার মাসরুর আনোয়ার চৌধুরী ট্রাইব্যুনালে জবানবন্দিতে বলেছেন, ভারত ও আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে ফেসবুকে লেখালেখির কারণে গুম করে তাকে নির্মম নির্যাতন করা হয়েছিল। এরপর জঙ্গি নাটক সাজিয়ে মিথ্যা মামলা দিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়।
রোববার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনা ও সাবেক-বর্তমান ১২ সেনা কর্মকর্তাসহ মোট ১৭ জনের বিরুদ্ধে তৃতীয় সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দিতে তিনি এসব কথা বলেন।
জবানবন্দিতে মসরুর আনোয়ার বলেন, আমি বর্তমানে ফ্রিলান্স প্রকিউরমেন্ট এন্ড সাপ্লাই চেইন স্পেশালিস্ট হিসেবে কাজ করছি। আমার প্রতিষ্ঠানের নাম সোর্সিং পাই। ২০২০ সালের ৩ মার্চ সকাল ৮টা বা সাড়ে আটটার দিকে রিকশা করে কর্মস্থলে যাওয়ার পথে পুলিশ প্লাজার পিছনে ব্রিজের উপর পৌঁছালে পিছন দিক থেকে একটি মাইক্রোবাস এসে আমার রিকশা আটকায়। মাইক্রোবাস থেকে সাদা পোশাকধারী ৫/৬ জন লোক নেমে আমাকে ঘিরে ধরে এবং তাদের মধ্যে একজন আমার নাম মাসরুর কি না জিজ্ঞেস করে। তার মোবাইলে আমার ফেসবুক প্রোফাইল দেখিয়ে আমাকে জিজ্ঞাসা করে এটি আমার আইডি কি না। আমি বলি হ্যাঁ এটি আমার আইডি। আমি ফেসবুকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ মোদী বাংলাদেশে আগমনের বিরোধিতা করে একটি পোস্ট দিয়েছিলাম। পোস্টটি দেখিয়ে তারা আমাকে জিজ্ঞাসা করে পোস্টটি আমি দিয়েছি কি না। জবাবে আমি বলি হ্যাঁ এটি আমার লেখা। আপনারা আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন বললে, তারা আমাকে বলে বেশি কথা বললে শুট করে দেবো।
জবানবন্দিতে মাসরুর আরো বলেন, তখন আমি ভয়ে গাড়িতে উঠে পড়ি। গাড়িতে উঠিয়ে তারা আমাকে পিছনের সিটে বসায়। আমার হাতে হ্যান্ডকাফ পরায় এবং চোখে কালো কাপড় পরায়। গাড়ি ২ বা আড়াই ঘণ্টা চলার পর আমাকে একটি স্থানে নামায়। সেখান থেকে হাঁটিয়ে আমাকে একটি সেলে ঢুকানো হয়। আমার হাত এবং চোখ খুলে দেওয়া হলে আমি দেখি আনুমানিক ৬ ফিট বাই ৬ ফিট বিশিষ্ট একটি সেলে রাখা হয়েছে। ওই সেলের ভিতরে একটি টয়লেট ছিলো। যা ছিলো ৪ ফুট দেওয়াল বিশিষ্ট। পরে আমাকে একটি চেয়ারে বসানো হয়। একজন আমাকে বলে তোমাকে যা জিজ্ঞাসা করা হবে সঠিক উত্তর দিবা, অন্যথায় মেরে ফেলা হবে। তারা আবার আমাকে জিজ্ঞাসা করে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে এবং ভারতের বিরুদ্ধে আমার এত বিদ্বেষ কেন? আমি কোনো জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে জড়িত কি না। আমি কোনো উত্তর না দেওয়ায় ওই ব্যক্তি আমাকে একটি বেল্ট দিয়ে আঘাত করতে থাকে। আমি বলি আমি কোনো জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে জড়িত না।
জবানবন্দিতে মাশরুর বলেন, এরপর আমাকে অন্য একটি সেলে নিয়ে যায়। সেখানে আমি ব্লাইন্ডফোল্ডের নিচ দিয়ে সামান্য দেখতে পাই কেউ একজন আমাকে হাত দিয়ে ইশারা করছে। আমি কোনো উত্তর না দেওয়ায় সে আমাকে ফিসফিস করে ডাকছিলো। আমি তার দিকে তাকালে সে আমাকে ইশারায় বলে তোমার হাত দুটো পায়ের নিচ দিয়ে সামনে নিয়ে আসো। চোখের ব্লাইন্ডফোল্ড একটু উপরে তোল। সে অনুযায়ী আমি আমার হাতদুটো পায়ের নিচ দিয়ে সামনে নিয়ে আসি এবং চোখের ব্লাইন্ডফোল্ড একটু উপরের দিকে উঠাই। তখন আমি দেখতে পাই আমাকে যে সেলে রাখা হয়েছে তা আনুমানিক ১০/১২ ফিট দীর্ঘ এবং আনুমানিক ৩/৪ ফিট চওড়া। আমার বিপরীত দিকে আলাদা আলাদা সেলে আমি আরো ৩/৪ জনকে দেখতে পাই। তাদের সঙ্গে ইশারায় এবং ফিসফিস করে কথা বলি। তার মধ্যে একজনের নাম তারেক সাইফুল বলে আমি জানতে পারি। তার বাড়ি চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া বলে সে জানায়। তার বয়স আনুমানিক ১৬/১৭ বছর হবে। আমি তাদের কে জিজ্ঞাসা করি তারা কতদিন থেকে ওখানে আটক আছে। উত্তরে তারা বলে কেউ এক বছর, কেউ দুই বছর বা কেউ তিন বছর ধরে আটক আছে।
জবানবন্দিতে গুমেরর এই ভিক্টিম বলেন, একদিন আমাকে ৫/৬ জন মিলে জিজ্ঞাসাবাদ করে। তারা আমাকে আওয়ামী লীগের ও ভারত বিরোধিতা এবং রোহিঙ্গা ক্রাইসিসের সময় কেন আমি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে মসজিদ এবং মাদ্রাসা বানানোর কাজ করেছিলাম এসব জিজ্ঞাসাবাদ করতে থাকে। হলি আর্টিসানসহ সারা দেশে বিভিন্ন জায়গায় যে জঙ্গি হামলা হয় তার সঙ্গে আমার সম্পৃক্ততা আছে কিনা তা জানতে চায়। আমি এসব অভিযোগ অস্বীকার করি। এভাবে ৫/৬ দিন তারা আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে।
জবানবন্দিতে তিনি আরো বলেন, ৫/৬ দিন পর একজন গার্ড এসে আমাকে ফিসফিস করে বলে তুই বেঁচে গেছিস। নফল নামাজ পড়ে নে। সে আমাকে টিশার্ট ও লুঙ্গি পরিবর্তন করে আমার নিজের প্যান্ট ও শার্ট পরতে বলে। তারপর আমাকে গাড়িতে উঠিয়ে ২/৩ ঘণ্টা গাড়ি চালিয়ে প্রথমে যে সেলে আমাকে নিয়ে গিয়েছিল সেখানে আনা হয়। সেলে ফিরে আসার পর আমার চোখ খুলে দেওয়া হলে দেখতে পাই যে দুজন ছেলের নাম ও ফোন নাম্বার দিয়েছিলাম তাদেরকেও সেখানে নিয়ে আসা হয়েছে। তাদের একজনের নাম কাওসার আলম ফরহাদ এবং আরেকজনের নাম আসিফ ইফতেহাজ রিবাত। তারা চুয়েট থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে ঢাকায় কর্মরত ছিলো। তাদের বাড়িও চট্টগ্রামে ছিলো। ফরহাদ জানান, তাকে তার বাসা থেকে এবং রিবাতকে পুলিশ প্লাজার সামনে থেকে তুলে আনা হয়। সেখানে রাকিব নামে আরো একজন ব্যক্তিকে দেখতে পাই যাকে আরও ১/২ সপ্তাহ আগে থেকে গুম করে রাখা হয়েছিল। তাকে কেন তুলে আনা হয়েছে আমি জিজ্ঞাসা করলে সে জানায় ফেসবুকে লেখালেখির কারণেই তাকেও তুলে আনা হয়েছে। ওইদিন রাত আনুমানিক ১১/১২টার দিকে আমি, ফরহাদ, রিবাত ও রাকিবকে একটি মাইক্রোবাসে উঠায়। মাইক্রোবাসটি কিছুক্ষণ চলার পর এক জায়গায় থামে। সেখানে তারা আমাদের গাড়িতে রেখেই জঙ্গি ধর, জঙ্গি ধর বলে ৩/৪ জন ব্যক্তিকে গাড়িতে তোলে। তারপর গাড়ি চালিয়ে ওই ৩/৪ জনসহ পুনরায় আমাদেরকে সেলে নিয়ে আসে। গাড়ি থেকে নামানোর সময় ওই ৩/৪ জন ব্যক্তি অফিসারদের সঙ্গে হাসি ঠাট্টা করছিল। তাতে আমরা বুঝতে পারি আমাদেরকে কোনো একটি মামলায় জড়ানো হবে। তার জন্যই এই জঙ্গি নাটক করা হয়েছে।
পরদিন সকাল আনুমানিক ১০/১১টার দিকে আমাদেরকে মিডিয়ার সামনে উপস্থাপন করা হয় এবং আমাদের ছবি তোলা হয়। সেদিন সন্ধ্যা বেলায় আমাদের একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে চিকিৎসা প্রদান করা হয় এবং আনুমানিক সন্ধ্যা ৬.০০/৭.০০টার দিকে আমাদেরকে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থানায় সোপর্দ করা হয়। আমাদেরকে একটি জংগী মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে প্রেরণ করা হয়। আমি পরবর্তীতে জানতে পারি আমাকে অপহরণ ও গুমের নেতৃত্ব দেয় র্যাব-১১ এর অফিসার আলেপ উদ্দিন। আমাকে প্রথম যে সেলে রাখা হয়েছিল তা ছিলো র্যাব-১১। পরবর্তীতে যে সেলে রাখা হয় সেটি ছিলো টিএফআই সেল। আনুমানিক ১০ মাস কারাভোগের পর আমি জামিনে মুক্তি লাভ করি। আমি আমার গুম, নির্যাতন ও আমার ক্যারিয়ার নষ্টের জন্য যারা দায়ী তাদের বিচার চাই।