জুলাই বিপ্লবে আশুলিয়ায় ছয় লাশ পোড়ানোসহ সাত হত্যা মামলায় সাবেক এমপি সাইফুল ইসলামের মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে আদালত। এছাড়া সাইফুলের সব সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে দুস্থদের মধ্যে বিতরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার দুপুর সোয়া ১টার দিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ রায় ঘোষণা করেন।
প্যানেলের অপর দুই সদস্য হলেন— বিচারক অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ মঞ্জুরুল বাছিদ এবং জেলা ও দায়রা জজ নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর। জুলাই বিপ্লবের পর পুনর্গঠিত ট্রাইব্যুনালে এটি তৃতীয় মামলার রায়। তবে ট্রাইব্যুনাল-২-এর প্রথম রায়। এর আগে ট্রাইব্যুনাল-১ শেখ হাসিনা ও চানখাঁরপুল মামলার রায় ঘোষণা করে।
এর আগে গত রোববার রায় ঘোষণার জন্য এই দিন ধার্য করা হয়। গত ২০ জানুয়ারি রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক শেষে রায় ঘোষাণার জন্য অপেক্ষমাণ রাখে ট্রাইব্যুনাল। এই মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে ২৪ জন সাক্ষী জবানবন্দি দিয়েছেন। এএসআই শেখ আবজালুল হক রাজসাক্ষী হয়ে শহীদদের পরিবারসহ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের কাছে ক্ষমা চেয়ে জবানবন্দি দেন।
এ বিষয়ে ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম বলেছেন, জুলাই বিপ্লবে ঢাকার অদূরে আশুলিয়ায় মানবাতার ইতিহাসে বর্বরতম একটা ঘটনা ঘটেছে। ছয়জন তরুণকে নির্মমভাবে শুধু গুলি করে হত্যা করা হয়নি, এই তরুণ ছাত্রদের জীবন্ত অবস্থায় একজনকে ও বাকি পাঁচজনের লাশ গাড়িতে তুলে খড়ি-কাঠ দিয়ে পেট্রোল ঢেলে পোড়ানো হয়েছে। পৃথিবীর ইতিহাসে এরকম বর্বতার নজির খুব কম আছে। সুতরাং একটা সভ্য দেশে পুলিশ বাহিনীর সদস্য হয়ে যারা জাতির সূর্যসন্তানদের এভাবে হত্যা করেছে, তাদের অপরাধ ক্রিস্টাল ক্লিয়ারভাবে প্রমাণিত হয়েছে। অপরাধীদের চেহারা ভিডিওর মাধ্যমে চিহ্নিত হয়েছে। ঘটনাস্থলে লাইভ উইটনেস আছে এবং প্রত্যক্ষদর্শী সবাই সাক্ষ দিয়েছেন। কাচের মতো স্বচ্ছভাবে অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে । সুতরাং আমরা আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি প্রত্যাশা করছি।
আশুলিয়ার মামলায় ১৬ জনকে আসামি করা হয়। এর মধ্যে আটজন গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছেন। তারা হলেন— ঢাকা জেলার সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবদুল্লাহিল কাফী, সাভার সার্কেলের সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. শহিদুল ইসলাম, ঢাকা জেলা পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) সাবেক পরিদর্শক মো. আরাফাত হোসেন, আশুলিয়া থানার সাবেক উপপরিদর্শক (এসআই) আবদুল মালেক, আরাফাত উদ্দীন, কামরুল হাসান, শেখ আবজালুল হক ও সাবেক কনস্টেবল মুকুল চোকদার। এছাড়া সাবেক সংসদ সদস্য সাইফুল ইসলামসহ এ মামলার অপর আট আসামি পলাতক রয়েছেন।
প্রসিকিউশন সূত্রে জানা যায়, গত বছরের ২ জুলাই এ মামলার আনুষ্ঠানিক অভিযোগ ট্রাইব্যুনালে জমা দেয় প্রসিকিউশন। আনুষ্ঠানিক অভিযোগের সঙ্গে অন্যান্য তথ্যসূত্র হিসেবে ৩১৩ পৃষ্ঠা, সাক্ষী ৬২, দালিলিক প্রমাণাদি ১৬৮ পৃষ্ঠা ও দুটি পেনড্রাইভ যুক্ত করা হয়। পরে ১৬ জনের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ আমলে নেয় ট্রাইব্যুনাল। পলাতক আট আসামির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়। গত বছরের ২১ আগস্ট মামলার ‘আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন’ করে বিচার শুরুর আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল। গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর প্রসিকিউশন এ মামলায় সূচনা বক্তব্য দেয়। এরপর সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয় ।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বেলা ৩টার দিকে আশুলিয়া থানার সামনে পাঁচজনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। গুলিতে গুরুতর আহত হন একজন। মরণাপন্ন আহত ব্যক্তি ও পাঁচজনের মৃতদেহ প্রথমে একটি প্যাডেল ভ্যানে তোলা হয়। পরে ওই ভ্যান থেকে পুলিশের একটি গাড়িতে তোলা হয়। একপর্যায়ে ওই গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয় পুলিশ। এ ঘটনায় সাজ্জাদ হোসেন (সজল), আস সাবুর, তানজীল মাহমুদ সুজয়, বায়েজিদ বুসতামি, আবুল হোসেন ও অজ্ঞাত একজন শহীদ হন।