হোম > শিক্ষা > ক্যাম্পাস

শিক্ষকরা গ্রামে থাকতে চান না, তদবির করেন শহরে আসার জন্য

এম এ আহাদ শাহীন

বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থাকে যুগোপযোগী ও দক্ষতাভিত্তিক করে গড়ে তুলতে নানা উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে সরকার। শিক্ষার্থীদের মৌলিক সাক্ষরতা ও সংখ্যাজ্ঞান নিশ্চিত করা, শিক্ষার মানোন্নয়ন, শিক্ষক প্রশিক্ষণ এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা নিয়ে কাজ করছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। এসব উদ্যোগের অগ্রগতি, চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলেছেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. সাখাওয়াৎ হোসেন।

আমার দেশ : বর্তমানে বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থার প্রধান সমস্যাগুলো কী বলে মনে করেন?

মো. সাখাওয়াৎ হোসেন : বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষার মূল সমস্যা হলো এখানে আমরা কোয়ালিটি এডুকেশন পাচ্ছি না। আমাদের বেসিক যে শিক্ষা, সেখানে অনেক ক্ষেত্রে বিঘ্নিত হচ্ছে। তাই এই বিষয়গুলো আমরা অ্যাড্রেস করেছি এবং সেই হিসেবে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। বিশেষ করে এফএলএন—মৌলিক সাক্ষরতা ও সংখ্যাজ্ঞান নিয়ে কাজ করেছি। গত বছর থেকে আরো টার্গেট-বেইজড কাজ করা হচ্ছে। এফএলএন হচ্ছে, বাচ্চারা সাবলীলভাবে বাংলা পড়তে পারে কি না, আমাদের গণিতের যোগ-বিয়োগ-গুণ-ভাগ করতে পারে কি না, সে বিষয়ে এবং ইংরেজিকে আমরা এখানে সম্পৃক্ত করেছি। সে ক্ষেত্রে ইংরেজি রিডিংটা পড়তে পারে কি না, সে বিষয়ে আমরা সার্ভে করছি। ছাত্রদের কোথায় কী দুর্বলতা, সেগুলো আইডেন্টিফাই করে আমরা শিক্ষকদের নির্দেশনা দিচ্ছি। এগুলোর ওপরে ও একাডেমিক সুপারভিশনের ওপরে মনোযোগ দেওয়ার জন্য শিক্ষক-কর্মকর্তাদের আমরা উদ্বুদ্ধ করছি এবং নির্দেশনা দিচ্ছি।

আমার দেশ : প্রাথমিক শিক্ষার মান উন্নয়নে বর্তমান সরকারের অগ্রাধিকারগুলো কী?

মো. সাখাওয়াৎ হোসেন : বর্তমান সরকার শিক্ষাবান্ধব সরকার। বর্তমান সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারে শিক্ষাবিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বিষয় সংযুক্ত রয়েছে; যেমন লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস বা আনন্দময় শিক্ষা, ছাত্র-ছাত্রীদের সুপ্ত প্রতিভা বিকাশের মাধ্যমে শিক্ষণ প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত করা, সুশিক্ষায় মেধাবী শিক্ষক তৈরি—এই কনসেপ্টগুলোর কারণে প্রাথমিক শিক্ষা ক্ষেত্রে আমাদের শিক্ষার মান অনেক বেশি উন্নত হবে। সে ক্ষেত্রে আমাদের প্রাথমিক শিক্ষার সমস্যাগুলো দ্রুত দূর করতে পারব এবং আমাদের প্রাথমিক শিক্ষার্থীরা কোয়ালিটি এডুকেশন পাবে। এছাড়া টিচার এডুকেশনের ওপর আমরা কাজ করছি। চাইল্ড এডুকেশন, নৈতিক শিক্ষা এবং জীবনব্যাপী শিক্ষার ওপর আমরা গুরুত্ব দিচ্ছি।

আমার দেশ : গ্রাম ও শহরের প্রাথমিক শিক্ষার মানের মধ্যে যে পার্থক্য রয়েছে, তা কমাতে মন্ত্রণালয় কী ধরনের উদ্যোগ নিচ্ছে?

মো. সাখাওয়াৎ হোসেন : গ্রাম আর শহরের প্রাথমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে একটা বৈষম্য থাকে। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে বৈষম্য নেই বললেও চলে। ঢাকা শহরে প্রাথমিক শিক্ষার মান যে খুব ভালো তা নয়, কারণ এখানে আমাদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চেয়ে কিন্ডারগার্টেন স্কুলগুলোয় গার্ডিয়ানরা বেশি প্রেফার করার কারণে সেই বাচ্চাগুলো চলে যায়। কিন্তু মফস্বল জেলাগুলোয় বা দূরবর্তী পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোয় ভালো ভালো শিক্ষক থাকেন এবং সেখানে পড়াশোনার মান গ্রামগঞ্জের তুলনায় মোটামুটি ভালো হয়। আর গ্রামের সমস্যা হচ্ছে, কেউ গ্রামে থাকতে চায় না, সবাই তদবির করে শহরে চলে আসার জন্য। সেজন্য গ্রামের স্কুলগুলোয় সবসময় একটা সংকট থাকে। সেটা দূর করার জন্য কিছু চিন্তাভাবনা আমাদের রয়েছে। শিক্ষকরা যেন চাকরিজীবনে দু-তিন বছর বাধ্যতামূলক দূরবর্তী এলাকায় চাকরি করেন, সে বিষয়টা আমরা ভাবছি।

এছাড়া বিকল্প হিসেবে প্যারা শিক্ষক নিয়োগের বিষয়ে আমাদের চিন্তাভাবনা রয়েছে, যাতে দূরবর্তী এলাকায় বা গ্রামের প্রত্যন্ত এলাকায় শিক্ষক অভাবের কারণে আমাদের শিক্ষা ব্যাহত না হয়। সেই শিক্ষককে যদি আমরা লোকাল অভিভাবকদের মাধ্যমে উদ্বুদ্ধ করে বেতন-ভাতা দিতে পারি, সেটা আমাদের জন্য খুব ভালো হবে। আমরা যেকোনো মূল্যে কোয়ালিটি এডুকেশন চাই এবং সেই হিসেবে আমরা কাজ করে যাচ্ছি।

আমার দেশ : শিক্ষক সংকট ও শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের বিষয়টি প্রাথমিক শিক্ষায় কতটা প্রভাব ফেলছে?

মো. সাখাওয়াৎ হোসেন : শিক্ষক সংকট থাকলে পড়াশোনায় ব্যাঘাত হয়, এটা ন্যাচারাল। আর প্রতিবছর আমাদের হাজার হাজার শিক্ষক অবসরে চলে যাচ্ছেন, আবার নিয়োগের প্রয়োজনীয়তা হচ্ছে। সে ক্ষেত্রে শিক্ষকের স্বল্পতা আমাদের দেশে ব্যাপকভাবে নেই, কারণ আমাদের যে ওয়ার্ডভিত্তিক ১:৩০ কনসেপ্ট রয়েছে, সেটার তুলনায় আমরা এখন ১:২৮-এ রয়েছি। মানে আমাদের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকের অনুপাত সন্তোষজনক। আমাদের শিক্ষকদের পদায়নের ক্ষেত্রে কিছু সমস্যা রয়েছে, সেগুলো আমরা অ্যাডজাস্ট করছি এবং সে ক্ষেত্রে আমাদের পলিসি মেকারদের সঙ্গে আলাপ করে দ্রুত ব্যবস্থা নেব।

আমার দেশ : প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ দক্ষতা গড়ে তুলতে কী ধরনের পরিকল্পনা গ্রহণ করছে মন্ত্রণালয়?

মো. সাখাওয়াৎ হোসেন : প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের দক্ষতা গড়ে তোলার জন্য আমরা বিভিন্নমুখী কার্যক্রম শুরু করেছি। টিচার এডুকেশনের ওপর আমরা কাজ করে যাচ্ছি, কারণ আমরা জানি যদি আমরা সক্রেটিসের মতো টিচার সৃষ্টি করতে পারি, তাহলে প্লেটোর মতো ছাত্র আমরা পাব। প্লেটোর মতো শিক্ষক আমরা যদি তৈরি করতে পারি, তাহলে আমরা অ্যারিস্টটলের মতো ছাত্র পাব; আবার অ্যারিস্টটলের মতো শিক্ষক তৈরি করতে পারলে আমরা একজন আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের মতো মহানায়ক পাব। সে ক্ষেত্রে আমরা টিচার এডুকেশনের ওপর খুব ফোকাস করছি। সেই টিচার এডুকেশনটাকে আরো ভালো করার জন্য ২১টি গবেষণামূলক বই প্রকাশ করা হয়েছে এবং সেগুলো আমরা শিক্ষকদের মাধ্যমে বিতরণের প্রক্রিয়া করছি। সেজন্য আমাদের শিক্ষক যত বেশি দক্ষ হবেন, আমাদের ছাত্র-ছাত্রী তত বেশি জ্ঞানী-গুণী হবে। শিক্ষক যত পড়ুয়া হবেন, লাইফলং লার্নিংয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকবেন, ছাত্র-ছাত্রীরাও তত বেশি জানবে বা তারাও লাইফলং লার্নিংয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত হবে। সেজন্য আমরা চাইল্ড এডুকেশনের ওপর কাজ করছি। মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে ৪০টি চাইল্ড ইন ডেভেলপমেন্ট, নৈতিক শিক্ষা এবং লাইফলং শিক্ষার ওপর উপদেশমূলক বই প্রকাশ করা হয়েছে। সরকারিভাবে সেগুলো আমরা মাঠপর্যায়ে দেওয়ার চেষ্টা করছি। লাইব্রেরি ওয়ার্কের জন্য সময় নির্ধারণের পরিকল্পনা রয়েছে। সেটা করতে পারলে আমাদের বাচ্চারা পড়ার টেবিলে ফিরে যাবে এবং তারা আনন্দময় শিক্ষার মাধ্যমে নিজেদের দক্ষ নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে পারবে, এটা আমাদের বিশ্বাস।

আমার দেশ : প্রাথমিক শিক্ষায় ডিজিটাল প্রযুক্তি বা স্মার্ট ক্লাসরুম কতটা বাস্তবায়িত হচ্ছে?

মো. সাখাওয়াৎ হোসেন : আমাদের ৬৫ হাজার পাঁচশ’র ওপরে স্কুল রয়েছে। সেগুলোয় প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করার চেষ্টা করেছি এবং সব স্কুলে আমরা বিভিন্ন মেটেরিয়াল সরবরাহ করেছি। সেখানে প্রজেক্টর রয়েছে, যাতে করে শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন শিক্ষামূলক বিষয় ওইখান থেকে শিখতে পারে। এতে করে তাদের দূরদর্শিতা বৃদ্ধি পায় এবং ওয়ার্ল্ড ভিউ সম্পর্কে অবহিত হতে পারে। তারা গ্লোবাল সিটিজেন হিসেবে নিজেদের গড়ে তোলার প্রস্তুতি নিতে পারে।

আমার দেশ : আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রাথমিক শিক্ষাকে এগিয়ে নিতে কী ধরনের কৌশল গ্রহণ করছে সরকার?

মো. সাখাওয়াৎ হোসেন : আমরা জানি এফএলএন (Foundational Literacy and Numeracy) কার্যক্রমে বৈশ্বিক গড় বর্তমানে প্রায় ৪০ শতাংশ। বাংলাদেশে এ হার আগে ছিল মাত্র ৩২ শতাংশ। গত দেড় বছরে ধারাবাহিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে আমরা এ হার ৫০ শতাংশের কাছাকাছি উন্নীত করতে সক্ষম হয়েছি। আমাদের লক্ষ্য হলো ফিনল্যান্ড, হংকং, দক্ষিণ কোরিয়া ও সিঙ্গাপুরের মতো দেশগুলোর মানদণ্ড অনুসরণ করে এফএলএন কার্যক্রমকে ৯০ শতাংশের ওপরে নিয়ে যাওয়া। এ বছর আমরা অন্তত ৭০ শতাংশ অর্জনের লক্ষ্যে কাজ করছি এবং আগামী বছরের মধ্যে ৯০ শতাংশের বেশি অর্জনের টার্গেট নির্ধারণ করেছি। সে ক্ষেত্রে সফল হলে এফএলএনে প্রথম সারির দেশ হিসেবে আমরা ওয়ার্ল্ডে বিবেচিত হতে পারব। বেসিক লার্নিংটা বাচ্চাদের ক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং এই শিখন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বাচ্চারা ভবিষ্যতে যোগ্য নাগরিক হিসেবে নিজেদের গড়ে তুলতে পারবে।

আমার দেশ : প্রাথমিক শিক্ষায় ধর্মীয় শিক্ষাকে গুরুত্ব দেওয়ার জন্য বা ধর্মীয় শিক্ষায় শিক্ষিত হলে বাচ্চাদের ভেতর যে নৈতিকতা তৈরি হয়, সেটার প্রতি আপনাদের কোনো সিদ্ধান্ত আছে কি না?

মো. সাখাওয়াৎ হোসেন : হ্যাঁ, নৈতিক শিক্ষার ওপরে আমরা গুরুত্ব দিচ্ছি। বাচ্চাদের তৈরি করতে নৈতিক শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। নৈতিক শিক্ষাব্যতীত কেউ আদর্শ নাগরিক হতে পারে না। সে কারণে আমরা নৈতিক শিক্ষার ওপরে দৃষ্টি দিচ্ছি এবং নৈতিক শিক্ষার সঙ্গে ধর্মীয় শিক্ষা যেহেতু সম্পৃক্ত, তাই এর সঙ্গে অ্যালাইন করা হবে। সেজন্য আমরা মনে করি, নৈতিক শিক্ষার ক্ষেত্রে আমাদের যে সংকট রয়েছে, সেটি অচিরেই দূর হবে।

আমার দেশ : সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

মো. সাখাওয়াৎ হোসেন : আমার দেশকেও ধন্যবাদ।

ছাত্রদলের সৌজন্যে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশ্বকাপ উন্মাদনা

চবির আবাসিক হলে খাবারে মিলল বেলিফুল নারকেল তেলের ছবিযুক্ত স্টিকার

জলবায়ু-সহিষ্ণু ফসল নিয়ে নোবিপ্রবি অধ্যাপকের গবেষণা

পরীক্ষা না দিয়েও পাস, দেওয়া পরীক্ষায় ফেল—সাত কলেজের ফল প্রকাশে বিতর্ক

জাতীয় পরিবেশ পদকে ভূষিত হয়েছেন ঢাবির উপ-উপাচার্য আবদুস সালাম

জীবনে বড় হতে গেলে কঠোর শৃঙ্খলার বিকল্প নেই: ঢাবিতে ডেপুটি স্পিকার

জাবিপ্রবিতে জাতীয় ছাত্রশক্তির নেতৃত্বে লিটন-মামুন

সংবাদকর্মী ও শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশি হামলার প্রতিবাদে জবিতে মানববন্ধন

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ক্লাস-পরীক্ষা স্থগিত

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনির্বাচিত কমিটি নিয়ে ক্ষোভ, বাড়ছে জটিলতা