হোম > শিক্ষা > ক্যাম্পাস

জাতির জ্ঞানতীর্থ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার

মাহির কাইয়ুম, ঢাবি

দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার জ্ঞানচর্চা, ইতিহাস ও গবেষণার এক জীবন্ত ভাণ্ডার। বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক কলা ভবন ও কেন্দ্রীয় মসজিদ সংলগ্ন এলাকায় যে লাল ইটের দালানটি দাঁড়িয়ে আছে, সেটি কেবল একটি গ্রন্থাগারই নয়; এটি দেশের ইতিহাসের জ্ঞানতীর্থ, যা প্রজন্মের পর প্রজন্মকে জ্ঞানের আলোয় আলোকিত করতে কাজ করছে। ঐতিহ্য, প্রযুক্তি, সীমাবদ্ধতা ও সম্ভাবনার এক অনন্য সংমিশ্রণ এ প্রতিষ্ঠানকে এনে দিয়েছে স্বতন্ত্র পরিচয়।

১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে যাত্রা শুরু করা এই গ্রন্থাগার সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হয়ে উঠেছে প্রজন্মের পর প্রজন্মের মেধা ও স্বপ্ন নির্মাণের কেন্দ্র। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সময়ই একটি সমৃদ্ধ গ্রন্থাগারের প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়। তৎকালীন ঢাকা কলেজের প্রায় ১৮ হাজার বই নিয়ে যাত্রা শুরু করে এই লাইব্রেরি। শুরুতে এটি ঢাকা হল (বর্তমান শহীদুল্লাহ হল) এর অংশ ছিল। পরে জগন্নাথ হলের পুরোনো ভবনে স্থানান্তরিত হয়ে ধীরে ধীরে বর্তমান স্থানে স্থায়ী রূপ পায়।

বাংলাদেশের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলোর নীরব সাক্ষী এই গ্রন্থাগার। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ—সব ঘটনার ছায়া পড়েছে এর দেয়ালে। মুক্তিযুদ্ধকালে বুদ্ধিজীবী নিধন আতঙ্কের মধ্যেও এর সংগ্রহ ও অস্তিত্ব টিকে থাকে, যা পরবর্তীতে দেশের বুদ্ধিবৃত্তিক পুনর্গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

গ্রন্থাগারটি মূলত তিনটি অংশে বিভক্ত—প্রশাসনিক ভবন, মূল পাঠকক্ষগুলো এবং বিজ্ঞান অনুষদের জন্য পৃথক সেকশন।

মূল ভবনের নকশা এমনভাবে করা হয়েছে, যাতে প্রাকৃতিক আলো ও বাতাস সহজে প্রবেশ করতে পারে। বিশাল পাঠকক্ষগুলোতে রয়েছে সারি সারি ডেস্ক, যেখানে শিক্ষার্থীরা নীরব পরিবেশে অধ্যয়ন করেন। প্রবেশপথের ভাস্কর্য ও ভেতরের নীরবতা মিলিয়ে এখানে প্রবেশ করলেই একধরনের একাগ্রতার পরিবেশ সৃষ্টি হয়।

খুব ভোরে দীর্ঘ সারিতে দাঁড়িয়ে থাকা শিক্ষার্থীদের দৃশ্য, নীরব পাঠকক্ষে ঘণ্টার পর ঘণ্টা মনোনিবেশ, কিংবা টেবিলে ছড়িয়ে থাকা বিসিএস গাইড—এসব এই গ্রন্থাগারের এক বহুমাত্রিক বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি।

এ গ্রন্থাগারের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ হলো পাণ্ডুলিপি বিভাগ। এখানে প্রায় ৩০ হাজারের বেশি প্রাচীন পাণ্ডুলিপি সংরক্ষিত আছে। সংস্কৃত, আরবি, ফার্সি, বাংলা ও তিব্বতি ভাষায় লেখা এসব পাণ্ডুলিপি উপমহাদেশের ইতিহাস ও সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ দলিল।

তালপাতায় লেখা মহাকাব্য, হাতে তৈরি কাগজে সংরক্ষিত সাহিত্যকর্ম, আলাওলের কাব্য কিংবা বৈষ্ণব পদাবলী—এসবই গবেষকদের জন্য অমূল্য সম্পদ। বর্তমানে এসব ঐতিহ্য ডিজিটাল আর্কাইভে রূপান্তরের কাজও চলমান রয়েছে, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণকে আরো সহজ করবে।

প্রায় সাত লাখেরও বেশি বই নিয়ে এ গ্রন্থাগার গড়ে উঠেছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞান, ইতিহাস, সাহিত্য, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি সব ক্ষেত্রের বই এখানে সংরক্ষিত রয়েছে। পাশাপাশি দেশি-বিদেশি জার্নাল এবং গবেষণাপত্র নিয়মিত যুক্ত হচ্ছে এই সংগ্রহে।

এছাড়া পুরোনো সংবাদপত্র, যেমন ‘ইত্তেফাক’ বা ‘আজাদ’-এর সংরক্ষিত কপি মাইক্রোফিল্ম আকারে গবেষকদের জন্য উন্মুক্ত। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাস গবেষণায় এই আর্কাইভ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

একবিংশ শতাব্দীর চাহিদা মেটাতে লাইব্রেরি নিজেকে আধুনিকায়ন করার চেষ্টাও করছে। OPAC (Online Public Access Catalog) ব্যবস্থার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা সহজেই বই খুঁজে পাচ্ছেন।

JSTOR, Emerald, Oxford Journals-এর মতো আন্তর্জাতিক ডেটাবেসে বিনামূল্যে প্রবেশাধিকার শিক্ষার্থীদের বৈশ্বিক গবেষণার সঙ্গে যুক্ত করেছে। পাশাপাশি হাইস্পিড ওয়াইফাই, কম্পিউটার ল্যাব ও ডিজিটাল রিসোর্স সেন্টার এই রূপান্তরকে আরো কার্যকর করেছে।

এদিকে লাইব্রেরির গেট খোলার আগে ভোরে শিক্ষার্থীদের দীর্ঘ সারি এই গ্রন্থাগারের পরিচিত দৃশ্য। সীমিত আসনের কারণে জায়গা দখলের এ প্রতিযোগিতা অনেক সময় প্রতিদিনের রুটিনে পরিণত হয়। মূলত হলের রিডিং রুম পর্যাপ্ত না হওয়ায় অনেক শিক্ষার্থী কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির ওপর নির্ভরশীল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে কিছু প্রশাসনিক পরিবর্তন ও আবাসন ব্যবস্থার উন্নতির ফলে এই চাপ অনেকটা কমে এসেছে।

তবে গ্রন্থাগারটি শুধু একাডেমিক গবেষণার ক্ষেত্র হিসেবে নয়, বরং বিসিএসসহ বিভিন্ন চাকরির প্রস্তুতির কেন্দ্রেও পরিণত হয়েছে। টেবিলে টেবিলে গাইডবুক, কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স আর নোট খোলার দৃশ্য এখানকার দৈনন্দিন চিত্র। একদিকে এটি প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি করছে, অন্যদিকে একাডেমিক গবেষণার জায়গা সংকুচিত হচ্ছে।

এছাড়া গ্রন্থাগারটির বেশ কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো আসন সংকট। প্রায় ৪০ হাজার শিক্ষার্থীর বিপরীতে আসনসংখ্যা মাত্র দুই থেকে আড়াই হাজার। ফলে চাপ সব সময়ই বেশি থাকে। এছাড়া কিছু স্থানে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের অভাব, পুরোনো বই সংরক্ষণে অবহেলা, ক্যান্টিন ও ওয়াশরুম ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা, বই চুরি বা পাতা ছেঁড়ার মতো অভিযোগ নিয়মিতভাবে আলোচনায় আসে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন প্রকল্পের অংশ হিসেবে নতুন করে একটি আধুনিক কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। প্রায় দুই হাজার ৮৪০ কোটি টাকার প্রকল্পের আওতায় দুই ব্লকবিশিষ্ট নতুন ভবন নির্মাণ করা হবে। এই নতুন স্থাপনায় থাকবে আধুনিক পাঠকক্ষ, উন্নত ডিজিটাল অবকাঠামো, স্মার্ট ক্যাটালগিং সিস্টেম এবং শিক্ষার্থীবান্ধব পরিবেশ।

নতুন লাইব্রেরি নির্মাণ বাস্তবায়ন হলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার ধীরে ধীরে স্মার্ট লাইব্রেরিতে পরিণত হবে এবং ডিজিটালাইজেশন, গবেষণাবান্ধব অবকাঠামো এবং প্রযুক্তিনির্ভর সেবা নিয়ে শক্তিশালী জ্ঞানকেন্দ্র হয়ে উঠবে।

কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের ভারপ্রাপ্ত গ্রন্থাগারিক অধ্যাপক ড. কাজী মোস্তাক গাউসুল হক বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার দীর্ঘদিন ধরেই ‘ক্লোজড অ্যাক্সেস’পদ্ধতিতে পরিচালিত হয়ে আসছে, যা রীতিমতো ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে। এ পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীরা সরাসরি বুকসেলফে গিয়ে বই নিতে পারেন না; বরং নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বই সংগ্রহ করতে হয়।

এর প্রধান কারণ হিসেবে তিনি বলেন, গ্রন্থাগারের বিপুলসংখ্যক বই নির্দিষ্ট শ্রেণিবিন্যাস অনুযায়ী সাজানো থাকে। শিক্ষার্থীরা যদি নিজেরা বই নিয়ে পুনরায় যথাস্থানে না রাখেন, তাহলে বই খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে এবং পুরো ব্যবস্থায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতে পারে।

তিনি আরো বলেন, গ্রন্থাগারে পর্যাপ্ত জনবল না থাকাও এ পদ্ধতি বজায় রাখার একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। যদি ‘ওপেন অ্যাক্সেস’চালু করা হয়, তাহলে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক বই পুনরায় সঠিকভাবে সংরক্ষণ করার জন্য অতিরিক্ত জনবল প্রয়োজন হবে, যা বর্তমানে নেই।

গ্রন্থাগার আধুনিকায়ন প্রসঙ্গে তিনি জানান, ভবিষ্যতে ডিজিটালাইজেশন ও উন্নত সেবার মাধ্যমে গ্রন্থাগারকে আরো শিক্ষার্থীবান্ধব করে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।

রুয়েটে ২০২৫–২৬ শিক্ষাবর্ষের ওরিয়েন্টেশন ৯ মে

ঢাকা কলেজের আবাসিক হলে মধ্যরাতে অভিযান

চা-শ্রমিকদের বঞ্চনা তুলে ধরে ঢাবিতে পথনাটক

রাবিতে হলের গাছের লিচু পেড়ে রুমে রুমে পৌঁছে দিলেন হল সংসদের নেতারা

লুঙ্গি পরে গামছা ঝুলিয়ে ভাইভা বোর্ডের পরীক্ষায় শিক্ষার্থী

রাবির মন্নুজান হলে ২২ শিক্ষার্থীকে আর্থিক সহায়তা

ঢাবি সাংবাদিকদের ওপর হামলায় মামলা নেয়নি পুলিশ, ব্যাখ্যা চাইলেন নাহিদ

রাবি শিক্ষার্থীদের কাস্টমাইজড এটিএম কার্ড দিচ্ছে ইসলামী ব্যাংক

মিছিল-পাল্টা মিছিলে উত্তপ্ত চবির ছাত্ররাজনীতি

তা’মীরুল মিল্লাতে কৃতি শিক্ষার্থী সংবর্ধনা ও ওরিয়েন্টেশন