আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষার পরিবেশ ও একাডেমিক গুণগত মান মূল্যায়নের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূচক শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত। তবে এক্ষেত্রে দেশের অন্যান্য স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি)। বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে প্রতি জন শিক্ষকের বিপরীতে প্রায় ২৫ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। যেখানে সর্বোচ্চ ২০ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে একজন শিক্ষক থাকতে পারেন। ফলে শিক্ষার স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটিতে ৩০ হাজার শিক্ষার্থীর বিপরীতে শিক্ষক রয়েছেন প্রায় ১,২০০ । এ হিসাবে গড়ে প্রতি ২৫ জন শিক্ষার্থীর জন্য একজন শিক্ষক রয়েছেন। কর্তৃপক্ষ বলছে, দীর্ঘদিন নিয়মিত নিয়োগ না হওয়ায় এ সংকট তৈরি হয়েছে। এ অবস্থায় দ্রুত শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনার মান বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা।
কিউএস ও টাইমস হায়ার এডুকেশনের মতো আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয় র্যাংকিংয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাতকে শিক্ষার পরিবেশ মূল্যায়নের গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ইউজিসির বার্ষিক প্রতিবেদন ও উচ্চশিক্ষাসংক্রান্ত নীতিমালা পর্যালোচনায় দেখা যায়, বাংলাদেশে প্রতি ১৫ জন শিক্ষার্থীর জন্য একজন শিক্ষককে কাম্য অনুপাত হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সর্বোচ্চ সহনীয় পর্যায়ে প্রতি ২০ জন শিক্ষার্থীর জন্য একজন শিক্ষক। সে হিসাবে রাবির অন্তত ৩৪টি বিভাগ ও ইনস্টিটিউট এ সীমার চেয়েও পিছিয়ে রয়েছে। কারণ এ বিভাগগুলোতে প্রতি শিক্ষকের বিপরীতে ২৫ জনের বেশি শিক্ষার্থী রয়েছে।
ইউজিসির ২০২৫ সালে প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, দেশের তিনটি বড় স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতি ১৫ জন শিক্ষার্থীর জন্য একজন শিক্ষক রয়েছেন। চট্টগ্রাম ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে এ অনুপাত প্রতি ১৮ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে একজন। সেখানে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতি ২১ জন শিক্ষার্থীর জন্য রয়েছেন একজন শিক্ষক।
নাজুক অবস্থা ৩৪ বিভাগে
বিভাগভিত্তিক তথ্যে সবচেয়ে নাজুক অবস্থায় রয়েছে মাইক্রোবায়োলজি বিভাগ। সেখানে প্রতি ৫৬ জন শিক্ষার্থীর জন্য রয়েছেন মাত্র একজন শিক্ষক। ব্যাংকিং অ্যান্ড ইনস্যুরেন্স বিভাগে এ অনুপাত ৪৬:১, ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্টে ৪১:১ এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞানে ৪০:১।
সংস্কৃত বিভাগে প্রতি ৩৮ জন শিক্ষার্থীর জন্য একজন শিক্ষক রয়েছেন। চিত্রকলা, প্রাচ্যকলা ও ছাপচিত্র এবং অর্থনীতি বিভাগে এ অনুপাত ৩৫:১। আইবিএতে ৩৪:১ এবং চিকিৎসা মনোবিজ্ঞানে ৩৩:১।
এছাড়া মার্কেটিং বিভাগে প্রতি ৩২ জন, ইতিহাসে ৩১ জন এবং আইন ও ভূমি প্রশাসন, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট এবং ইংরেজি বিভাগে প্রতি ৩০ জন শিক্ষার্থীর জন্য রয়েছেন একজন শিক্ষক। দর্শনে অনুপাত ২৯:১ এবং ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতিতে ২৮:১।
ইনফরমেশন সায়েন্স অ্যান্ড লাইব্রেরি ম্যানেজমেন্ট, ইসলামিক স্টাডিজ ও ফাইন্যান্স বিভাগে প্রতি ২৭ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে একজন শিক্ষক রয়েছেন। আইন ও ফলিত গণিতে এ সংখ্যা ২৬ জন। সমাজবিজ্ঞান, গ্রাফিক ডিজাইন, কারুশিল্প ও শিল্পকলার ইতিহাস এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে অনুপাত ২৫:১।
এছাড়া কয়েকটি বিভাগে অনুপাত ২১ থেকে ২৪ জনের মধ্যে রয়েছে। ভূতত্ত্ব ও খনিবিদ্যা এবং নৃবিজ্ঞানে প্রতি ২৩ জন শিক্ষার্থীর জন্য একজন শিক্ষক রয়েছেন। ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগে ২২:১ এবং শারীরিক শিক্ষা ও ক্রীড়া বিজ্ঞানের পাশাপাশি বাংলা, প্রাণিবিদ্যা এবং ফলিত রসায়ন ও রসায়ন প্রকৌশল বিভাগে এ অনুপাত ২১:১।
এগিয়ে ১৭ বিভাগ ও ইনস্টিটিউট
অন্যদিকে ১৭টি বিভাগ ও ইনস্টিটিউটে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাত সীমার মধ্যে রয়েছে। সবচেয়ে ভালো অবস্থানে জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড বায়োটেকনোলজি বিভাগ। সেখানে প্রতি সাতজন শিক্ষার্থীর জন্য রয়েছেন একজন শিক্ষক। প্রাণরসায়ন ও অণুপ্রাণ বিজ্ঞান বিভাগে এ অনুপাত ৮:১ এবং নাট্যকলায় ৯:১।
ফার্মেসিতে প্রতি ১০ জন শিক্ষার্থীর জন্য একজন শিক্ষক রয়েছেন। ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং এবং ভেটেরিনারি অ্যান্ড অ্যানিমেল সায়েন্সেসে ১১:১, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ও পদার্থবিজ্ঞানে ১২:১ এবং ইনফরমেশন অ্যান্ড কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ১৩:১ অনুপাত রয়েছে।
পপুলেশন সায়েন্স অ্যান্ড হিউম্যান রিসোর্স ডেভেলপমেন্ট, ক্রপ সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি, রসায়ন ও ফিশারিজে এ অনুপাত ১৪:১। সমাজকর্ম, উদ্ভিদবিজ্ঞান, লোকপ্রশাসন এবং গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে প্রতি ১৫ জন শিক্ষার্থীর জন্য রয়েছেন একজন শিক্ষক।
ইউজিসির সর্বশেষ পাঁচটি বার্ষিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, রাবির শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাতের কিছু উন্নতি হলেও তা ধারাবাহিক নয়। ৪৬তম প্রতিবেদনে অনুপাত ছিল ৩৩:১, ৪৭তম প্রতিবেদনে ৩৫:১, ৪৮তম প্রতিবেদনে ২৪:১, ৪৯তম প্রতিবেদনে ২০:১ এবং সর্বশেষ ৫০তম প্রতিবেদনে তা ২১:১।
শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সভাপতি অধ্যাপক ড. আকতার বানু বলেন, শিক্ষার মানের ওপর শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাতের সরাসরি প্রভাব রয়েছে। শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি হলে একজন শিক্ষকের পক্ষে পুরো শ্রেণিকক্ষ নিয়ন্ত্রণ এবং প্রত্যেক শিক্ষার্থীর শেখার প্রয়োজন আলাদাভাবে বিবেচনা করা কঠিন হয়ে পড়ে।
তিনি বলেন, সব শিক্ষার্থীর শেখার সক্ষমতা ও গতি এক নয়। অনুপাত কম থাকলে শিক্ষার্থীদের সমস্যা ও প্রয়োজনকে পৃথকভাবে গুরুত্ব দেওয়া সম্ভব হয়। কিন্তু দেশের উচ্চ জনসংখ্যা এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অধিকসংখ্যক শিক্ষার্থী ভর্তি হওয়ার কারণে কাঙ্ক্ষিত অনুপাত বজায় রাখা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ইনস্টিটিউশনাল কোয়ালিটি অ্যাসুরেন্স সেলের (আইকিউএসি) পরিচালক অধ্যাপক ডা. আবু রেজা বলেন, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাত ঠিক না থাকলে শিক্ষকদের ওপর অতিরিক্ত একাডেমিক চাপ পড়ে, যা পাঠদানের মানে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। কোনো বিভাগে শিক্ষার্থী বেশি হলেও শিক্ষক কম থাকলে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে যায়। তিনি বলেন, মাইক্রোবায়োলজিসহ কয়েকটি বিভাগে শিক্ষকসংকট প্রকট। আবার ইংরেজি ও ইতিহাসসহ কিছু বিভাগে অনুমোদিত শিক্ষক পদ থাকলেও দীর্ঘদিন নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি হয়নি। শূন্য পদগুলোতে দ্রুত নিয়োগ দেওয়া গেলে এসব বিভাগের সংকট অনেকটাই কমবে।
রাবির উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. আব্দুল আলিম বলেন, দীর্ঘদিন শিক্ষক নিয়োগ বন্ধ থাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাতে বড় ঘাটতি তৈরি হয়েছে। ২০১৮ থেকে প্রায় ২০২৪ সাল পর্যন্ত কয়েক বছর নিয়মিত নিয়োগ না হওয়ায় পরিস্থিতি আরো প্রকট হয়। তিনি বলেন, গত ১৮ থেকে ২০ মাসে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে বিভিন্ন বিভাগের শূন্য পদ পূরণে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তবে নতুন পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে ইউজিসির অনুমোদন প্রয়োজন।
উপ-উপাচার্য বলেন, আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত নিশ্চিত করতে শিক্ষকসংকট কমানো জরুরি। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে এবং প্রয়োজনীয় অনুমোদন পাওয়া সাপেক্ষে নিয়োগ প্রক্রিয়া আরও এগিয়ে নেওয়া হবে।