বাংলা গানের তুমুল জনপ্রিয় গায়িকা নাজমুন মুনিরা ন্যানসি। বাংলা গানে যার যাত্রা শুরু হয়েছিল রূপকথার মতো। রাজনীতি সচেতন এই গায়িকার জীবনে ঝড় আসতেও বেশি সময় লাগেনি। ঝড়ের বিপরীতে সংগ্রাম করে যাওয়া এই শিল্পী তার দীর্ঘ সংগ্রাম নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে একটি পোস্ট করেছেন।
তিনি লিখেছেন, ‘বয়স ১৮, বিবাহিত। শরীরের ওজন ৫০ কেজি। গান মুক্তি পাচ্ছে, মানুষ পছন্দ করছে। আমি পর্দার বাইরে আরামেই আছি। ১৯ বছর ৪ মাস বয়সে আমার কোল ঝলমল করে জন্ম নিল রোদেলা। সবার মুখে মুখে তখন গান ‘তোমারে দেখিলো পরানও ভরিয়া, আসমান জমিন দরিয়া।’ কন্যার জন্মের পরে তুমুল ব্যস্ততা, স্বাস্থ্যের দৃশ্যমান কোনো পরিবর্তন হোলো না! সাড়ে চার বছরের মেয়ে নিয়ে সিঙ্গেল মাদার হিসেবে আম্মাকে চিরদিনের জন্য হারালাম। তার ছয় মাসের মধ্যে ওজন ৫৪ কেজি থেকে ৬২ কেজিতে চলে গেল! পরিকল্পনাবিহীন পুনরায় বিয়ে এবং দ্বিতীয় বারের মাতৃত্ব, সেই সঙ্গে নায়লার জন্মের দুই মাস আগে আমার রাজনৈতিক ভাবনার উন্মোচন আর তার উপহার হিসেবে পুলিশের হয়রানি! ৬২ কেজি ওজনের আমি ২৫ বছর বয়সে দ্বিতীয় সন্তান জন্মের সময় ৮৩ কেজিতে পৌঁছালাম! হাঁটতে কষ্ট হতো, বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে পারতাম না, শুয়ে থাকলে একা একা এপাশ থেকে ওপাশ ফিরতে পারতাম না।’
বেগম খালেদা জিয়াকে নিয়ে একটি পোস্ট দেওয়ার পর একের পর এক হামলা মামলার শিকার হওয়ার পাশাপাশি ফ্যাসিবাদের অঘোষিত নিষেধাজ্ঞায় তার গানের ক্যারিয়ার হুমকির মুখে পড়ে যায়। সেই প্রসঙ্গ টেনে ন্যানসি লেখেন, ‘নায়লার জন্মের পর থেকেই আমার সংগ্রামী জীবন শুরু। সংগীতে ক্যারিয়ার নিভু নিভু, বিতর্কের তুঙ্গে আমি। সার্বিক পরিস্থিতির কারণে ১১ কেজি ওজন কোনো চেষ্টা ছাড়াই কমিয়ে তখন আমি ৭২ কেজি। সন্তানদের নিয়ে ব্যস্ত হতে চাইলাম। প্রায় ২৭ বছর ৫ মাস বয়সে তৃতীয় কন্যা আলিনার জন্ম হলো এবং জন্মের ১৭ দিন পরে ও মারা গেল। সংসার ভেঙে গেল কিন্তু আমি নিজের জন্য এবং আমার মেয়েদের জন্য ভাঙিনি। ২০২০ সালে কোভিডের সময় মনে হলো আবারও নতুন করে শুরু করব। সবার আগে নিজের যত্ন নেওয়া শুরু করলাম। এবার ব্যায়াম, প্রতিদিন দু ঘণ্টা হাঁটা আর খাওয়া কমিয়ে ওজন ৭৪ কেজি থেকে কমিয়ে ৬ মাসের মধ্যে ৬১ কেজিতে এলাম, ৩২ বছর বয়স আনন্দ নিয়ে উদযাপন করলাম।’
এরপর জীবনের প্রতিটি বাঁক নিয়ে সংক্ষেপে লেখেন, ‘২০২১ সালে তীব্র প্রেমে পড়লাম। জীবন আমাকে আবারও সুখী হবার সুযোগ দিল। মাত্র চার মাসের প্রেম শেষে পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতিতে ৬৬ কেজি ওজনের আমি ধুমধাম করে বিয়ে করলাম। বিয়ের এক বছরের মাথায় ৩৩ বছর ৬ মাস বয়সে অনেক আকাঙ্ক্ষার গুনগুন জন্ম নিল। ওজন বেড়ে আবার হলো ৭২ কেজি ! আব্বা-আম্মা বেঁচে নেই আর নায়লা আমার সঙ্গে থাকে না, এ দুটো ছাড়া আমার জীবনে আর কোনো অসম্পূর্ণতা নেই। আমি সুখী মানুষ, স্বামী এবং দুই কন্যা নিয়ে আমার সাজানো ছবির মতো জীবন।’
২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার জুলাই আন্দোলনের ফলে স্বৈরাচার পালাতে বাধ্য হয়। যার প্রভাব পড়ে ন্যান্সির জীবনেও। সেই প্রসঙ্গ টেনে এই গায়িকা লেখেন, ‘২০২৪ সালে স্বৈরাচারমুক্ত হলাম। তারপর গত দেড় বছরে নিজের ডিপ্লোমা শেষ করেছি, দেশের বাইরের একটি পাবলিক ইউনিভার্সিটিতে ব্যাচেলর ডিগ্রি করছি, চলচ্চিত্র জুরিবোর্ড সদস্য হয়েছি, নতুন কুঁড়িতে বিচারক হয়েছি। সব কিছুর জন্য স্রষ্টার প্রতি শোকর আদায় করি।’
ক্যারিয়ারে গতিশীল হওয়ার পাশাপাশি শারীরিক সুস্থতার বিষয়টি সামনে এনে জনপ্রিয় এই প্লেব্যাক শিল্পী লেখেন, ‘এবার আসি আমার বর্তমান ওজন নিয়ে। দেড় বছর আগে ওজন ছিল ৬৮ কেজি, গত ডিসেম্বর মাসে নিজের ৩৭ বছর জন্মদিন পালন করেছি ৫৫ কেজি ওজন নিয়ে, আজকের দিনে সেটা হয়েছে ৫১ কেজি। অবিসিটির জন্য ডাক্তারের পরামর্শ নিয়েছি, অ্যারিস্ট্রোফার্মা থেকে উইকিজেট আড়াই থেকে সাড়ে সাত মিলিগ্রাম পর্যন্ত ডোজ নিয়েছি। আমি শর্করা বন্ধ করিনি, ব্যায়াম করিনি বলে আমিষ প্রয়োজনের চেয়ে বাড়তি নেইনি, দৈনন্দিন খাবারে কোনো পরিবর্তন আনিনি অর্থাৎ ভাত বাদ দেইনি কিংবা পরিমাণেও কমাইনি। আমার প্ৰিয় দুধচা দু তিন কাপ করেও খেয়েছি। আমি শুধু ফাস্টিং উইন্ডো বড় করেছি। দ্রুত ওজন কমানোর জন্য অস্থির হইনি। পরিবারের সদস্যদের সহযোগিতা পেয়েছি, নিজেকে ভালোবেসেছি, পড়া ও গানে ব্যস্ত থেকেছি। প্রচুর মুভি দেখেছি, গান শুনেছি, ঘুরে বেড়িয়েছি, আয়নার সামনে সময় দিয়েছি! ওজন কমানো কোনো ম্যাজিক না।’ সবশেষে এই শিল্পী তার ভক্তদের উদ্দেশ্যে অনুপ্রেরণামূলক ভঙ্গিতে লেখেন, ‘নিজেকে সময় দিন, ডাক্তারের পরামর্শ নিন, অন্যের রুটিন অন্ধের মতো ফলো করতে যাবেন না। মানসিক সুস্থতা মায়েদের ভীষণ প্রয়োজন। ঘরে সুন্দর পরিবেশ নিশ্চিত করুন। সব মায়েদের জন্য ভালোবাসা।’
প্রসঙ্গত, নাজমুন মুনিরা সংগীত জগতে ন্যানসি নামে পরিচিত। তার সংগীত জীবন শুরু হয় ২০০৬ সালে হৃদয়ের কথা চলচ্চিত্রের গান গেয়ে। ২০০৯ সালের তার প্রথম অ্যালবাম ভালোবাসা অধরা মুক্তি পায়। ২০১১ সালের প্রজাপতি চলচ্চিত্রের গানে কণ্ঠ দিয়ে তিনি প্রথমবারের মতো জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন। এছাড়া মেরিল-প্রথম আলো পুরস্কার-এ ২০১০ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত টানা সাতবার তারকা জরিপে শ্রেষ্ঠ কণ্ঠশিল্পী (নারী) বিভাগে পুরস্কার অর্জন করেন।