আম্মাকে ছাড়া এ আমার দ্বিতীয় রমাদান।
সময় অদৃশ্য স্রোতের মতো বয়ে যায়। মনে হয় খুব বেশিদিন হয়নি আম্মা এই তো আমাদের মাঝেই ছিলেন। আরবি ১৪৪৫ হিজরির রমাদান ছিল আম্মার জীবনের শেষ রমাদান। আল্লাহর অশেষ মেহেরবানিতে পুরো মাসটি আম্মা সুস্থতার সঙ্গে কাটিয়েছিলেন। শান্ত মুখে আমাদের দিকে তাকিয়ে থাকতেন, দোয়া করতেন, স্নেহভরা কণ্ঠে খোঁজ নিতেন।
আম্মা আট-নয় বছর হাঁটতে পারতেন না, স্ট্রোকের কারণে কিন্তু আম্মার মুখে একচিলতে হাসির রেখায় প্রশান্তি আর কথার কোমলতা দেখে তা বোঝার উপায় ছিল না। মনে হতো যেন সাদা বেলি ফুলের মতো নির্মল এক মানুষ কথা বলছেন, হাসছেন। সন্তানদের জন্য আম্মার হৃদয়ে কত যে মায়া ছিল, তা ভাবলে আজও বিস্ময় জাগে।
সেই বছর ঈদের দিনটি ছিল আম্মার শেষ ঈদ। অথচ ব্যস্ততার কারণে সে ঈদের দিনটিতে যাওয়া হয়নি। নাহিদ; আমার মেজো ভাইয়ের আট বছরের ছেলে, ঈদে সারাদিন আমার কাছেই ছিল, ছোট্ট ফুপ্পির বাড়িতে সে ঈদের অতিথি ছিল। বিকালে তাকে বাড়ি পাঠানোর সময় রিকশায় তুলে দিই। যাওয়ার আগে নাহিদের জন্য ওর পছন্দের চকবার কিনে দিলাম আর আম্মার জন্য একটি কোণ আইসক্রিম।
পরে ফোন করে জিজ্ঞেস করলাম, ‘আম্মা, আইসক্রিম খেয়েছেন?’
আম্মা মৃদু স্বরে বললেন, ‘তুই কখন আসবি?’
সেই কথাটুকু শুনেই বুঝেছিলামÑআম্মার মন পড়ে আছে আমার অপেক্ষায়। তাই পরদিন সকালেই চলে গেলাম আম্মার কাছে। সেদিন কত কথা, কত হাসির স্নিগ্ধতা ছিল। সময় এভাবে দ্রুত বয়ে গেল। হঠাৎ আম্মা বললেন, চাপিলা মাছের ভুনা খেতে ইচ্ছে করছে। আমার ১৪ মাসের আয়েশাকে আম্মার খাটে বসিয়ে আমি নিজ হাতে মাছ কেটে রান্না করে দিলাম। আয়েশার সঙ্গে আম্মা কত কথা বলতেন, সেই টুকটাক কথা আর হাসির রিনিঝিনি রান্নাঘর থেকেও শুনতাম।
ঈদের পরদিন সেই দুপুরে যখন আমি আম্মার সামনে বসে মাছ কাটছিলাম, আম্মা ধীরে ধীরে সবার কথা বললেন। আমি শুধু শুনছিলাম। কী শান্ত, কী নির্মল ছিল সেই কথোপকথনের সময়টা। আজও মনে হয় এই তো সেদিনের কথা।
তারপর ঈদের সাত দিন পর, এক বিকালে আসরের ঠিক আগ মুহূর্তে, আমার আব্বাজানের বুকে মাথা রেখে আম্মা দুনিয়ার সফর শেষ করলেন। (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)
আজ আবার কদরের রাত ক্ষমা ও শান্তির বাণী নিয়ে এসেছে এই ধরার বুকে, ঈদের চাঁদ এই তো সামনে। চারদিকে আনন্দের আলো অথচ আমাদের ঘরে এক গভীর শূন্যতা ও মা না থাকা বেদনা স্থায়ী হয়ে আছে, যে বেদনা দোয়ার স্রোতে রবকে বারবার বলেÑহে আল্লাহ! আম্মার কবরকে জান্নাতের বাগান করে দিন।
হাদিসে আছেÑ
‘মানুষ যখন মারা যায়, তখন তার সব আমল বন্ধ হয়ে যায়, তবে তিনটি আমল বন্ধ হয় নাÑ
১. সদকায়ে জারিয়া, ২. এমন জ্ঞান যার দ্বারা মানুষ উপকৃত হয়, ৩. নেক সন্তান যে তার জন্য দোয়া করে। (সহিহ মুসলিম : ১৬৩১)
বাবা-মা সন্তানকে ঈমান, নৈতিকতা ও সৎপথ শেখান। সেই সন্তান যখন পৃথিবীতে বাবা-মায়ের অনুপস্থিতে মোনাজাতে বলেÑ‘হে আল্লাহ, আমার মা-বাবাকে ক্ষমা করুন ও লালন করুন সেরূপ যেরূপ তারা আমাকে শৈশবে লালিতপালিত করেছেন। তখন এই দোয়া পৃথিবী থেকে আসমানে পাঠানো এক বার্তা, যা রাব্বুল ইজ্জত বান্দাদের নিজ অনুগ্রহে রাব্বির হামহুমার দ্বারা শিখিয়েছেন।’
পৃথিবীতে আম্মা ছাড়াই ঈদ আসে ও যায়, আম্মার স্মৃতি আমার অন্তরে সেই একই সৌরভ ছড়ায়, স্মৃতির এ সফরেই আলোক-উজ্জ্বলতা ঈদ আনে হৃদয়ে।