সব বয়সি মানুষই আইসক্রিম খেতে ভালোবাসে। বিশেষ করে প্রচণ্ড গরমের সময় ছোটরা আইসক্রিম ছাড়া কিছুই বুঝতে চায় না। এ আইসক্রিম বিভিন্ন উপকরণ দিয়ে তৈরি করা হয়। সেগুলোর মধ্যে মূল উপকরণ হচ্ছে ক্রিম, মানে দুধ, চিনি আর নানা রকম সুগন্ধি। এছাড়া আইসক্রিমে বিভিন্ন স্বাদ পেতে চকোলেট, ভ্যানিলা, স্ট্রবেরি, বাদাম, ডিম ইত্যাদি মেশানো হয়।
আমরা এখন যেকোনো জায়গায় আইসক্রিম দেখতে পাই। কিন্তু একসময় শুধু রাজা আর ধনীরাই আইসক্রিম খেতেন। বিশেষ করে ফ্রিজ আবিষ্কৃত হওয়ার আগে আইসক্রিম ভীষণ দুর্লভ ছিল। এই আইসক্রিমের আবিষ্কারক কে বা কারা এবং কোথায়, কখন এর আবিষ্কার হয়েছিল, তা সঠিকভাবে জানা যায়নি। যেটুকু জানা যায়, রোমান সম্রাট নিরো ৫৪ সালে সম্রাট হওয়ার পর তার ভোজসভায় নানা রকম নতুন নতুন খাবারের প্রচলন করেন। সম্রাট তার রাজকীয় ভোজসভায় ‘মিষ্টি তুষার’ নামে এক খাবার পরিবেশনের ব্যবস্থা করেন। সেটি নিঃসন্দেহে আইসক্রিম আবিষ্কারের ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা ছিল। পাহাড়ের চূড়া থেকে তুষার সংগ্রহ করে তার মধ্যে ফলমূল, মধুসহ বিভিন্ন জিনিস মিশিয়ে তৈরি করা হতো এই ‘মিষ্টি তুষার’। এ কারণে সম্রাট নিরোই আইসক্রিম আবিষ্কারের সূত্রপাত করেছিলেন বলে অনেকের ধারণা।
অন্যদিকে, প্রখ্যাত ইতালীয় অভিযাত্রী মার্কো পোলোর সম্পর্কে শোনা যায়, তিনিই নাকি ইউরোপে আইসক্রিম তৈরির পদ্ধতি প্রবর্তন করেন। মূলত তিনি ১৭ বছর চীন ভ্রমণ শেষে দেশে ফিরে ১২৫৯ সালে তার ভ্রমণ-অভিজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তার বই থেকে জানা যায়, তিনি চীনে এক ধরনের ‘আঠালো দুধ’ দেখতে পেয়েছিলেন, যা দেখে তিনি খুব আশ্চর্য হয়েছিলেন। ধারণা করা হয়, এই আঠালো দুধ আসলে আইসক্রিমজাতীয় কিছু ছিল। আর মার্কো পোলোর হাত ধরেই ইউরোপে আইসক্রিম তৈরির ফর্মুলা প্রথম আসে।
১৬৬০ সালে ধনী ইউরোপীয়দের মধ্যে ক্রিম মেশানো এক ধরনের বরফখণ্ড ভীষণ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এই খাবারের কারিগররা ছিলেন ভীষণ বুদ্ধিমান। তারা সেই বরফখণ্ডকে বিভিন্ন নকশায় তৈরি করে বেশ চড়া দামে বিক্রি করতেন। বর্তমান যুগের আইসক্রিমের নানা আকৃতির পেছনে প্রথম পদক্ষেপ মনে হয় এটিই ছিল। ১৬৭০-এর দিকে ‘ফ্রানসিস্কো প্রকোপিয়ো’ নামের এক সিসিলীয় প্যারিসে আইসক্রিমের একটি দোকান চালু করেন। সে সময় আইসক্রিম মানুষের কাছে এতটাই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে, ১৭৭৬ সালের মধ্যে প্যারিসেই ২৫০টি আইসক্রিম তৈরির প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। আমেরিকায় আইসক্রিমের স্বীকৃতি মেলে ১৭৪৪ সালে। ওই বছর এক ডিনার পার্টিতে আইসক্রিম পরিবেশন করা হলে তা সবার মন জয় করে নেয়। এমনকি প্রেসিডেন্ট জর্জ ওয়াশিংটন, টমাস জেফারসনের মতো নামিদামি ব্যক্তিরাও পরবর্তী সময়ে আইসক্রিমের ভক্ত হয়ে ওঠেন। এরপর ১৮৫০ সালে জ্যাকব ফাসেল নামের এক ভদ্রলোক বাণিজ্যিকভাবে আইসক্রিম তৈরির একটি কারখানা চালু করেন। তখন থেকেই আইসক্রিমের প্রচলন বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে। ধীরে ধীরে আইসক্রিম মানুষের কাছে একটি জনপ্রিয় খাবার হয়ে ওঠে। বর্তমানে আইসক্রিম তৈরিকারকরা বিভিন্ন উপাদান দিয়ে আইসক্রিম তৈরি করে মানুষকে চমকে দিচ্ছেন। আইসক্রিমের এমন মন ভোলানো স্বাদ সহজে ভোলা যায় না। স্বাদের কারণেই আইসক্রিম সবার মন জয় করে নিয়েছে।