টুনির মা খুব গরিব। বাবা মারা গেছে টুনির জন্মের কিছুদিন পরই। টুনির মা তাই মানুষের বাড়ি কাজ করে কোনোমতে ছোট্ট সংসারটা চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন।
টুনি এবার বায়না ধরে বলেছে, ‘মা, আমার এবারের জন্মদিনে একটা লাল টুকটুকে ফ্রক কিনে দিবা!’
টুনির কথায় মা ম্লান হাসেন; বলেন, ‘দিব রে মা, দিব। তুই কিছু চিন্তা করিস না। শুধু মন দিয়ে লেখাপড়া কর।’
কিন্তু মাস শেষে তিনি বেতন পান মাত্র এক হাজার পাঁচশ টাকা। ঘর ভাড়া দিতেই তো প্রায় সবটা শেষ হয়ে যায়। একটা লাল ফ্রক কিনতে লাগবে কমপক্ষে ছয়শ টাকা! এত টাকা দিয়ে ফ্রক কিনলে সংসারের খরচ চালাবেন কী করে—ভাবতে থাকেন মা।
এরই মধ্যে এসে হাজির হলো জন্মদিনের আগের রাত। টুনি তখন গভীর ঘুমে অচেতন। মা না ঘুমিয়ে টুনির পাশ থেকে চুপচাপ উঠে পড়লেন। তার বাক্সে লাল টুকটুকে পুরোনো একটা লাল শাড়ি তুলে রাখা আছে, যে শাড়িটা টুনির বাবা বিয়ের সময় দিয়েছিলেন। সেটা যত্ন করে তুলে রেখেছিলেন তিনি। সেই শাড়ি বের করে কাটলেন। সারা রাত জেগে সেলাই করলেন। সেলাই করতে করতে সুঁই ফুটে গেল আঙুলের ডগায়। রক্ত ঝরল খানিকটা। মা তবু থামলেন না। আঁচল দিয়ে মুছে আবার কাজ শুরু করলেন।
সকালে টুনি ঘুম থেকে উঠে দেখে, তার মাথার কাছে একটা চমৎকার লাল ফ্রক। দেখেই খুশিতে লাফিয়ে উঠল টুনি; বলল, ‘মা, কী সুন্দর ফ্রক! কই পেলে তুমি?’
মা মিষ্টি একটা হাসি দিয়ে বললেন, ‘তোর জন্য পরিরা দিয়ে গেছে রাতে।’
শুনে টুনি মাকে আনন্দে জড়িয়ে ধরল।
সকালে কিছু একটা মুখে দিয়ে টুনি সেই ফ্রক পরে স্কুলে গেল। স্কুলে যাওয়ার পরে টুনিকে দেখে সবাই বলল, ‘বাহ! ভারি সুন্দর তো! তোমাকে খুব মানিয়েছে এই জামায়!’
শুনে টুনির বুকটা গর্বে ফুলে উঠল।
দুপুরে টিফিনের সময় টুনি দেখল, ফ্রকের পাড়ে ছোট্ট এক ফোঁটা শুকনো রক্ত জমাট হয়ে রয়েছে।
বাড়ি ফিরে টুনি মায়ের হাতটা কাছে নিয়ে দেখল, তার বুড়ো আঙুল পুরোনো কাপড় দিয়ে প্যাঁচানো। টুনি সব বুঝে গেল। সে তখন ফিসফিস করে বলল, ‘মা, পরিদের হাতেও কি সুঁই ফোটে?’
মা টুনিকে বুকের সঙ্গে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলেন। আদর করলেন। মুখে কিছু বললেন না। তখন মায়ের আঁচলের গন্ধে টুনির নাক ভরে গেল। মায়ের শরীরের ঘাম, কম দামি সাবান, আর তার সঙ্গে একটু রক্তের গন্ধ...
তারপর কেটে গেছে ২০ বছর। মায়ের সেই গন্ধটা টুনি আজও বোতলে ছিপি দিয়ে ভরে রাখতে চায়। কারণ ‘টুনি’ মানে ‘মেহজাবিন রহমান টুনি’ এখন বড় হয়েছে। পড়াশোনা করে অনেক বড় ডাক্তার হয়েছে।
টুনি প্রত্যেক জন্মদিনে অনাথ বাচ্চাদের লাল টুকটুকে ফ্রক কিনে দেয়। সেদিন ওদের জন্য ভালো ভালো খাবারের আয়োজন করে, নানারকম উপহার দেয়; সারা দিন তাদের সঙ্গে হইচই করে সময় কাটায়।
লাল ফ্রক কেনার পরে টুনি একটা কাজ করে। আর তা হলো প্রত্যেক ফ্রকের পাড়ে নিজের হাতে এক ফোঁটা লাল রঙ মেখে দেয়।
বিষয়টা খেয়াল করে টুনির সহকারী নার্স টুনিকে জিজ্ঞেস করে, ‘ম্যাডাম, প্রতিবার আমি খেয়াল করি বিষয়টা। কিন্তু ফ্রকে এই রঙ কেন দেন বুঝতে পারি না!’
টুনি ওরফে মেহজাবিন রহমান ঠোঁটের কোনায় এক চিলতে হাসি ফোটায়। হাসলেও তার চোখ দুটো ভিজে যায় অশ্রুতে। ধরে আসা গলায় বলে, ‘এইটা হলো পরিদের সাইন। মায়েরা হলো আকাশের পরি। হাতে সুঁই ফুটলেও ওড়া থামায় না তারা। আর সেই পরি হলেন আমার মা। তিনি একদিন নিজহাতে তার প্রিয় বিয়ের শাড়ি কেটে আমাকে এমন একটা লাল টুকটুকে ফ্রক বানিয়ে দিয়েছিলেন সারা রাত জেগে। এই কাজ করতে গিয়ে তার হাতে সুঁই ফুটে ক্ষতবিক্ষত হয়েছিল। তবু তিনি তার মেয়ের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য এতটুকু থামেননি। বলতে পার, এই এক ফোঁটা লালই আমার মায়ের সাইন; মায়ের স্মৃতি। এটুকু নিয়েই রোজ বেঁচে উঠি।’