আমরা যারা খুবই সাধারণ তারা অল্পতেই হতাশ হয়ে পড়ি; কোনো কাজে দু-একবার ব্যর্থ হলে ভাবি ‘আমাকে দিয়ে আর কিছু হবে না।’ কিন্তু এমন হতাশা প্রকাশ করার পেছনে কোনো যুক্তি নেই। কারণ কাজ করার জন্য আমাদের হাত, পা, চোখ, মস্তিষ্কসহ আরো অনেক কিছু রয়েছে। অথচ এমন অনেক মানুষ ছিলেন যাদের পুরোপুরি শারীরিক সক্ষমতা ছিল না। কোনো না কোনোভাবে তারা প্রতিবন্ধী ছিলেন। তবুও নিজেকে সফল করার জন্য প্রাণপণ লড়েছেন তারা। অবশেষে সফলও হয়েছেন। আজ আমরা এমন কয়েকজন সফল মানুষের কথা জানব।
মাইগেল ডি কারভেনটিস (১৫৪৭-১৬১৬)
কারভেনটিস (Miguel De Cerventics) ছিলেন স্পেনের এক বিখ্যাত লেখক। ‘ডন কুইকসট’ নামে এক গল্পের জন্য বিশ্ববিখ্যাত তিনি। এক যুদ্ধে তিনি তার এক হাত হারিয়েছিলেন; কিন্তু সেজন্য তার সৃষ্টিকর্ম থেমে থাকেনি। এক হাত না থাকা সত্ত্বেও লিখে গেছেন বহু গল্প-উপন্যাস।
লুইগ ভ্যান বেথোফেন (১৭৭০-১৮২৭)
বিশ্বের এক বিখ্যাত সংগীতজ্ঞ হিসেবে আজও মানুষ বেথোভেনকে স্মরণ করে। বেথোভেন ছিলেন অকল্পনীয় সব সুরের সুরকার। অথচ ১৮১৭ সালে তিনি পুরোপুরি বধির হয়ে যান। শ্রবণ প্রতিবন্ধী একজন মানুষ কীভাবে সুরের সৃষ্টি করতেন, তা আজও মানুষের মনে বিস্ময়ের সৃষ্টি করে যাচ্ছে। বলা হয়, বেথোভেন সুর সৃষ্টি করতেন হৃদয় থেকে। হয়তো এ কারণেই নিজের কানে না শুনেই তিনি অমর সব সুর সৃষ্টি করে যেতে পেরেছেন।
লুইস ব্রেইল (১৮০৯-১৮৫২)
ব্রেইল (Louis Brille) ছিলেন অন্ধ । তবে অন্ধদের জন্য পড়ালেখা করা অসম্ভব, এ কথা তিনি বিশ্বাস করতেন না। তাই দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের জন্য তিনি আঙুল ছুঁয়ে ছুঁয়ে পড়ে যাওয়া সম্ভব—এমন এক পদ্ধতি আবিষ্কার করেন। এই পদ্ধতির নাম ব্রেইল পদ্ধতি।
সারাহ বার্নহারড (১৮৪৪-১৯২৩)
সারাহ বার্নহারড (Sarah Bernhard) ছিলেন এক ফরাসি অভিনেত্রী। ১৯১৪ সালে এক দুর্ঘটনায় তিনি তার এক পা হারিয়েছিলেন। তবে সেজন্য সারাহ অভিনয়জগৎ থেকে বিদায় নেননি। এর পরও আমৃত্যু তিনি কৃতিত্বের সঙ্গে অভিনয় করে গেছেন।
টমাস আলভা এডিসন (১৮৪৭-১৯৩১)
টমাস আলভা এডিসন (Thomas Alva Edison) ছিলেন সর্বকালের সেরা বিজ্ঞানী। কিশোর বয়সে রেলগাড়ির বগিতে বসে এসিড নিয়ে কাজ করার সময় বগির ভেতর আগুন ধরে যায়। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে গার্ড তাকে থাপ্পড় মারে। ফলে তিনি বধির হয়ে যান এবং চিরদিনের জন্য শ্রবণক্ষমতা হারান। এত বড় ক্ষতি হওয়ার পরও আত্মবিশ্বাসের জোরে গবেষণা চালিয়ে তিনিই বৈদ্যুতিক বাতি, সিনেমা প্রজেক্টর, গ্রামোফোনসহ দুইশরও বেশি আবিষ্কার করেন।
হেলেন কেলার (১৮৮০-১৯৬৮)
হেলেন কেলারের নাম জানে না, শিক্ষিত সমাজে এমন মানুষ নেই বললেই চলে। তার পুরো নাম হেলেন অ্যাডামস কেলার (Helen Adams keller)। তিনি চোখে দেখতে পেতেন না, সেইসঙ্গে কানেও শুনতে পারতেন না। অন্ধ ও বধির হওয়া সত্ত্বেও ২৪ বছর বয়সে স্নাতক এবং পরবর্তী সময়ে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন। কী দুর্নিবার মনের জোর থাকলে কোনো মানুষ একসঙ্গে দুটি প্রতিবন্ধকতা জয় করতে পারেন—হেলেন কেলার তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তিনি ছিলেন বিখ্যাত লেখক, সমাজসেবক ও রাজনীতিবিদ। আমৃত্যু তিনি প্রতিবন্ধী শিশুদের অধিকার আদায়ের জন্য সংগ্রাম করে গেছেন। তাকে প্রেসিডেন্সিয়াল মেডেল অব ফ্রিডমে ভূষিত করা হয়।
ফ্রাঙ্কলিন ডি রুজভেল্ট (১৮৮২-১৯৪৫)
চারবার যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন ফ্রাঙ্কলিন ডি রুজভেল্ট (Franklin D. Roosevelt)। অথচ তিনি ছিলেন পোলিও-আক্রান্ত রোগী। জীবনের বেশিরভাগ সময় তাকে হুইলচেয়ারে বসে কাটাতে হয়েছে। তবে রাষ্ট্র পরিচালনায় ফ্রাঙ্কলিনের এ রোগ কোনো প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারেনি। আত্মবিশ্বাসের জোরে তিনি সব সমস্যাকে জয় করেছিলেন।