১৭৫৭ সালের ২ জুলাই। দিনটি বাংলা, বিহার, উড়িষ্যার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার শাহাদাত দিবস। এই তারিখে ইংরেজ সেনাধ্যক্ষ লর্ড ক্লাইভ ও নবাব সিরাজউদ্দৌলার প্রধান সেনাপতি মীর জাফর আলি খানের মিলিত ষড়যন্ত্রে মীর জাফরপুত্র মিরনের হুকুমে মোহাম্মদী বেগ নামক এক বিশ্বাসঘাতক নির্মমভাবে নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে শহীদ করে। সিরাজ হত্যার মধ্য দিয়ে বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার স্বাধীনতার বিলুপ্তি ঘটে। শুধু কি তাই? সিরাজ হত্যাকাণ্ডের পর সমগ্র ভারতবর্ষই স্বাধীনতা হারায়। ধীরে ধীরে যুদ্ধ ও ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে ইংরেজরা দখল করে নেয় বাংলাসহ সমগ্র ভারতবর্ষ।
১৭৫৭ সালের ২৩ জুন দিনটি ছিল বৃহস্পতিবার। এদিন পলাশীর আমবাগানে সংঘটিত যুদ্ধে নিজস্ব লোকদের ষড়যন্ত্রের কারণে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয় হয় এবং বাংলা হারায় স্বাধীনতা। মীর জাফর, রাজবল্লভ, রায় দুর্লভ, উমিচাঁদ, মীর কাসিম ও জগৎ শেঠদের মিলিত বিশ্বাসঘাতকতার জন্যই নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয় ঘটে। পলাশীর যুদ্ধে কতটা বেঈমানি হয়েছে, তা নবাব সেনাবাহিনী ও ইংরেজ সৈন্যসংখ্যার তালিকা দেখেই বোঝা যায়।
বাংলার নবাব সিরাজউদ্দৌলার সৈন্যসংখ্যা ছিল ৫০ হাজার। এর মধ্যে ৩৫ হাজার পদাতিক, ১৫ হাজার অশ্বারোহী ও ৫৩টি কামান। অন্যদিকে ক্লাইভ মাত্র তিন হাজার সিপাহি নিয়ে নবাব সিরাজের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে। সব মিলিয়ে ইংরেজ সৈন্যদের মধ্যে ছিল ২ হাজার ২০০ সিপাহি ও ৮০০ অশ্বারোহী। বিশ্বাসঘাতক সেনাপতিদের জন্যই নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয় ঘটে। বাংলা হারায় স্বাধীনতা।
নবাব সিরাজ পলাশীর যুদ্ধে পরাজিত হন, এ কথা সত্য। কিন্তু আবারও যুদ্ধের প্রস্তুতিতে সৈন্য সংগ্রহ করার জন্য তিনি যুদ্ধক্ষেত্র থেকে বের হন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত নবাব সিরাজউদ্দৌলা শত্রুদের হাতে ধরা পড়েন। পরবর্তী সময়ে ১৭৫৭ সালের ২ জুলাই মুর্শিদাবাদে তাকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়। মীর জাফর, জগৎ শেঠ ও রাজবল্লভরা শুধু সিরাজউদ্দৌলাকে হত্যা করেই থামেনি, তারা সিরাজউদ্দৌলার ছোট ভাই মির্জা মেহেদীকেও কাঠচাপা দিয়ে হত্যা করে। তখন মির্জা মেহেদীর বয়স ছিল মাত্র ১৫ বছর!
সিরাজউদ্দৌলার হত্যার পরে তার স্ত্রী বেগম লুৎফুন্নেসা, সিরাজমাতা আমিনা বেগম, নানি শরফুন্নেসা, সিরাজের চার বছরের মেয়ে উম্মে জোহরা ও খালা ঘসেটি বেগমকে ঢাকার জিঞ্জিরায় কারাগারে পাঠায় মীর জাফর-জগৎ শেঠচক্র।
এরপর ১৭৮০ সালে ঢাকা থেকে মুর্শিদাবাদে নেওয়ার কথা বলে নৌকায় তোলা হয় নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরিবারের কতিপয় সদস্যকে। এরপর ধলেশ্বরী নদীর মাঝে এনে নৌকা ডুবিয়ে দিয়ে তাদের হত্যা করা হয়। অন্যদিকে নবাব সিরাজের স্ত্রী বেগম লুৎফুন্নেসা ১৭৯০ সালে নামাজরত অবস্থায় নবাব সিরাজের কবরের পাশে মারা যান।
নবাব সিরাজউদ্দৌলার জন্ম ১৭৩৩ সালে। নানা আলীবর্দী খানের মৃত্যু হলে ১৭৫৬ সালের ১০ এপ্রিল সিরাজ বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার মসনদে বসেন। মৃত্যুর সময় তার বয়স হয়েছিল মাত্র ২৪ বছর।
১৭৫৭ সালের ২ জুলাই মুর্শিদাবাদের জাফরগঞ্জ প্রাসাদে নবাব সিরাজকে শহীদ করে তার লাশ হাতির পিঠে তুলে নিয়ে শহরবাসীকে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখায় নিষ্ঠুর খুনিরা। একজন সিরাজপ্রেমিক, যার নাম মির্জা জয়নুল আবেদীন, তিনি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নবাব সিরাজউদ্দৌলার লাশ দাফন করেন।
যেখানে নবাব সিরাজউদ্দৌলা, নবাব আলীবর্দী খান, মির্জা মেহেদী, শরফুন্নেসা ও আমিনা বেগম চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন, সে স্থানকে বলা হয় খোশবাগ। এই খোশবাগেই শায়িত আছেন বাংলা, বিহার, উড়িষ্যার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলা। মহান আল্লাহ তাকে এবং তার আপনজনদের বেহেশত নসিব করুন।