ডায়রিয়া সৃষ্টিকারী একটি পরজীবীর প্রাদুর্ভাব বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের অর্ধেকেরও বেশি অঙ্গরাজ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। গত কয়েক সপ্তাহে দেশটিতে হাজার হাজার মানুষ এই পরজীবীতে সংক্রমিত হয়েছেন।
খালি চোখে দেখা যায় না এমন এক পরজীবীর কারণে এই সংক্রমণ হয়, যার নাম ‘সাইক্লোস্পোরিয়াসিস’। এই রোগের প্রধান উপসর্গ হলো বারবার পাতলা, পানির মতো ও তীব্র ডায়রিয়া হওয়া।
সাধারণত এই পরজীবীযুক্ত দূষিত খাবার বা পানি গ্রহণের মাধ্যমে মানুষ এই ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের ৩১টি অঙ্গরাজ্যে এখন এই প্রাদুর্ভাব চলছে। এর মধ্যে মিশিগান অঙ্গরাজ্যের পরিস্থিতি সবচেয়ে গুরুতর। গতকাল শুক্রবার রাজ্য কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সেখানে মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যে ১ হাজারের বেশি মানুষের শরীরে এই সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক এই প্রাদুর্ভাবে যুক্তরাষ্ট্রে এখন পর্যন্ত কোনো মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়নি।
সংক্রমণের নির্দিষ্ট উৎস এখনো শনাক্ত করা যায়নি। তবে অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা গেছে, কাঁচা ফল ও সবজির মতো পণ্য থেকে ছড়ানো খাদ্যবাহিত সংক্রমণের সাথে এর সম্পর্ক রয়েছে।
কোথায় কত আক্রান্ত?
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি) গত বৃহস্পতিবার একটি তথ্য প্রকাশ করেছে। সেই অনুযায়ী, গত ১ মে থেকে ৯ জুলাই পর্যন্ত দেশটিতে সাইক্লোস্পোরিয়াসিসের ৮৪৩টি নিশ্চিত সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে।
তবে প্রকৃত আক্রান্তের সংখ্যা আরো কয়েক শ’ হতে পারে। জনস্বাস্থ্য সংস্থাটি গতকাল শুক্রবার জানায়, তারা ১ হাজার ৫০০-র বেশি সম্ভাব্য সংক্রমণের বিষয়ে অবগত রয়েছে। তবে এগুলো নিশ্চিত করতে আরো বিশ্লেষণের প্রয়োজন।
সিডিসি জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত কোনো মৃত্যুর ঘটনা না ঘটলেও ৮৬ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছে।
মিশিগানের পর সবচেয়ে বেশি সংক্রমণ দেখা গেছে নিউইয়র্কে। রাজ্যের স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, ৮ জুলাই পর্যন্ত সেখানে প্রায় ৩০০ সংক্রমণের ঘটনা রিপোর্ট করা হয়েছে।
এছাড়া ইলিনয় অঙ্গরাজ্যে ৭ জুলাই পর্যন্ত ১৪১টি সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তারা এই সংখ্যাকে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি বলে উল্লেখ করেছেন। অন্যদিকে ওহাইও অঙ্গরাজ্যে ১৭৭টি সংক্রমণ রিপোর্ট করা হয়েছে।
প্রকৃত আক্রান্তের সংখ্যা সরকারি হিসাবের চেয়ে বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কারণ অনেকেই চিকিৎসা না নিয়েই সুস্থ হয়ে যান এবং তাদের পরীক্ষা করা হয় না। সিডিসি জানিয়েছে, নতুন তথ্য আসতে থাকায় সংক্রমণের সংখ্যা আরো বাড়বে।
সাইক্লোস্পোরা কী ও কীভাবে ছড়ায়?
সিডিসি জানিয়েছে, সাইক্লোস্পোরিয়াসিস হলো অন্ত্রের একটি সংক্রমণ। এটি সাইক্লোস্পোরা নামের একটি পরজীবীর কারণে হয়।
দূষিত খাদ্য বা পানি গ্রহণের মাধ্যমে মানুষ এই পরজীবীতে আক্রান্ত হয়। এই রোগ সাধারণত প্রাণঘাতী নয় এবং অন্যান্য খাদ্যবাহিত রোগের তুলনায় এটি কম দেখা যায়।
আক্রান্ত ব্যক্তির মধ্যে উপসর্গ দেখা দিতে পারে, আবার নাও দিতে পারে। তবে লক্ষণ প্রকাশ পেলে সাধারণত তীব্র ডায়রিয়া হয় এবং ঘন ঘন পায়খানা হতে পারে। চিকিৎসা না করলে এই রোগ কয়েক দিন থেকে এক মাসেরও বেশি সময় স্থায়ী হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে উপসর্গ কমে যাওয়ার পর আবার ফিরে আসতে পারে। সাধারণত সংক্রমণের প্রায় এক সপ্তাহ পর রোগের লক্ষণ প্রকাশ পায়।
জন হপকিন্স সেন্টার ফর হেলথ সিকিউরিটি-এর মহামারিবিদ ডা. ক্যাটলিন রিভার্স জানান, এই রোগ একজন থেকে আরেকজনের মধ্যে সরাসরি ছড়ায় না।
গত ৮ জুলাই প্রকাশিত এক নিউজলেটারে তিনি লিখেছেন, এই পরজীবী শুধু দূষিত খাদ্য বা পানি গ্রহণের ফলেই মানুষের শরীরে সংক্রমিত হয়।
প্রাদুর্ভাবের কারণ ও ঝুঁকিপূর্ণ খাবার
সিডিসি জানিয়েছে, যারা আক্রান্ত হয়েছেন তারা সবাই যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে খাবার খাওয়ার পর অসুস্থ হয়েছেন। অসুস্থ হওয়ার আগের ১৪ দিনের মধ্যে তারা কোনো বিদেশ ভ্রমণ করেননি। তবে এখন পর্যন্ত কোনো নির্দিষ্ট ফল, সবজি, চাষি বা সরবরাহকারীকে সংক্রমণের উৎস হিসেবে শনাক্ত করা যায়নি।
ডা. ক্যাটলিন রিভার্স লিখেছেন, এই ধরনের দূষণ সাধারণত খামারে বা সেচের পানির মাধ্যমে ঘটে। ফলে সংক্রমণের প্রকৃত উৎস খুঁজে বের করা বেশ কঠিন হয়ে পড়ে।
এর আগে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় এই পরজীবীর প্রাদুর্ভাবের পেছনে যেসব খাদ্যের সম্পর্ক পাওয়া গেছে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে—
সুরক্ষিত থাকার উপায়
সংক্রমণ দ্রুত বাড়তে থাকায় মিশিগান অঙ্গরাজ্যের স্বাস্থ্য বিভাগ রেস্তোরাঁ এবং রান্নাঘরগুলোর জন্য কিছু পরামর্শ দিয়েছে। কাঁচা ফল ও সবজি প্রস্তুত বা পরিবেশনের সময় ঝুঁকি কমাতে এই পদক্ষেপগুলো নিতে বলা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—
যুক্তরাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফডিএ) জানিয়েছে, শুধু পানি দিয়ে ফল ও সবজি ধুলে এই পরজীবী পুরোপুরি দূর না-ও হতে পারে।
তবুও সিডিসি ফল ও সবজি ভালোভাবে ধুয়ে খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছে। এর পাশাপাশি যাদের ডায়রিয়া হচ্ছে, তাদের দ্রুত চিকিৎসকের সাথে যোগাযোগ করে সাইক্লোস্পোরা সংক্রমণের বিষয়ে পরামর্শ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা।
এএম