সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিজ্ঞাপনে দিন দিন বাড়ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি মানুষের ছবি ও ভিডিওর ব্যবহার। প্রযুক্তির এই বিস্তার যেমন বিজ্ঞাপন ও সৃজনশীলতার নতুন সুযোগ তৈরি করছে, তেমনি অবাস্তব সৌন্দর্যের মানদণ্ড আরো শক্তিশালী করে তরুণদের শরীর নিয়ে উদ্বেগ ও অসন্তোষ বাড়াতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
মানসিক ব্যাধি থেকে সুস্থ হয়ে ওঠা মিয়া পেরুমাল নামে এক শিক্ষার্থী বলেন, গত এক বছরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অত্যন্ত পাতলা ও সুন্দর এআই-নির্মিত মানুষের ছবি তার চোখে পড়েছে। এসব ছবির নিচে অনেক সময় ১২ বছর বয়সী মেয়েদের মন্তব্য দেখা যায়—‘স্বপ্নের মতো শরীর’, ‘খাবার ও জীবনযাপনের রুটিন দাও, আমিও এমন হতে চাই।’
মিয়া বলেন, বিষয়টি তার কাছে খুবই দুঃখজনক মনে হয়েছে। কারণ এআই দিয়ে তৈরি শরীরের আদল বাস্তবে অর্জন করা অনেক ক্ষেত্রেই অসম্ভব। তিনি বলেন এটি শুধু এআই, বাস্তব নয়’— তবে এ কথা বললেই সমস্যার সমাধান হয় না।
তিনি বলেন, খাওয়া-দাওয়া সংক্রান্ত মানসিক ব্যাধিতে আক্রান্ত ব্যক্তির চিন্তা সব সময় যুক্তির পথে চলে না। তাই তরুণদের সবকিছু নিয়ে সতর্ক থাকা এবং অনলাইনে দেখা বিষয়কে প্রশ্ন করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
ছোটবেলার তুলনা, এবার এআইয়ের সঙ্গে
এআই নিয়ে উদ্বিগ্ন শুধু তরুণরাই নন, অভিভাবকরাও। ৪১ বছর বয়সী কেলি ওয়াটস বলেন, কিশোর বয়সে তিনিও নিজের চেহারা ও শরীর নিয়ে আশপাশের মানুষ এবং ম্যাগাজিনের মডেলদের সঙ্গে নিয়মিত তুলনা করতেন। এখন তার আশঙ্কা, ১১ বছর বয়সী ছেলে অস্কারও অনলাইনে তৈরি ‘নিখুঁত’ শরীরের ছবির সঙ্গে নিজেকে তুলনা করতে শুরু করতে পারে।
বিপণন খাতে কাজ করা কেলি বলেন, ব্যবসায়িক বিজ্ঞাপনে এআই দিয়ে তৈরি মানুষের ছবি এখন প্রায়ই দেখা যায়। কিন্তু অনেক সময় সেগুলোতে এআই ব্যবহারের বিষয়টি উল্লেখ করা থাকে না। ফলে কোনটি বাস্তব আর কোনটি কৃত্রিম, তা বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে।
তিনি বলেন, প্রথমদিকে এসব ছবি এআই দিয়ে তৈরি—এটা তিনি বুঝতে পারতেন না। কিন্তু এখন নিয়মিত এমন ছবি দেখতে দেখতে বিষয়টি তার কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
কেলির ছেলে অস্কার রাগবি খেলতে ভালোবাসে। তার বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সে বুঝতে শুরু করেছে যে তার কিছু বন্ধু তার চেয়ে লম্বা। এখনো সে নিজের শরীর নিয়ে কোনো উদ্বেগ প্রকাশ করেনি। তবে কেলির আশঙ্কা, অনলাইনে এআই দিয়ে তৈরি চরিত্রগুলো তার সন্তানের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
অস্কার এখনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে না। তবে ইউটিউবের বিভিন্ন কনটেন্টের মধ্য দিয়েও এআই-নির্মিত ছবি ও ভিডিও তার কাছে পৌঁছে যেতে পারে বলে মনে করেন কেলি। তার মতে, বাস্তব ফুটবলারদের সিক্স প্যাক শরীরই যেখানে শিশুদের ওপর প্রভাব ফেলছে, সেখানে অবাস্তবভাবে নিখুঁত এআই-নির্মিত মানুষের ছবি আরো বেশি চাপ তৈরি করতে পারে। শিশুরা তখন ভাবতে পারে, ‘আমি কি কখনো এমন হতে পারব?’ কেলি বলেন, কোনো মানুষ বা কোনো কিছুই নিখুঁত নয়। তিনি চান না তার ছেলে এমন ধারণা নিয়ে বড় হোক যে তাকে অবশ্যই নিখুঁত হতে হবে।
অবাস্তব সৌন্দর্যের মানদণ্ড আরো সংকীর্ণ হতে পারে
ইউডব্লিউই ব্রিস্টলের সেন্টার ফর অ্যাপিয়ারেন্স রিসার্চের মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক ফিলিপ্পা ডিডরিখস বলেন, অন্যদের সঙ্গে তুলনা করার প্রবণতা মানুষের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। কিন্তু সেই তুলনার ভিত্তি যদি অত্যন্ত সংকীর্ণ সৌন্দর্যের মানদণ্ড হয়, তাহলে অনেক মানুষই মনে করবেন তারা সেই মানদণ্ড পূরণ করতে পারছেন না।
তার মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তৈরি বা ডিজিটালভাবে নির্মিত ছবির ক্ষেত্রে সমস্যা আরো বেশি। কারণ এসব ছবির অনেকগুলোই বাস্তব জীবনে আদৌ অস্তিত্বশীল নয়। মানুষ যখন নিজের চেহারা বা শরীরকে এমন ছবির সঙ্গে তুলনা করে এবং নিজেকে পিছিয়ে মনে করে, তখন আত্মবিশ্বাস কমে যেতে পারে এবং নিজের চেহারা নিয়ে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হতে পারে।
ডিডরিখস বলেন, এআইকে যদি বৈচিত্র্য ও অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করার মতোভাবে ব্যবহার করা হয়, তাহলে এর ইতিবাচক দিকও রয়েছে। কিন্তু সেভাবে নির্দেশনা না দিলে এআই সাধারণত তার প্রশিক্ষণ ডেটায় থাকা প্রচলিত ও সংকীর্ণ সৌন্দর্যের ধারণাকেই অনুসরণ করতে পারে।
ফলে গায়ের রং, লিঙ্গ, যৌন পরিচয় কিংবা স্বতন্ত্র মুখাবয়বের মতো বৈচিত্র্য উপেক্ষিত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। আর এ ধরনের প্রবণতা সমাজে আগে থেকেই থাকা সৌন্দর্যের পক্ষপাতকে আরো শক্তিশালী করতে পারে।
এআই ছবি চেনার উপায় কী?
বিশেষজ্ঞদের মতে, এআই-নির্মিত ছবিতে কিছু লক্ষণ খেয়াল করলে সেগুলো শনাক্ত করা সম্ভব। ত্বকের অস্বাভাবিক মসৃণতা, চোখের গঠন, চুলের বিশেষ করে কোঁকড়ানো চুলের অস্বাভাবিক দেখানো এবং ত্বকে দাগ বা লোমকূপের সম্পূর্ণ অনুপস্থিতি এআই ছবির ইঙ্গিত হতে পারে। তবে প্রযুক্তি দ্রুত উন্নত হওয়ায় এসব লক্ষণও ধীরে ধীরে শনাক্ত করা কঠিন হয়ে উঠছে।
ডিডরিখস বলেন, কিশোর-কিশোরীরা প্রযুক্তি সম্পর্কে সচেতন এবং অনেক ক্ষেত্রে তারা প্রাপ্তবয়স্কদের চেয়েও বেশি জানে। কিন্তু কোনো ছবি এআই দিয়ে তৈরি—এটা জানা মানেই সেই ছবির মতো দেখতে চাওয়ার আকাঙ্ক্ষা বন্ধ হয়ে যাবে, এমন নয়।
তার পরামর্শ, অনলাইনে কোনো ছবি বা বিজ্ঞাপন দেখার পর নিজেকে প্রশ্ন করা উচিত—এটি কি আমাকে ভালো অনুভব করাচ্ছে, অনুপ্রাণিত করছে? নাকি নিজের সম্পর্কে আমাকে আরো খারাপ বা অপূর্ণ মনে করাচ্ছে? কোনো কনটেন্ট যদি নিজেকে নিয়ে ঘাটতির অনুভূতি তৈরি করে, তাহলে সেটি এড়িয়ে যাওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত।
বিজ্ঞাপনে এআইয়ের সম্ভাবনাও আছে
বিশেষজ্ঞরা অবশ্য এআই মডেলের সম্ভাব্য ইতিবাচক দিকও তুলে ধরেছেন। ডিডরিখসের মতে, এআই ব্যবহার করে ছোট ব্র্যান্ডগুলো তুলনামূলক কম খরচে বিভিন্ন ধরনের মানুষের প্রতিনিধিত্ব দেখাতে পারে। বড় আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোও বিভিন্ন দেশের বাজার অনুযায়ী বিজ্ঞাপন তৈরিতে প্রযুক্তিটি ব্যবহার করতে পারে।
তবে এর পাশাপাশি সৃজনশীল শিল্পে কর্মরত মানুষের ওপর এর প্রভাব নিয়েও সতর্ক করেছেন তিনি। তার মতে, এআই যেন মানুষের শিল্পবোধ ও সৃজনশীলতাকে পুরোপুরি প্রতিস্থাপন না করে।
ভোক্তারাও এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারেন বলে মনে করেন ডিডরিখস। কোনো ব্র্যান্ড এআই-নির্মিত মডেল ব্যবহার করলে ভোক্তারা মন্তব্যের মাধ্যমে তাদের মতামত জানাতে পারেন। কারণ ব্র্যান্ডগুলো এসব প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করে।
কার্ডিফ বিজনেস স্কুলের গবেষক জো লি ও হান্না ম্যারিয়টও এআই-নির্মিত ফ্যাশন মডেল এবং বাস্তব মডেলের ভার্চুয়াল প্রতিরূপ বা ‘ডিজিটাল টুইন’-এর ব্যবহার বাড়ার বিষয়টি তুলে ধরেছেন। বালমেইন, লেভিস ও এইচঅ্যান্ডএমের মতো ব্র্যান্ড এ ধরনের প্রযুক্তি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছে।
তাদের গবেষণায় দেখা গেছে, কোনো মডেল বাস্তব নয় এবং এআই দিয়ে তৈরি—এটা জানতে পারার পর অনেক ভোক্তার প্রতিক্রিয়া নেতিবাচক হয়। গবেষণায় অংশ নেওয়া কয়েকজন বরং কমসংখ্যক হলেও বাস্তব মানুষকে বিজ্ঞাপনে দেখতে বেশি আগ্রহী বলে জানিয়েছেন। তাদের মতে, এআই মডেল মানুষের বাস্তব অভিজ্ঞতাকে পুরোপুরি তুলে ধরতে পারে না।
গবেষকরা আরো দেখেছেন, ছবি এআই দিয়ে তৈরি জানার পর মানুষ অনেক সময় সেই ছবির সঙ্গে আবেগগতভাবে দূরত্ব তৈরি করেন।
এইচঅ্যান্ডএম জানিয়েছে, ২০২৫ সালে তারা বাস্তব মডেলদের সঙ্গে কাজ করে তাদের ‘ডিজিটাল টুইন’ তৈরি করেছিল এবং মডেলদের নিজেদের ডিজিটাল প্রতিরূপের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ও মালিকানা বজায় ছিল। তবে ২০২৫ সালের বসন্তে পরবর্তী পদক্ষেপ বিবেচনার জন্য সেই পরীক্ষা স্থগিত করা হয়।
সব মিলিয়ে বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এআই যদি বাস্তবতার চেয়ে আরো নিখুঁত, রোগা ও আকর্ষণীয় মানুষের ছবি তৈরিতে ব্যবহৃত হতে থাকে, তাহলে বিশেষ করে তরুণদের ওপর শরীর ও সৌন্দর্য নিয়ে নতুন ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে। তাই এআই-নির্মিত কনটেন্ট স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করা এবং তরুণদের মধ্যে এআই সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
সূত্র: বিবিসি
এআরবি