ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটে ১০ শতাংশ ভ্যাট!
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) একটি ঘোষণায় দেশের ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের মধ্যে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। এর কারণ ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সেবায় ১০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপ করেছেন তারা। আগে যারা ৫০০ টাকার প্যাকেজ ব্যবহার করতেন, তাদের নতুন এই ভ্যাট কার্যকর হলে ৫৭৭ টাকা দিতে হবে। আবার যারা ১ হাজার টাকার ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট প্যাকেজ ব্যবহার করেন, তাদের বাড়তি ১৫৫ টাকা গুনতে হবে। এ ছাড়া ইন্টারনেট সেবায় অতিরিক্ত ৩ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপ করায় ১০০ টাকার রিচার্জে কর দিতে হবে ৫৬ টাকার বেশি। বাংলাদেশে যখন ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা বাড়তে শুরু করেছে, ঠিক তখনই সরকারের এমন সিদ্ধান্ত নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট ব্যবহারকারীরা।
গোলাম মোসাব্বির একজন প্রযুক্তি উদ্যোক্তা, ঢাকার ব্যয়বহুল জীবনযাত্রার কথা চিন্তা করে থাকেন ভৈরবে নিজের গ্রামে। ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সংযোগ নিয়ে নিজের বাসাতেই কাজ করছেন। ১০ শতাংশ ভ্যাট ঘোষণা করার প্রতিক্রিয়ায় আমার দেশকে তিনি বলেন, ‘আসলে আমাদের বাংলাদেশ বর্তমানে একটি উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বিশ্বে এগিয়ে যাচ্ছে। সেই সঙ্গে ফ্রিল্যান্সাররা সারা বিশ্বে বিভিন্ন বড় দেশের বড় এজেন্সিগুলোয় কাজ করছে। এতে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের ফলে দেশ যেমন অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে যাচ্ছে, তেমনি রেমিট্যান্সেও অবদান রাখছে। কিন্তু এই মুহূর্তে প্রযুক্তি খাতে কর বাড়ানোটা যুক্তিযুক্ত নয়। এতে করে নতুন উদ্যোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। কারণ নতুন প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ও নতুন ফ্রিল্যান্সাররা শুরুতেই তেমন ইনভেস্টমেন্ট করতে পারেন না। তা ছাড়া প্রযুক্তি উদ্যোক্তাদের জন্য ও ফ্রিল্যান্সারদের জন্য এখনও তেমন কোনো লোনব্যবস্থার কাঠামো তৈরি হয়নি। ফলে এই ইন্টারনেট খাতে কর বেড়ে যাওয়াটা নতুনদের জন্য বেশ চ্যালেঞ্জ দাঁড় করিয়ে দেবে। তাই প্রযুক্তি খাতে কর বেড়ে যাওয়াটা ইতিবাচক নয়।’
আমার দেশ-এর খবরের সূত্র ধরে জানা যায়, আইএমএফের চাপে মূলত সরকার এই গণবিরোধী সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আসাদুজ্জামান নয়ন ঢাকার শান্তিনগরে ‘অন্তরঙ্গ ডট কম’ নামের একটি ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আছেন। তিনি আমার দেশকে বলেন, ‘আগের লুটপাটের সরকার যে পর্যায়ে ভ্যাট নিয়ে গেছে, জনগণের আশা ছিল এবার তা কমবে। কিন্তু উল্টো আরও বাড়ানো হচ্ছে কয়েকটি পণ্যে, যার মধ্যে ইন্টারনেট ব্রডব্যান্ড। যে সময় প্রযুক্তি উদ্ভাবনে উৎসাহ দেওয়া দরকার, সেখানে ভ্যাট বাড়িয়ে আইএমএফকে খুশি করার কী এমন গুরুতর কারণ রয়েছে, তা বোধগম্য নয়। এমন সিদ্ধান্ত সরকারকেই সমালোচনায় ফেলবে। শুনেছি বাংলাদেশের নেট গতি আফগানিস্তানেরও নিচে, এখন ব্রডব্যান্ড ব্যবসায়ীরা টাকার পরিমাণ ঠিক রেখে হয়তো গতি বা এমবিপিএস কমিয়ে ব্যবসা টিকিয়ে রাখবে। এতে প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোগগুলো হুমকিতে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা খুবই হতাশার। তাই সরকারের এমন অনভিপ্রেত সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসা উচিত বলে আমি মনে করি।’
সাধারণত যারা মফস্বলে বসবাস করেন, তারা মনে করেন ইন্টারনেট সেবাকে আরও সহজলভ্য করা উচিত এই সরকারের। জহুরুল ইসলাম একজন স্কুলশিক্ষক। নোয়াখালীর চাটখিল উপজেলার কড়িহাটি গ্রামে বসবাস করেন তিনি। প্রত্যন্ত অঞ্চলে মোবাইল নেটওয়ার্ক ভালোভাবে কাজ না করায় ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সংযোগই তার ভরসা। তিনি আমার দেশকে বলেন, ‘বর্তমান যুগ তথ্যপ্রযুক্তির যুগ। আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশে প্রযুক্তি খাতে বিশেষ করে ইন্টারনেটে কোনোভাবে দাম বাড়ানো গ্রহণযোগ্য নয়। আমার মতে, সরকারকে এ ক্ষেত্রে সবার কাছে ইন্টারনেটকে আরও সহজলভ্য করে দেওয়া উচিত। একজন শিক্ষক এবং একই সঙ্গে একজন জ্ঞানপিপাসু হিসেবে আমার ভরসা হচ্ছে ইন্টারনেট। বর্তমান সরকার ছাত্র-জনতার সরকার। এ সরকারের কোনোভাবে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের দাম বাড়ানো উচিত নয়।’
বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশ এখনও ইন্টারনেট সেবার মান নিয়ে অনেক পিছিয়ে। আর তাই এই খাতে এখনই ভ্যাট যুক্ত করলে ব্যবহারকারীরা ইন্টারনেট ব্যবহারের প্রতি আগ্রহ হারাতে পারেন। তা ছাড়া ফ্রিল্যান্সাররা ইন্টারনেটের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে বাধাগ্রস্ত হবে।