ডিজিটাল যুগে স্মার্ট টিভি এখন শুধু বিনোদনের যন্ত্র নয়, এটি ঘরের একটি পূর্ণাঙ্গ বিনোদনকেন্দ্র। ইউটিউবে ভিডিও দেখা, ওটিটি প্ল্যাটফর্মে সিনেমা-সিরিজ স্ট্রিমিং, ভিডিও কল, এমনকি গেম খেলা—সবই এখন স্মার্ট টিভির মাধ্যমে সম্ভব। তবে কেনার আগে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মাথায় রাখা দরকার, যাতে সিদ্ধান্তটি হয় বুদ্ধিমানের।
১. স্ক্রিন সাইজ ও রেজুলেশন
ঘরের আকার অনুযায়ী টিভির মাপ নির্বাচন করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ছোট ঘরের জন্য ৩২ থেকে ৪৩ ইঞ্চি যথেষ্ট, মাঝারি বা বড় ঘরে ৫০ ইঞ্চি বা তার বেশি ভালো মানাবে। রেজুলিউশনের ক্ষেত্রেও সচেতন থাকুন। ফুল এইচডি সাধারণ ব্যবহারের জন্য ঠিক থাকলেও ফোরকে রেজুলেশন ভবিষ্যতের জন্য ভালো বিনিয়োগ। বড় স্ক্রিনে ফোরকে ভিজ্যুয়াল অনেক বেশি প্রাণবন্ত ও পরিষ্কার দেখায়।
২. ডিসপ্লে প্রযুক্তি
এলইডি, কিউএলইডি বা ওএলইডি প্রযুক্তির পার্থক্য জানা জরুরি। ওএলইডি গভীর কালো ও উন্নত কনট্রাস্ট দেয়, কিউএলইডি উজ্জ্বল রঙ ও ভালো ব্রাইটনেস দেয়, আর এলইডি বাজেটবান্ধব বিকল্প। নিজের চাহিদা ও বাজেট অনুযায়ী নির্বাচন করা উচিত।
৩. রিফ্রেশ রেট
স্পোর্টস বা অ্যাকশন সিনেমা বেশি দেখলে কিংবা গেম খেললে উচ্চ রিফ্রেশ রেট উপকারী। ৬০ হার্টজ সাধারণ ব্যবহারের জন্য যথেষ্ট হলেও ১২০ হার্টজ আরো মসৃণ ভিজ্যুয়াল অভিজ্ঞতা দেয়।
৪. কানেক্টিভিটি অপশন
একটি স্মার্ট টিভির আসল শক্তি তার সংযোগ সুবিধায়। এইচডিএমআই, ইউএসবি, ব্লুটুথ ও ওয়াই-ফাই থাকা আবশ্যক। একাধিক এইচডিএমআই পোর্ট থাকলে সেট টপ বক্স, গেম কনসোল বা ল্যাপটপ একসঙ্গে সংযোগ করা যায়। দ্রুত ও স্থিতিশীল ইন্টারনেট সাপোর্ট থাকাও গুরুত্বপূর্ণ।
৫. অডিও পারফরম্যান্স
চিত্র যতই ভালো হোক, শব্দ মানসম্মত না হলে অভিজ্ঞতা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। তাই টিভির বিল্ট-ইন স্পিকার কত ওয়াটের এবং ডলবি অডিও বা অনুরূপ সাউন্ড প্রযুক্তি আছে কি না, তা দেখে নিন। প্রয়োজনে সাউন্ডবার যুক্ত করার সুযোগ আছে কি না, সেটাও যাচাই করা ভালো।
৬. অপারেটিং সিস্টেম ও অ্যাপ সাপোর্ট
টিভির অপারেটিং সিস্টেম ব্যবহারবান্ধব হওয়া জরুরি। জনপ্রিয় স্ট্রিমিং অ্যাপ, যেমন ইউটিউব, নেটফ্লিক্স, প্রাইম ভিডিও সহজে চালানো যায় কি না নিশ্চিত করুন। নিয়মিত সফটওয়্যার হালনাগাদ পাওয়া যায়, এমন প্ল্যাটফর্ম হলে দীর্ঘ মেয়াদে ভালো পারফরম্যান্স পাওয়া যায়।
৭. প্রসেসর, র্যাম ও স্টোরেজ
স্মার্ট টিভিও একটি কম্পিউটিং ডিভাইস। ভালো প্রসেসর ও পর্যাপ্ত র্যাম না থাকলে অ্যাপ চালাতে দেরি হতে পারে। অন্তত ১.৫ থেকে ২ জিবি র্যাম এবং পর্যাপ্ত সংরক্ষণ ক্ষমতা থাকলে ব্যবহার অভিজ্ঞতা মসৃণ হয়।
৮. এইচডিআর সাপোর্ট
এইচডিআর১০ বা ডলবি ভিশন সাপোর্ট থাকলে ছবি আরো উজ্জ্বল ও জীবন্ত দেখায়। বিশেষ করে সিনেমা দেখার সময় এর পার্থক্য স্পষ্ট বোঝা যায়।
৯. বিদ্যুৎ খরচ
বিদ্যুৎসাশ্রয়ী মডেল নির্বাচন করলে দীর্ঘ মেয়াদে বিল কম আসে। জ্বালানি দক্ষতার মান বা এনার্জি রেটিং দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া ভালো।
১০. ইনপুট ল্যাগ ও গেমিং সাপোর্ট
যদি গেম কনসোল ব্যবহার করার পরিকল্পনা থাকে, তাহলে কম ইনপুট ল্যাগ এবং আধুনিক এইচডিএমআই সাপোর্ট আছে কি না দেখে নিন। এতে গেমিং অভিজ্ঞতা উন্নত হয়।
১১. ব্র্যান্ড ও বিক্রয়োত্তর সেবা
বিশ্বস্ত ব্র্যান্ড নির্বাচন করলে মান ও স্থায়িত্বের নিশ্চয়তা পাওয়া যায়। পাশাপাশি ওয়ারেন্টি ও সার্ভিস সেন্টারের সুবিধা আছে কি না, তা যাচাই করা উচিত। অনলাইনে ব্যবহারকারীদের মতামত পড়লে বাস্তব অভিজ্ঞতা জানা যায়।
১২. বাজেট ও মূল্যমান
বাজারে বিভিন্ন দামের অসংখ্য মডেল রয়েছে। তাই আগে নিজের বাজেট নির্ধারণ করুন। একই দামে কোন মডেলে বেশি সুবিধা বা ভালো রেজুলেশন পাওয়া যাচ্ছে, তা তুলনা করুন। ছাড় ও বিশেষ অফার থাকলে সেটিও বিবেচনায় রাখতে পারেন।
স্মার্ট টিভি কেনা মানে শুধু একটি স্ক্রিন ক্রয় নয়, বরং একটি পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল অভিজ্ঞতা ঘরে আনা। তাই তাড়াহুড়া না করে প্রযুক্তি ও বাজেট মিলিয়ে সিদ্ধান্ত নিলে দীর্ঘদিন নিশ্চিন্তে স্মার্ট টিভি উপভোগ করতে পারবেন।
লেখক : সাংবাদিক, লেখক ও প্রযুক্তিবিদ
sanowarhossain.writer@gmail.com