হোম > ফিচার > সাহিত্য সাময়িকী

রাষ্ট্রক্ষমতা, মাতৃরূপ ও রাজনৈতিক নৈতিকতার কাব্যিক দলিল

আল মাহমুদের ‘খালেদা’

মাসুম খলিলী

ছবি: সংগৃহীত

বাংলা কবিতায় রাজনৈতিক ক্ষমতা সাধারণত এসেছে বিদ্রুপ, প্রতিবাদ কিংবা ট্র্যাজেডির প্রতীক হিসেবে। কিন্তু কবি আল মাহমুদ তার ‘খালেদা’ কবিতায় একটি ভিন্ন পথ বেছে নেন—তিনি রাষ্ট্রক্ষমতাকে দেখেন মাতৃরূপে, জনআকাঙ্ক্ষার প্রতিশ্রুতি হিসেবে। ১৯৯২ সালের ১৯ নভেম্বর রচিত এই কবিতা বেগম খালেদা জিয়ার প্রথম প্রধানমন্ত্রিত্বের প্রেক্ষাপটে লেখা হলেও এটি নিছক কোনো রাজনৈতিক প্রশস্তিগাথা নয়; বরং সময়ের কাছে দায়বদ্ধ এক কবির নৈতিক উচ্চারণ।

কবিতার প্রথম পঙ্‌ক্তিতেই কবি রাষ্ট্র ও প্রকৃতিকে একাকার করে দেন—

‘তোমার মুখের দিকে চেয়ে আছে বাংলার ভোরের আকাশ।’

এখানে ব্যক্তির মুখ আর রাষ্ট্রের ভোর এক হয়ে যায়। এটি আল মাহমুদের চিরায়ত কৌশল—মানুষকে তিনি প্রকৃতির ভেতর স্থাপন করেন, আর ক্ষমতাকে ফেরান মাটির কাছে। ‘শস্যগন্ধী মাটিরই কন্যা’—এই উপমার মধ্য দিয়ে তিনি শহুরে ক্ষমতাকে লোকায়ত শেকড়ে নামিয়ে আনেন। খালেদা জিয়া এখানে কোনো অভিজাত শাসক নন; তিনি জন্মেছেন লাঞ্ছিত মানুষের আহ্বানে, রাষ্ট্রের আহত মাটি থেকে।

এই কবিতায় সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো ক্ষমতা ও প্রতিশ্রুতির দ্বন্দ্ব। কবি বলেন—

‘যেন এক প্রতিশ্রুতি হেঁটে যায় আমাদের কণ্টকিত কালের ভিতরে।’

সময় এখানে ‘কণ্টকিত’—বেদনাবিদ্ধ, সংঘাতপূর্ণ। সেই সময়ের মধ্য দিয়ে হাঁটে একটি প্রতিশ্রুতি, যা ব্যক্তি খালেদা জিয়ার চেয়েও বড়। কবি বুঝিয়ে দেন, রাষ্ট্রক্ষমতা আসলে প্রতিশ্রুতির ভার বহন করে; সেটি ব্যর্থ হলে ইতিহাস ক্ষমা করে না।

মধ্যভাগে এসে কবি প্রত্যাশার বিস্তৃত ভূগোল নির্মাণ করেন—‘মাঠঘাট আদিগন্ত শস্যের কিনারে।’ এখানে প্রত্যাশা কেবল রাজনৈতিক নয়, এটি অস্তিত্বের, জীবিকার, বেঁচে থাকার। এই অংশে আল মাহমুদ তার স্বভাবসিদ্ধ গ্রামীণ ইমেজারি ব্যবহার করে দেখান—ক্ষমতা যদি মানুষের জীবনে পৌঁছাতে না পারে, তবে তা নিছক রাজধানীকেন্দ্রিক এক ভ্রম।

কবিতার সবচেয়ে শক্তিশালী অংশ আসে সাক্ষ্যের ঘোষণায়—

‘আমরাও সাক্ষ্য দেব, হ্যাঁ আমরা একদা দেখেছি।’

এখানে কবি নিজেকে ইতিহাসের সাক্ষী হিসেবে দাঁড় করান। তিনি ভবিষ্যতের উদ্দেশে বলেন, একদিন এমন এক নারীকে দেখা গিয়েছিল, যিনি অনিঃশেষ আঁধারে দাঁড়িয়ে আলোর ডানার মতো মেলে দিয়েছিলেন দুই বাহু। এই আলো কোনো অলৌকিকতা নয়; এটি রাজনৈতিক সম্ভাবনার আলো, যা জনতার ভেতর বিদ্যুতের মতো নেমে এসেছিল।

তবে কবিতাটি এখানেই থেমে যায় না। শেষাংশে এসে কবি উচ্চারণ করেন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক সতর্কতা—

‘কখনো ভুলো না যেন তোমার ঘোমটায় আছে মানুষের আশার বারুদ।’

‘বারুদ’ শব্দটি এখানে ভয়াবহভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। আশা যেমন শক্তি, তেমনি তা বিস্ফোরক। ক্ষমতাধর যদি সেই আশাকে অবহেলা করে, তবে সেটিই হয়ে ওঠে বিপর্যয়ের উৎস। কবি তাই স্মরণ করিয়ে দেন—‘তোমার বাক্য প্রতীক্ষিত নিঃশ্বাস জাতির।’ শাসকের কথা, সিদ্ধান্ত, নীরবতা—সবই জনগণের শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে যুক্ত।

এই কবিতায় আল মাহমুদ খালেদা জিয়াকে আদর্শায়িত করেন, কিন্তু অন্ধভাবে নয়। তিনি তাকে ‘মাতৃকা’ বলেন, যে মাতৃত্ব স্নেহের পাশাপাশি দায়িত্বের। ‘অবিচল, পিঙ্গলাক্ষী হে মাতৃকা, মানুষের আশাকে জাগাও’—এই আহ্বান আসলে কবির নিজের সময়কে উদ্দেশ করে বলা এক চিরন্তন বাক্য।

আজ তিন দশক পর, কবিতাটি নতুনভাবে পাঠযোগ্য হয়ে উঠেছে। কারণ এটি কোনো ব্যক্তির প্রশস্তি নয়; এটি ক্ষমতা ও মানুষের সম্পর্ক নিয়ে এক গভীর কাব্যিক দলিল। আল মাহমুদের ‘খালেদা’ আমাদের মনে করিয়ে দেয়—‘রাজনীতি ক্ষণস্থায়ী হতে পারে, কিন্তু আশার দায় ইতিহাস কখনো ভুলে যায় না।’

তকদির

দৃষ্টির কারিগর

মসজিদে কুরতুবা

কুরতুবা থেকে ঢাকা, ইকবালের অসমাপ্ত জিহাদ

যেভাবে বেড়ে উঠি (পঞ্চম পর্ব)

যেই ডিলিউশন সত্য

প্রাচীন ভারত থেকে আধুনিক দুনিয়ায়

তরুণ কবি আরফান হোসাইন রাফির নতুন কাব্যগ্রন্থ ‘সুদিন ফিরে আসছে’

বাবুইর ৩০০ শব্দের গল্প প্রতিযোগিতায় পুরস্কার পেলেন তরুণ ৫ লেখক

১ ফেব্রুয়ারি থেকে বইমেলা আয়োজনের দাবিতে ১১ নভেম্বর সমাবেশ ও পদযাত্রা