আবু বকর (রা.) খিলাফতের দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই অনুধাবন করেছিলেন, একটি রাষ্ট্র শুধু সামরিক শক্তি দিয়ে টিকে থাকতে পারে না; বরং একে স্থায়িত্ব দেয় এর বিচারব্যবস্থা ও অভ্যন্তরীণ সুশাসন। আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর ইন্তেকালের পর মুসলিম উম্মাহ যখন মানসিকভাবে বিপর্যস্ত, তখন শুরুতেই আবু বকর (রা.) তার ঐতিহাসিক উদ্বোধনী ভাষণের মাধ্যমে রাষ্ট্রের বিচারিক ও প্রশাসনিক রূপরেখা স্পষ্ট করেন।
জবাবদিহি-ভিত্তিক সাংবিধানিক কাঠামো
দায়িত্ব গ্রহণের পর আবু বকর (রা.) মদিনার মসজিদে যে ভাষণ দিয়েছিলেন, তা ইসলামি আইনের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় দলিল হিসেবে স্বীকৃত। আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় একে ‘মিনিস্টেরিয়াল স্টেটমেন্ট’ বা ‘গভর্নেন্স পলিসি’ বলা যেতে পারে। তার ভাষণের কয়েকটি মূল স্তম্ভ ছিল নিম্নরূপÑ
হিউম্যান অথরিটি ও জবাবদিহি : তিনি বলেন, ‘আমি তোমাদের শাসক নিযুক্ত হয়েছি, কিন্তু আমি তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম ব্যক্তি নই।’ এর মাধ্যমে তিনি খিলাফতকে থিওক্র্যাটিক বা দৈব কর্তৃত্বের ধারণা থেকে মুক্ত করে একটি মানবিক ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠানে রূপ দেন।
সংশোধনের অধিকার : ‘যদি আমি ভালো কাজ করি, তবে আমাকে সহযোগিতা করো, আর যদি ভুল করি, তাহলে আমাকে সংশোধন করে দিও।’ এর মাধ্যমে জনগণের হাতে শাসককে তদারকি করার আইনি ক্ষমতা অর্পণ করেন।
সত্য ও মিথ্যার নৈতিক সংজ্ঞা : তিনি সত্যকে ‘আমানত’ এবং মিথ্যাকে ‘খেয়ানত’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেন, যা বিচারিক সাক্ষ্য দেওয়া ক্ষেত্রে একটি মৌলিক নৈতিক ভিত্তি।
ন্যায়ের সর্বজনীনতা : তিনি বলেন—‘তোমাদের মধ্যে যে দুর্বল, সে আমার কাছে শক্তিশালী, যতক্ষণ না আমি তার অধিকার আদায় করে দিই; আর যে শক্তিশালী, সে আমার কাছে দুর্বল, যতক্ষণ না আমি তার কাছ থেকে হক আদায় করি।’
বিচারব্যবস্থার মূল ভিত্তি কোরআন ও সুন্নাহ
যদিও আবু বকর (রা.) নিজে প্রধান বিচারক হিসেবে কাজ করতেন, তবু তিনি বিভিন্ন অঞ্চলে অভিজ্ঞ সাহাবিদের নিয়োগ দিয়ে বিচারিক কাজকে বিকেন্দ্রীকরণ করার সূচনা করেন। আবু বকর (রা.)-এর বিচারিক দর্শনের মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল আল্লাহর আইনের প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্য। তিনি কখনোই ব্যক্তিগত মতামত বা গোত্রীয় প্রথাকে শরিয়তের ঊর্ধ্বে স্থান দেননি। তার বিচারিক পদ্ধতির একটি সুনির্দিষ্ট ক্রমপরম্পরা ছিল, যা পরে ফিকহ শাস্ত্রের বিকাশে ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে।
যেকোনো মামলাসামনে আসলে আবু বকর (রা.) সর্বপ্রথম কোরআনে তালাশ করতেন। কোরআনের স্পষ্ট নির্দেশনাবলিকে তিনি চূড়ান্ত এবং অলঙ্ঘনীয় হিসেবে মানতেন। দাদির প্রাপ্য উত্তরাধিকার-সংক্রান্ত একটি মামলা এ ক্ষেত্রে ধ্রুপদি উদাহরণ। যখন এক বৃদ্ধা তার মৃত নাতির সম্পদের হিস্যা দাবি করলেন, তখন আবু বকর (রা.) প্রথমে কোরআনে এর সমাধান পাননি। পরে মুগিরা ইবনে শুবাহ (রা.) এবং মুহাম্মদ ইবনে মাসলামাহ (রা.) সাক্ষ্য দিলেন যে, রাসুল (সা.) দাদিকে সম্পদের এক-ষষ্ঠাংশ দিয়েছিলেন। আবু বকর (রা.) এই সুন্নাহর ভিত্তিতেই রায় দেন।
কোরআন ও সুন্নাহ উভয় উৎসেই যদি স্পষ্ট সমাধান না পাওয়া যেত, তখন বিশিষ্ট সাহাবিদের নিয়ে বৈঠকে বসতেন। উমর, আলী, উসমান, আবদুর রহমান ইবনে আউফ ও মুয়াজ ইবনে জাবাল (রা.)-এর মতো ফকিহ সাহাবিদের সঙ্গে পরামর্শ করে তিনি একটি ঐকমত্যে পৌঁছাতেন। এই সম্মিলিত গবেষণালব্ধ সিদ্ধান্তকেই ইসলামি পরিভাষায় ‘ইজমা’ বলা হয়।
সর্বজনীন ন্যায় ও ইনসাফ
আবু বকর (রা.)-এর বিচারব্যবস্থার অন্যতম গৌরবময় দিক ছিল আইনের চোখে সবার সমান অধিকার। তৎকালীন বিশ্বের বড় সাম্রাজ্যগুলোয় যেখানে রাজা বা শাসকরা আইনের ঊর্ধ্বে ছিলেন, সেখানে আবু বকর (রা.) এক বৈপ্লবিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। তার কাছে ইনসাফ ছিল একটি পরম সত্য, যেখানে রক্ত সম্পর্ক বা পদমর্যাদার কোনো মূল্য নেই । তিনি সমাজের প্রান্তিক ও দুর্বল মানুষদের বিচার পাওয়ার পথ সুগম করেছিলেন। তিনি বলতেন, কোনো শক্তিশালী ব্যক্তি যদি অন্যের হক কেড়ে নেয়, তবে রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব হলো সে যে-ই হোক না কেন, তাকে আইনের আওতায় আনা।
আবু বকর (রা.) নিজেকে সাধারণ মানুষের ঊর্ধ্বে মনে করতেন না। এটি আধুনিক বিচারব্যবস্থায় ‘Rule of Law’ বা আইনের শাসনের সর্বোচ্চ বহিঃপ্রকাশ। তিনি স্পষ্ট করেছিলেন যে, খলিফা শুধু আল্লাহর আইনের প্রয়োগকারী, কোনোভাবেই সেই আইনের স্রষ্টা বা ঊর্ধ্বে কেউ নন।
স্বাধীন বিচারব্যবস্থা
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর একটি অন্যতম শর্ত। অথচ আজ থেকে চৌদ্দশ বছর আগে আবু বকর (রা.) এই স্বাধীনতার এমন এক ভিত্তি তৈরি করেছিলেন, যা আজও বিস্ময়কর। তাঁর শাসনামলে বিচারকদের কোনো রাজনৈতিক চাপ ছিল না, বরং তারা সরাসরি আল্লাহর বিধানের প্রতি দায়বদ্ধ ছিলেন।
যদিও বিচার ও নির্বাহী বিভাগের পূর্ণাঙ্গ পৃথককরণ উমর (রা.)-এর যুগে চূড়ান্ত রূপ পেয়েছিল, তবে আবু বকর (রা.)-এর সময়েই এর সূচনা হয়েছিল। তিনি বিভিন্ন প্রদেশে গভর্নর নিয়োগের পাশাপাশি অভিজ্ঞ সাহাবিদের বিচারিক ও শিক্ষামূলক কাজে দায়িত্ব দিতেন। গভর্নররা যাতে বিচারকের কাজে হস্তক্ষেপ করতে না পারে, সে জন্য তিনি কঠোর নির্দেশনা দিতেন। বিচারকরা খলিফার প্রতিনিধি হওয়ার চেয়েও বেশি ছিলেন ‘হক’ বা সত্যের প্রতিনিধি। তাদের বেতন ও সুযোগ-সুবিধা বায়তুল মাল থেকে এমনভাবে নির্ধারিত করার চেষ্টা করা হয়েছিল, যাতে তারা কারো অনুগ্রহের মুখাপেক্ষী না হন।
আবু বকর (রা.)-এর বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা শুধু মুসলমানদের জন্য ছিল না, বরং জিম্মি বা অমুসলিম নাগরিকদের জন্যও তা উন্মুক্ত ছিল। নাজরানের খ্রিষ্টানদের সঙ্গে রাসুল (সা.)-এর সম্পাদিত চুক্তি তিনি নবায়ন করেছিলেন এবং তাদের ধর্মীয় ও আইনি স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ রেখেছিলেন। কোনো অমুসলিম নাগরিক যদি কোনো মুসলিমের বিরুদ্ধে মামলা করত, তবে তখনো বিচারকরা সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে শুধু প্রমাণের ভিত্তিতেই রায় দিতেন।
অনুকরণীয় বিচার পদ্ধত ও প্রশাসনিক কাঠামো
আবু বকর (রা.)-এর খিলাফতে বিচারব্যবস্থা শুধু কোরআন-সুন্নাহর তাত্ত্বিক প্রয়োগই ছিল না, বরং এটি ছিল অত্যন্ত সুশৃঙ্খল এবং পদ্ধতিগতভাবে ব্যাপক অগ্রসর। বিচারিক প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ করার জন্য তিনি কিছু মৌলিক প্রশাসনিক নীতি অনুসরণ করতেন, যা বিচারিক মানদণ্ডকে উন্নত করেছিল।
উন্মুক্ত আদালত ও মসজিদের ভূমিকা : তৎকালীন সময়ে কোনো আলাদা আদালত ভবন ছিল না। বিচারকাজ সাধারণত মসজিদে বা খলিফার বাড়ির আঙিনায় প্রকাশ্যে পরিচালিত হতো। এর ফলে বিচারিক প্রক্রিয়ায় জনগণের তদারকি (Public Oversight) নিশ্চিত হতো। কোনো গোপন বিচার বা পক্ষপাতমূলক আলোচনার সুযোগ সেখানে ছিল না। মসজিদের পবিত্র পরিবেশে বিচার হওয়ার কারণে বিচারক ও বিবাদী উভয়ই আল্লাহর কাছে জবাবদিহির ভয় অনুভব করতেন।
সাক্ষ্যগ্রহণ ও প্রমাণের গুরুত্ব : ইসলামি বিচারব্যবস্থায় ‘আল-বাইয়্যিনাহ’ বা প্রমাণের ওপর অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়। আবু বকর (রা.) মামলার প্রতিটি পর্যায়ে সাক্ষীদের বিশ্বাসযোগ্যতা (আদালাহ) পরীক্ষা করতেন। কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তির একতরফা কথায় তিনি রায় দিতেন না। বিশেষ করে, রক্তপাত বা হদ-সংক্রান্ত মামলায় তিনি অত্যন্ত সতর্কতা অবলম্বন করতেন। প্রমাণের অভাবে অনেক সময় তিনি মামলা খারিজ করে দিতেন বা বাদী-বিবাদীকে আপসের পরামর্শ দিতেন।
বিচারিক নজির ও ধারাবাহিকতা : আবু বকর (রা.)-এর সময়ে গৃহীত রায়গুলো লিপিবদ্ধ না হলেও সাহাবিদের স্মৃতির মাধ্যমে তা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে সংরক্ষিত ছিল। উমর (রা.) যখন খলিফা হন, তখন তিনি আবু বকর (রা.)-এর অনেক রায়কে নজির বা Precedent হিসেবে ব্যবহার করতেন। এই বিচারিক ধারাবাহিকতাই ইসলামি আইনশাস্ত্রকে একটি সুসংহত রূপ দিয়েছিল।