হোম > ফিচার > সাহিত্য সাময়িকী

বাংলাদেশের সাহিত্যে হেজেমনি ও ফ্যাসিবাদ

আবু সাইদ কামাল

বাংলাদেশের সাহিত্যচর্চার ইতিহাসে স্বৈরশাসনামল—বিশেষত সামরিক শাসন, একদলীয় কর্তৃত্ববাদ ও স্বৈরতন্ত্রের সময়গুলো সাহিত্যকে কখনো সরাসরি, কখনো পরোক্ষভাবে হেজেমনি এবং ফ্যাসিজমমুখী নিয়ন্ত্রণের অধীন রেখেছে। এই প্রভাব সাহিত্যিক সৃজনশীলতা, সাহিত্য প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণ, পাঠক-রুচি ও সাহিত্যিক রাজনীতিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে।

সাহিত্যিক হেজেমনি বলতে বোঝায়—রাষ্ট্র বা ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর দ্বারা একটি নির্দিষ্ট সাহিত্যিক রুচি, আদর্শ ও বয়ানকে ‘জাতীয়’, ‘মূলধারা’ বা ‘গ্রহণযোগ্য’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা এবং বিকল্প কণ্ঠগুলো প্রান্তিক করে রাখা।

অন্যভাবে বলা যায়, সাহিত্যিক হেজেমনি (Literary Hegemony) হলো সাহিত্যক্ষেত্রে কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণি, গোষ্ঠী, ভাষা, মতাদর্শ, রুচি বা ক্ষমতাকেন্দ্রের এমন আধিপত্য, যা অন্য সাহিত্যধারা, কণ্ঠস্বর ও অভিজ্ঞতাকে প্রান্তিক, অদৃশ্য বা গৌণ করে তোলে এবং সেই আধিপত্যকে সমাজ স্বাভাবিক ও স্বীকৃত সত্য হিসেবে মেনে নেয়।

এই ধারণার মূল উৎস হলো ইতালীয় চিন্তাবিদ আন্তোনিও গ্রামশির Hegemony তত্ত্ব। গ্রামশি বলেন, শাসন শুধু রাষ্ট্রীয় শক্তির মাধ্যমে নয়, বরং সংস্কৃতি, ভাষা ও চিন্তার মাধ্যমে সম্মতি তৈরি করে প্রতিষ্ঠিত হয়।

ফ্যাসিজম বলতে মূলত এমন এক চরম কর্তৃত্ববাদী, জাত্যভিমানী ও দমনমূলক রাষ্ট্র-দর্শন বোঝায়, যেখানে রাষ্ট্রই সর্বশক্তিমান, ব্যক্তির স্বাধীনতা গৌণ, ভিন্নমতকে শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। শক্তির মাধ্যমে শৃঙ্খলা বজায় রাখা হয় ও একক আদর্শ চাপিয়ে দেওয়া হয়।

ইতালির মুসোলিনি ও জার্মানির নাৎসিবাদ ফ্যাসিজমের ঐতিহাসিক উদাহরণ হলেও, ফ্যাসিজম শুধু রাষ্ট্রীয় কাঠামো নয়—এটি একটি মানসিকতা ও সাংস্কৃতিক প্রবণতাও।

ফ্যাসিজমের মূল বৈশিষ্ট্য হলো, একনায়কতন্ত্র ও ব্যক্তিপূজা, ভিন্নমত দমন ও সেন্সরশিপ, জাতি-রাষ্ট্র-ধর্মের নামে উগ্র জাতীয়তাবাদ, বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতার প্রতি অবজ্ঞা, প্রচারকে (Propaganda) সত্যের বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করা।

সাহিত্যে ফ্যাসিজম প্রভাব ফেলার কৌশল হলো সাহিত্যকে রাষ্ট্রের হাতিয়ারে পরিণত করা। ফ্যাসিবাদী শাসনে সাহিত্য হয়ে ওঠে—রাষ্ট্রের প্রশস্তিগান, শাসকের মহিমা প্রচারের মাধ্যম। ‘জাতীয় আদর্শ’ প্রতিষ্ঠার অস্ত্র হিসেবে সাহিত্য সৃজনশীলতা হারিয়ে প্রোপাগান্ডায় রূপ নেয়।

ভিন্নধারার সাহিত্য দমন প্রক্রিয়ায় সমালোচনামূলক, প্রগতিশীল বা মানবতাবাদী সাহিত্য নিষিদ্ধ হয়। লেখককে কখনো জেলে দেওয়া হয়, বিদেশে যেতে বাধ্য করা হয় বা ভয় দেখানো হয়। ‘রাষ্ট্রবিরোধী’, ‘জাতিবিরোধী’ তকমা দেওয়া হয়। ফলে সাহিত্যচর্চায় ভয় ও আত্ম-সেন্সরশিপ তৈরি হয়।

সাহিত্যিক ফ্যাসিজম হলো হেজেমনিকে বলপ্রয়োগের মাধ্যমে টিকিয়ে রাখা। এতে যে প্রক্রিয়াগুলো গ্রহণ করা হয়, সেগুলো হলো—সেন্সরশিপ, ভয়ভীতি ও প্রশাসনিক হয়রানি, প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বর্জন, আর্থিক ও সাংস্কৃতিক সুযোগ বণ্টনে পক্ষপাতমূলক ব্যবস্থা নেওয়া। হেজেমনি যেখানে সম্মতির মাধ্যমে কাজ করে, ফ্যাসিজম সেখানে ভয় ও দমননীতি ব্যবহার করে।

স্বৈরশাসনামলে রাষ্ট্র সাহিত্যকে দেখেছে রাজনৈতিক বৈধতা তৈরির হাতিয়ার হিসেবে। ফলে সাহিত্য প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্রায়ন করা হয়। যেমন : বাংলা একাডেমি, শিল্পকলা একাডেমি, জেলা সাহিত্য কেন্দ্র, সরকারি সাহিত্য মেলা ইত্যাদি রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে আসে। ‘সরকারঘেঁষা’ লেখকদের তালিকা তৈরি হয়; পদক, অনুদান, আমন্ত্রণ তাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে।

এ প্রক্রিয়ায় জাতীয় সাহিত্যধারণার বিকৃতি ঘটানোর প্রবণতা দেখা যায়। যেমন : মুক্তিযুদ্ধ, জাতীয়তাবাদ, উন্নয়নবাদী বয়ানকে একমাত্র বৈধ সাহিত্যিক বিষয় হিসেবে চাপিয়ে দেওয়া হয়। শ্রেণিসংগ্রাম, শ্রমজীবী জীবন, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীমূলক অভিজ্ঞতা, রাষ্ট্রীয় সহিংসতা—এসব বিষয়কে উপেক্ষা করা হয় বা সন্দেহের চোখে দেখা হয়।

স্বৈরশাসনামলে সাহিত্যিক হেজেমনি তৈরি হয়েছে কয়েকটি কৌশলে। যেমন : পাঠ্যপুস্তক ও কারিকুলাম নিয়ন্ত্রণ, নির্বাচিত লেখক ও লেখা দিয়ে ‘ক্যানন’ তৈরি করা হয়েছে। সাহিত্য পুরস্কার রাজনৈতিক আনুগত্যের সূচক হয়ে উঠেছে। সরকারি বা করপোরেটনিয়ন্ত্রিত পত্রিকায় নির্দিষ্ট লেখকদের আধিপত্য দেখা গিয়েছে। জেলা-উপজেলায় সরকারি উদ্যোগে আয়োজিত সাহিত্য উৎসবে ভিন্নমতাবলম্বীদের অনুপস্থিতি লক্ষ করা গেছে।

অন্যদিকে সাহিত্যিক ফ্যাসিজমে দমন ও ভয়ভীতি প্রয়োগে হেজেমনি যখন প্রশ্নের মুখে পড়ে, তখন তা রূপ নেয় ফ্যাসিজমে। তখন ভিন্নমতাবলম্বী লেখকদের বিরুদ্ধে নজরদারি করা হয়েছে, প্রকাশনা বন্ধ করা হয়েছে, দেওয়া হয়েছে মামলার হুমকি।

চাকরি ও সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা দেখা দিয়েছে। ‘রাষ্ট্রবিরোধী’, ‘অশালীন’, ‘ধর্মবিরোধী’ তকমা লাগিয়ে লেখকদের প্রতি দমননীতি প্রয়োগ করা হয়েছে। সাহিত্যিকদের তখন আত্মনিয়ন্ত্রণ স্বাভাবিক অভ্যাসে পরিণত হয়। ফলে সাহিত্যচর্চায় ভয়ের কারণে এক ধরনের নীরবতা তৈরি হয়েছে।

সাহিত্যচর্চার বিকাশে যেসব নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে, তা হলো সৃজনশীলতার সংকোচন সৃষ্টি হয়েছে, সাহসী ও নিরীক্ষাধর্মী লেখা কমে গিয়েছে। নিরাপদ বিষয় ও ভাষার আধিক্য বেড়েছে। এ কারণে বিকল্প সাহিত্যধারার প্রান্তিককরণও হয়েছে। যেমন শ্রমজীবী, নারী, প্রান্তিক জাতিসত্তা, আঞ্চলিক ভাষা ও কথ্যভাষাভিত্তিক সাহিত্য অবহেলিত হয়েছে। সাহিত্যিক বিভাজন দেখা দিয়েছে। যেমন : সাহিত্য সমাজ বিভক্ত হয়ে—রাষ্ট্রঘনিষ্ঠ বনাম স্বাধীন সংগঠন হয়েছে। এই প্রক্রিয়ায় কেউ পেয়েছে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি, আবার কেউ কেউ হয়েছে বঞ্চিত।

সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় প্রতিরোধ গড়ে তুললেও অনেক ক্ষেত্রে পাল্টা সাহিত্যধারা সৃষ্টি হয়েছে। স্বৈরশাসনের মধ্যেই জন্ম নিয়েছে প্রতিরোধী সাহিত্য। যেমন : লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলন, সাময়িকী ও বিকল্প প্রকাশনা, গোপন পাঠচক্র এবং অনানুষ্ঠানিক সাহিত্য আড্ডা হয়েছে, কবিতা ও গল্পে রূপক, প্রতীক ও ইঙ্গিতের ব্যবহার করা হয়েছে। এভাবে এই ধরার সাহিত্য সৃষ্টির মাধ্যমে সরাসরি ক্ষমতার বিরুদ্ধে না গিয়ে ক্ষমতার ভাষাকে ভেঙে দেওয়ার প্রবণতাও দেখা গিয়েছে।

দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ও উত্তরাধিকার : সংগত কারণে স্বৈরশাসনের পতনের পরও তার সাহিত্যিক প্রভাব পুরোপুরি মুছে যায়নি। দেখা গিয়েছে, প্রতিষ্ঠানগত পক্ষপাত রয়ে গেছে। পুরস্কার ও স্বীকৃতির রাজনীতি হয়েছে প্রশ্নবিদ্ধ। সমান্তরালভাবে তৈরি হয়েছে অধিক সচেতন পাঠক। নেওয়া হয়েছে বিকেন্দ্রীভূত সাহিত্য উদ্যোগ। গতি বেড়েছে ডিজিটাল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিকল্প সাহিত্যচর্চার।

এ প্রসঙ্গে জুলাই অভ্যুত্থানের সুস্পষ্ট প্রভাব পড়েছে। কারণ, জুলাই অভ্যুত্থান, ২০২৪ শুধু রাজনৈতিক ক্ষমতার বিরুদ্ধে নয়, বরং দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক ও সাহিত্যিক কর্তৃত্বের বিরুদ্ধেও এক যুগান্তকারী গণপ্রতিরোধ হিসেবে গণ্য হবে। এই অভ্যুত্থান কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়—

১. হেজেমনিক বয়ানের ভাঙন : অভ্যুত্থানের পর প্রতিষ্ঠিত সাহিত্যিক কর্তৃত্বের নৈতিক অবস্থান প্রশ্নের মুখে পড়ে। সংগত কারণে লেখক ও পাঠক উভয়ের মধ্যে প্রশ্ন জাগে—নির্যাতন ও দমনের সময়ে সাহিত্য কোথায় ছিল?

২. প্রান্তিক সাহিত্যচর্চার উত্থান : শ্রমজীবী, নিম্নবিত্ত ও শিক্ষার্থীনির্ভর অভিজ্ঞতা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, লিটল ম্যাগাজিন ও বিকল্প প্রকাশনায় নতুন করে দৃশ্যমান হয়।

৩. সাহিত্যিক দায়বদ্ধতার পুনঃসংজ্ঞা : জুলাই অভ্যুত্থান সাহিত্যকে নৈতিক নিরপেক্ষতা থেকে রাজনৈতিক ও মানবিক দায়বদ্ধতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।

ওপরের আলোচনা থেকে প্রতীয়মান হয়, বাংলাদেশের সাহিত্যচর্চা দীর্ঘদিন ধরে হেজেমনি ও ফ্যাসিবাদের দ্বৈতকাঠামোর ভেতর আবদ্ধ ছিল। সাহিত্যচর্চার বিকাশে স্বৈরশাসনামলের হেজেমনি ও সাহিত্যিক ফ্যাসিজম একদিকে সাহিত্যকে নিয়ন্ত্রণ ও সংকুচিত করেছে, অন্যদিকে জন্ম দিয়েছে প্রতিরোধ, বিকল্প বয়ান ও নৈতিক সাহসের সাহিত্যধারার। এই দ্বন্দ্বই বাংলাদেশের সাহিত্যকে দিয়েছে তার জটিলতা, বহুস্বরতা ও রাজনৈতিক গভীরতা। মূলত সত্যিকার সাহিত্যিক মুক্তি আসে তখনই, যখন সাহিত্য রাষ্ট্রের অনুমতির নয়—মানুষের অভিজ্ঞতার ভাষা হয়ে উঠতে পারে।

জুলাই অভ্যুত্থান, ২০২৪ সেই হেজেমনি ও ফ্যাসিবাদ কাঠামোতে একটি ফাটল সৃষ্টি করেছে। তবে এই পরিবর্তন স্থায়ী হবে কি না, তা নির্ভর করবে বিকল্প সাহিত্যচর্চা কতটা সংগঠিত ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়—তার ওপর।

বলা যায়, বাংলাদেশের সাহিত্য শুধু নান্দনিক অনুশীলন নয়; এটি ক্ষমতা, প্রতিরোধ ও স্মৃতির রাজনীতির অংশ। জুলাই অভ্যুত্থান, ২০২৪—প্রমাণ করেছে যে সাহিত্যিক হেজেমনি ও ফ্যাসিবাদ চিরস্থায়ী নয়। এই অভ্যুত্থান আমাদের সামনে একটি সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে। একটি বহুকেন্দ্রিক, গণমুখী ও নৈতিকভাবে দায়বদ্ধ সাহিত্যচর্চার সম্ভাবনাও সৃষ্টি করেছে।

আধুনিক বাংলা সাহিত্যজাগরণে বাঙালি মুসলমান

ভবিষ্যতের পৃথিবী

মোহাম্মদ ঘোরী ও পৃথ্বীরাজের লড়াই

তকদির

দৃষ্টির কারিগর

মসজিদে কুরতুবা

রাষ্ট্রক্ষমতা, মাতৃরূপ ও রাজনৈতিক নৈতিকতার কাব্যিক দলিল

কুরতুবা থেকে ঢাকা, ইকবালের অসমাপ্ত জিহাদ

যেভাবে বেড়ে উঠি (পঞ্চম পর্ব)

যেই ডিলিউশন সত্য