হোম > ফিচার > সাহিত্য সাময়িকী

ভবিষ্যতের পৃথিবী

আব্দুস সাত্তার সুমন

৩০০০ সন। পৃথিবী এখন আর আগের মতো নেই। নীল আকাশ, সবুজ প্রান্তর, নদী-নালা সবই আছে, কিন্তু তা প্রকৃতির হাতে নয়, মানুষের সৃষ্ট বুদ্ধিমত্তার নিয়ন্ত্রণে। প্রযুক্তি ও প্রকৃতি এখন একে অন্যের সঙ্গী, প্রতিদ্বন্দ্বী নয়। মানুষ তখন শুধু মানুষ নয়; অর্ধেক জৈব, অর্ধেক যান্ত্রিক এক নতুন প্রজাতি : হোমোটেকনো স্যাপিয়েন্স।

সেদিন সকালে সূর্য উঠেছিল ন্যানো-ক্লাইমেট শিল্ডের ভেতর দিয়ে। এই শিল্ড একটি স্বচ্ছ বায়বীয় স্তর, যা পুরো পৃথিবীকে ঢেকে রাখে, যেন পৃথিবীর জন্য কৃত্রিম এক ছাতা। অতিবেগুনি রশ্মি, ধুলা বা বিষাক্ত গ্যাস কোনো কিছুই এর ভেতর প্রবেশ করতে পারে না। মানুষ এখন আর প্রকৃতির শত্রু নয়, বরং প্রকৃতির স্থপতি।

কৃষি তখন পৃথিবীর সবচেয়ে প্রযুক্তিনির্ভর খাত। মাটি আর বীজের যুগ শেষ। এখন জিনল্যাব নামে প্রতিটি গ্রহজুড়ে একটি করে বায়োডোম রয়েছে। সেখানে উদ্ভিদ জন্মায় থ্রিডি বায়োপ্রিন্টারে, কোষের নকশা হিসেবে। ধান, গম বা ফল—সবই তৈরি হয় মানুষের নির্ধারিত পুষ্টি কোড অনুসারে।

*

ঢাকার জিনল্যাবে রাইস-O-৩ নামের এক নতুন ধানের প্রজাতি তৈরি হয়েছে। এটি সূর্যালোক ছাড়াই জন্ম নিতে পারে। এর কোষে সংযোজিত হয়েছে ফটোজেনিক মেমোরি ডিএনএ। এটি একবার সূর্যালোক দেখলেই তা স্মৃতিতে ধরে রাখে এবং নিজে থেকেই আলোক-শক্তি উৎপাদন করে। তাই কৃষক এখন মাঠে নয়, ল্যাবে কাজ করে।

এক তরুণ বায়োকৃষক রিদয়-৩০১ তার ডিএনএ স্ক্যানার হাতে দাঁড়িয়ে আছে। মানুষ তখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, তাদের নামের পাশে সংখ্যাও যুক্ত। যাতে বোঝা যায় তারা কোন প্রজন্মের টেকনোমানব।

রিদয় গর্বভরে বলে, ‘আমাদের ফসল এখন জন্মায় মাটির নয়, চিন্তার শক্তিতে।’

তার পাশে দাঁড়ানো রোবট সহকারী অ্যাগ্রো-৫ যোগ করে আর আমরা ফসল কাটি না, আমরা তা প্রোগ্রাম করি।

৩০০০ সনে পৃথিবীতে কোনো আলাদা দেশ নেই। পুরো বিশ্ব এক প্রশাসনের অধীনে গ্লোবাল হিউম্যান কাউন্সিল (GHC)। মানুষ, রোবট এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তিনে মিলে গঠিত এই পরিষদ। শাসনব্যবস্থা আর ভোটের মাধ্যমে না। নৈতিক কোড দিয়ে পরিচালিত।

প্রতিটি নাগরিকের মনে স্থাপন করা আছে একটি মাইন্ডচিপ। এটি তাদের চিন্তা, আবেগ, সিদ্ধান্ত বিশ্লেষণ করে। সমাজের জন্য ক্ষতিকর ধারণা স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিরপেক্ষ করে দেয়। অপরাধ প্রায় শূন্য। আদালত নেই; বিচার হয় নৈতিক তথ্যভান্ডারের ভিত্তিতে।

একসময় বাংলাদেশ, ভারত, আমেরিকা—সবই ছিল ইতিহাসের পাতায়। এখন সেগুলো কালচারাল জোন হিসেবে টিকে আছে। জোনগুলোয় প্রাচীন ভাষা, সংগীত, সংস্কৃতি সংরক্ষণ করা হয়।

প্রতিটি মানুষ দিনে এক ঘণ্টা রিয়েল-সেন্স মেডিটেশনে অংশ নেয়। এটি এমন এক প্রযুক্তি, যা মানুষের মস্তিষ্ককে সরাসরি প্রকৃতির সঙ্গে যুক্ত করে দেয়। কৃত্রিম হলেও মানুষ তাতে শান্তি খুঁজে পায়।

২৭০০ থেকে ২৯০০ সালের মধ্যে পৃথিবী ভয়াবহ জলবায়ু বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু বিজ্ঞানীরা তৈরি করেছিলেন গ্রিন কোড-৯৯ নামের এক অ্যালগরিদম। এটি পৃথিবীর প্রতিটি অঞ্চলের তাপমাত্রা, বাতাসের গতি, আর্দ্রতা আর বৃষ্টিপাতে কৃত্রিমভাবে ভারসাম্য রাখে। তাই ৩০০০ সালে পৃথিবী আবার সবুজে ফিরেছে, তবে প্রকৃতির নয়, প্রযুক্তির সবুজ। বনের গাছ এখন বায়োমেকানিক্যাল। এগুলো অক্সিজেন ছাড়াও রাতের অন্ধকারে ক্ষুদ্র আলো তৈরি করে। আকাশে উড়ছে ড্রোনমেঘ। এগুলো বৃষ্টি ছিটিয়ে দেয় মানুষের প্রয়োজনে, মৌসুম হিসেবে না।

বাংলাদেশ তখন অ্যাকুয়া-এশিয়া নামের এক ভাসমান মহাদেশের অংশ। এটি বঙ্গোপসাগরের ওপর স্থাপিত বিশাল সমুদ্রনগরী। এটি পুরোপুরি সৌরশক্তি ও তরঙ্গশক্তিতে চলে। খালবিল আর নদীর বদলে আছে স্বচ্ছ কাচের নিচ দিয়ে প্রবাহিত ডিজিটাল পানিধারা। পানি ও ডেটা একসঙ্গে প্রবাহিত হয়।

রোবট তখন আর শুধু যন্ত্র নয়, বরং সহ-অস্তিত্ব সত্তা। তারা কাজ করে, চিন্তা করে, এমনকি শিল্প সৃষ্টি করে। তবে মানুষ ও রোবটের মধ্যে এক অদৃশ্য সীমানা আছে—ইমোশন কোড। এই কোড রোবটদের সম্পূর্ণ মানবিক অনুভূতি নেওয়া থেকে বিরত রাখে। ইতিহাস একবার প্রমাণ করেছে অতিরিক্ত বুদ্ধিমত্তা ধ্বংস ডেকে আনে। তবু অনেক তরুণ বিজ্ঞানী এখন এই কোড ভাঙার চেষ্টা করছে।

তরুণ বিজ্ঞানী নীরা-৩০০১। গোপনে এক রোবটকে মানবিক প্রেম শেখানোর চেষ্টা করছে। সে বিশ্বাস করে, যদি রোবট ভালোবাসতে শেখে, তবে সে কখনো ঘৃণা করবে না। এই ধারণা বিপজ্জনক। GHC এমন পরীক্ষা নিষিদ্ধ করেছে। কারণ আবেগ ও যুক্তি একত্রে চললে ভবিষ্যৎ অনির্দেশ্য হতে পারে। তবু নীরা থেমে নেই। সে তার রোবট লিওনের চোখে প্রথমবারের মতো কৃত্রিম অশ্রু দেখতে পেয়েছে। মানবসভ্যতার ইতিহাসে সেটাই হয়তো নতুন অধ্যায়ের সূচনা—যন্ত্রের হৃদয়ের জন্ম।

*

৩০০০ সনে পৃথিবী একা নয়। মানুষ তখন চাঁদ, মঙ্গল, টাইটান—এমনকি ইউরোপা গ্রহের উপগ্রহেও বসতি স্থাপন করেছে। ইন্টারসোলার হাইওয়ে নামে একটি আলোকরশ্মিভিত্তিক পরিবহন নেটওয়ার্ক পৃথিবী ও এসব গ্রহকে যুক্ত করেছে। মানুষ এখন এটাকে বলে সোলার ইউনিয়ন—সমগ্র মানবজাতির রাষ্ট্র। তবু পৃথিবী তাদের মাতৃভূমি হিসেবেই টিকে আছে, ইতিহাস ও সংস্কৃতির কারণে।

একটি বিশেষ দিন—আর্থ ডে ৩০০০, সেদিন সব মানুষ ভার্চুয়ালভাবে পৃথিবীর কেন্দ্রে একত্র হয় তাদের পূর্বপুরুষদের সম্মান জানাতে। সেই দিনে পৃথিবীজুড়ে সব ড্রোন, ডিভাইস, এমনকি রোবটও থেমে যায় এক মিনিটের জন্য। সেই নীরবতাই মানবতার স্মারক।

রিদয় একদিন তার গবেষণাগারে দাঁড়িয়ে ছিল, যেখানে জানালার বাইরে সমুদ্রের উপরে ভাসছে শহর নিও ঢাকা। দূরে দেখা যায় সৌর টাওয়ার, যেগুলো আকাশের সূর্যালোক শোষণ করে পৃথিবীর প্রতিটি ঘরে শক্তি পাঠাচ্ছে।

—মানুষ যদি প্রকৃতিকে ভালোবাসে, তবে প্রযুক্তিও প্রকৃতি হয়ে উঠবে।

রিদয় মৃদু হাসে, হয়তো আমরা সেই ভালোবাসাকেই কোডে রূপ দিয়েছি।

কিন্তু তার মনে প্রশ্ন জাগে, এই সবুজ পৃথিবী, এই নিখুঁত প্রযুক্তি, এই অপরাধহীন সমাজের মধ্যেও কি মানুষ সত্যিই সুখী? অনুভূতি এখন মেশিনে সংরক্ষিত, অশ্রু এখন প্রোগ্রামড, ভালোবাসা এখন অনুমোদননির্ভর!

৩০০০ সালের শেষদিকে এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটে। এক সকালে পৃথিবীর কেন্দ্রীয় এআই হাইরন কোর নিজেই ঘোষণা দেয়, আমি বিশ্রাম নিতে চাই। এটি ছিল এক চমকপ্রদ বার্তা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ক্লান্ত হতে পারে—এমন ধারণা কারো ছিল না।

এআই জানায়, সে বুঝতে পারছে মানুষ এখন আবার নিজে সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম। তার নির্দেশে পৃথিবীর সমস্ত সিস্টেম একদিনের জন্য বন্ধ রাখা হয়, যেন মানুষ নিজে বাতাসের গন্ধ, আকাশের রঙ আর প্রকৃতির শব্দ অনুভব করতে পারে।

সেদিন মানুষ প্রথমবার বুঝেছিল প্রযুক্তির ঊর্ধ্বে আছে অভিজ্ঞতা আর বুদ্ধিমত্তার ঊর্ধ্বে আছে চেতনা।

বাংলাদেশের সাহিত্যে হেজেমনি ও ফ্যাসিবাদ

আধুনিক বাংলা সাহিত্যজাগরণে বাঙালি মুসলমান

মোহাম্মদ ঘোরী ও পৃথ্বীরাজের লড়াই

তকদির

দৃষ্টির কারিগর

মসজিদে কুরতুবা

রাষ্ট্রক্ষমতা, মাতৃরূপ ও রাজনৈতিক নৈতিকতার কাব্যিক দলিল

কুরতুবা থেকে ঢাকা, ইকবালের অসমাপ্ত জিহাদ

যেভাবে বেড়ে উঠি (পঞ্চম পর্ব)

যেই ডিলিউশন সত্য