শহীদ তিতুমীর
ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রামে বাংলার যেসব বীর অনন্য ভূমিকা পালন করেছিলেন, যারা মুসলিম সমাজের উন্নতি, উন্নয়ন ও বৃহত্তর স্বার্থ পুনরুদ্ধারের জন্য সংগ্রাম করেছেন, যারা সাম্রাজ্যবাদ অপশক্তির শোষণ ও অন্যায়ের কবল থেকে জনসাধারণকে উদ্ধার করতে নিজেদের উৎসর্গ করে দিয়েছিলেন, তাদের প্রধানতম হলেন শহীদ তিতুমীর। তিতুমীর ছিলেন সাইয়েদ আহমদ শহীদের একজন বিশিষ্ট শিষ্য। তিনি জনসাধারণ ও প্রজাদের নিয়ে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন। তার আসল নাম ছিল সাইয়েদ নিসার আলী মীর। তিনি ১৭৮১ সালে চব্বিশ পরগনা জেলার বারাসত মহকুমার অন্তর্গত চাঁদপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পরিবার ছিল অত্যন্ত সম্ভ্রান্ত ও বিশিষ্ট। বংশপরম্পরায় তারা ইসলাম প্রচারের কাজে নিয়োজিত ছিলেন। তার বাবা সাইয়েদ হাসান আলীও ছিলেন একজন সুপরিচিত ব্যক্তি।
তিনি শিক্ষা-দীক্ষায় ছিলেন অনেক আগ্রহী। অল্প বয়সেই তিনি কোরআনে হাফেজ হয়েছিলেন। তাছাড়া আরবি ব্যাকরণ, ফারায়েজ (ইসলামের উত্তরাধিকার আইন), হাদিস, দর্শন, তর্কশাস্ত্র, তাসাউফ, আরবি-ফারসি কাব্য ও সাহিত্যে তিনি বিশেষভাবে দক্ষতা অর্জন করেছিলেন। সেইসঙ্গে তিনি বাংলা ভাষায়ও অসাধারণ পণ্ডিত ছিলেন। (সাইয়েদ নিসার আলী তিতুমীর, পৃষ্ঠা : ২২)
তিতুমীরের উত্থান
তিনি মুনশী আমীর নামক স্থানীয় ভূস্বামীর মেয়েকে বিয়ে করেন। তিতুমীর কলকাতার একজন মল্লযোদ্ধা ও আখড়ার দলনেতা ছিলেন। স্থানীয় জমিদাররা প্রজাদের কাছ থেকে টাকা আদায়ের জন্য তাদের নিয়োগ করেন। তিতুমীরও এক জমিদারের সঙ্গে কাজ করতেন। এই কাজ করতে গিয়ে বিবাদে জড়িয়ে পড়লে কিছুকালের জন্য তাকে জেলে যেতে হয়। জেল থেকে মুক্তি পেয়ে তিতুমীর দিল্লির রাজপরিবারের এক ব্যক্তির অধীনে কাজ গ্রহণ করেন এবং তার সঙ্গে হজে যান। মক্কায় অবস্থানকালে উপমহাদেশের ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রামের মহানায়ক ও ‘তরিকায়ে মুহাম্মাদিয়া’ আন্দোলনের প্রধান নেতা সাইয়েদ আহমদ শহীদের সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হয় এবং তার কাছে দীক্ষা গ্রহণ করেন। ১৮২৭ সালে তিতুমীর দেশে ফেরেন এবং হায়দারপুরে বসতি স্থাপন করে সমাজ সংস্কারের কাজে আত্মনিয়োগ করেন। অল্প সময়ের মধ্যে তিনি খ্যাতি অর্জন করেন এবং তিন-চারশ লোক তার শিষ্যত্ব গ্রহণ করে। তারা ইসলামের আদর্শে জীবনযাপন করতে থাকে। তারা দাড়ি রাখত ও বিশিষ্ট ধরনের পোশাক পরত। এজন্য সমাজে তাদের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য ছিল। তিতুমীরের নেতৃত্বে বাংলায় সংস্কার আন্দোলন গড়ে ওঠে।
বাংলার বহু কৃষক তিতুমীরের সংস্কার আন্দোলনে সাড়া দেয়। এর ফলে তার নেতৃত্বে সাধারণ মানুষদের সমন্বয়ে গণআন্দোলন গড়ে ওঠে। মুসলমান প্রজারা সংঘবদ্ধ হতে শুরু করে। তিতুমীরের উত্থান ও কৃষকরা শক্তিশালী হয়ে ওঠার ফলে স্থানীয় হিন্দু জমিদাররা ভয় পেয়ে যায়। তারা তিতুমীরের অনুচরদের শক্তি বৃদ্ধির পথ বন্ধ করতে সচেষ্ট হয়ে ওঠে। তারাগুনিয়া, নগরকোট ও কুমারগাছির জমিদাররা তিতুমীরের শিষ্যদের অপমান ও জরিমানা করতে শুরু করে। পুড়ার কিষেন দেব রায় মুসলমান প্রজাদের ওপর ‘দাড়ি কর’ বসান। সরফরাজপুরের প্রজারা এই অপমানজনক কর দিতে অস্বীকার করে। তিতুমীর প্রজাদের ওপর জমিদারের অত্যাচার বন্ধের জন্য জেলা ও বিভাগীয় কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চেষ্টা করেন; কিন্তু তার চেষ্টা ব্যর্থ হয়।
সংগ্রামের সূচনা
শান্তিপূর্ণ উপায়ে জমিদারদের অত্যাচারের প্রতিকার সম্ভব না হওয়ায় তিতুমীর প্রজাদের স্বার্থরক্ষার জন্য সশস্ত্র প্রতিরোধের পথ বেছে নিতে বাধ্য হন। ১৮৩১ সালের অক্টোবর মাসে তিনি শিষ্য মুইজউদ্দীনের নারিকেলবেড়িয়া গ্রামের বাড়িকে কার্যকেন্দ্র হিসেবে স্থির করেন। এই সময় মিসকিন শাহ নামক এক ফকির তার দলে যোগ দেন। ধীরে ধীরে তিতুমীরের অনুসারীরা নারিকেলবেড়িয়ায় সমবেত হতে শুরু করে। সেখানে তারা বাঁশের তৈরি এক শক্ত ঘাঁটি (‘তিতুমীরের বাঁশের কেল্লা’ নামে বিখ্যাত) নির্মাণ করে এবং যুদ্ধের জন্য প্রয়োজনীয় রসদ সংগ্রহ করতে থাকে। তাদের লক্ষ্য ছিল জমিদারদের অন্যায়-অত্যাচারের প্রতিকার এবং নিজেদের সুদৃঢ় অবস্থান গ্রহণ।
একপর্যায়ে তার অনুসারীরা পুড়া গ্রামে প্রবেশ করে গ্রামটি দখল করে নেন। তিতুমীরের দল নিজেদের দেশের প্রকৃত অধিকারী বলে ঘোষণা করে। তার বিশ্বস্ত সহচর গোলাম মাসুমকে সৈন্যাধ্যক্ষ নিযুক্ত করা হয়। গোলাম মাসুমের নেতৃত্বে এই বিদ্রোহী বাহিনী লাউঘাটাসহ আরো কয়েকটি গ্রামে আক্রমণ চালিয়ে দখল প্রতিষ্ঠা করে নেয়। অল্প সময়ের মধ্যেই চব্বিশ পরগনা ও নদীয়া জেলার বহু গ্রামে তিতুমীরের প্রভাব ও আধিপত্য বিস্তৃত হয়।
বারাসতের যুগ্ম ম্যাজিস্ট্রেট আলেকজান্ডার ১২৫ জন সশস্ত্র সৈন্য নিয়ে তিতুমীরের সামরিক কেন্দ্র নারিকেলবেড়িয়ার দিকে অগ্রসর হন। সেখানে সংঘটিত এক সংঘর্ষে আলেকজান্ডারের বাহিনী পরাজিত হয়। তাদের অন্তত ১৫ জন নিহত এবং বহু সৈন্য আহত হয়। বসিরহাটের দারোগা আহত অবস্থায় বন্দি হন। এই সাফল্যের পর তিতুমীরের মুক্তিবাহিনী বারগুড়িয়ার একটি নীলকুঠিসহ অন্য একটি নীলকুঠিতে আক্রমণ চালিয়ে লুট করে। বিদ্রোহ ক্রমেই বিস্তৃত ও সংঘবদ্ধ রূপ নিতে থাকে।
১৭ নভেম্বর কৃষ্ণনগরের ম্যাজিস্ট্রেট প্রায় ৩০০ সৈন্য নিয়ে নারিকেলবেড়িয়ায় আক্রমণ করেন। কিন্তু তিতুমীরের মুক্তিবাহিনী এই বাহিনীকেও পরাজিত করে পিছু হটতে বাধ্য করে। এই পরপর ব্যর্থতার ফলে ব্রিটিশ প্রশাসন বিষয়টিকে গুরুতর হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সরকার আলেকজান্ডার ও মেজর স্কটের অধীনে পদাতিক, অশ্বারোহী ও বন্দুকধারী সৈন্যদের সমন্বয়ে এক বৃহৎ সামরিক বাহিনী তিতুমীরের বিরুদ্ধে পাঠায়। ১৮৩১ সালের ১৯ নভেম্বর নারিকেলবেড়িয়ায় এক তুমুল ও চূড়ান্ত যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এই যুদ্ধে তিতুমীরের অনুচরবাহিনী পরাজিত হয়। পরাজয়ের পর ইংরেজ সৈন্যরা নিহত বিদ্রোহীদের দেহ পুড়িয়ে দেয়। তিতুমীর ও তার অনুসারীদের বাড়িঘর লুণ্ঠন করা হয় এবং সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয়। তিতুমীরের প্রধান সহচর গোলাম মাসুমকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। আরো ১১ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং ১২৮ জনকে বিভিন্ন মেয়াদের কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়।
সমসাময়িক সরকারি নথি থেকে জানা যায়, তিতুমীরের আন্দোলন প্রথম দিকে মূলত স্থানীয় সমস্যাকেই কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল। বারাসত ও নদীয়া অঞ্চলের কৃষক ও তাঁতিরা এই আন্দোলনের প্রধান অংশগ্রহণকারী ছিল। শুরুতে এর সঙ্গে প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক লক্ষ্য জড়িত ছিল না বলেই প্রতীয়মান হয়। তবে পরবর্তী সময়ে ধারণা জন্ম নেয়, ব্রিটিশ শাসন উৎখাত করে মুসলিম শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠাই তিতুমীরের চূড়ান্ত উদ্দেশ্য ছিল। ঐতিহাসিক ডব্লিউ ডব্লিউ হান্টারও তিতুমীরের আন্দোলনের মধ্যে রাজনৈতিক অভিপ্রায়ের উপস্থিতি লক্ষ করেছিলেন।
তবে প্রাথমিক পর্যায়ে তিতুমীরের লক্ষ্য ছিল মুসলমান সমাজের ধর্মীয় ও সামাজিক সংস্কার সাধন। এই সংস্কার প্রচেষ্টার ফলে মুসলমান কৃষকসমাজ ক্রমে সংঘবদ্ধ হয়ে ওঠে। তাদের এই সংগঠিত অবস্থান জমিদারদের মধ্যে ভীতি সৃষ্টি করে এবং তারা তিতুমীরের অনুসারীদের ওপর নানা ধরনের নিপীড়ন শুরু করে। এরই পরিণতিতে সংস্কারমূলক উদ্যোগ ধীরে ধীরে প্রজা-আন্দোলনে রূপ নেয়। তিতুমীরের নেতৃত্বে প্রজারা জমিদারদের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়। এই সংগ্রামে তারা উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করে এবং স্থানীয় বহু জমিদারের অধীনস্থ গ্রাম তাদের নিয়ন্ত্রণে আসে। এই সাফল্য তাদের আত্মবিশ্বাস ও সাহস বহুগুণে বাড়িয়ে দেয় এবং তাদের মনে বৃহত্তর আকাঙ্ক্ষার সঞ্চার ঘটে।
পরবর্তীকালে তিতুমীর নিজের নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে এক ধরনের স্বাধীন শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। ফলে তার প্রজা-আন্দোলন কেবল একটি সীমিত প্রতিবাদে আবদ্ধ থাকেনি, তা এক গণবিদ্রোহে রূপ নেয়। কৃষক ও তাঁতিরা জমিদার এবং নীলকরদের বিরুদ্ধে সম্মিলিতভাবে লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়। অত্যাচার, অবিচার ও অপমানের বিরুদ্ধে এবং এক শক্তিশালী শাসনযন্ত্রের মোকাবিলায় এই সংগ্রামের মাধ্যমে প্রজারা নিজেদের আত্মসম্মান ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার প্রয়াস চালায়।
সূত্র :
বাংলায় মুসলমানদের ইতিহাস (১৭৫৭-১৯৪৭), এমএ রহিম
ওহাবী আন্দোলন, আবদুল মওদুদ
পলাশি থেকে ধানমন্ডি (দ্বিতীয় খণ্ড), মনযূর আহমাদ
সাইয়েদ নেসার আলী তিতুমীর, মোশাররফ হোসেন খান
শহীদ তিতুমীর, আলমগীর হোসেন খান
তিতুমীর বা নারিকেলবেড়িয়ার লড়াই, বিহারিলাল সরকার