অনুবাদ কবিতা
সিলসিলা-এ-রোজ-ও-শব, নূর ও নিগাহের অনন্ত ধারা,
জন্ম-মৃত্যুর রাজপথ: শীতল শুরুয়াত, দিশাহারা।
জীবন-নদীর ঢেউ বয়ে যায় ক্ষণমাত্র, ক্ষণকাল;
তবু নূর নিঃসৃত হয়, নিঃশ্বাসে নাচায় যায় আযল।
হে সাঞ্জিদা বুরুজ! তোর নীলবর্ণ কখনো বদলায়?
পাহাড়-ঘেঁষা স্বর্নালী দিগরেখা তুলির টানে আঁকা,
আলোর কাফেলা ছুঁতে চায় জিন্দা বুক যত।
কুরতুবা—তোর পাথর-দেয়ালে রোদের নরম আদর,
পুরানা কওমের রগে জাগে নতুন কদর।
কুঁড়ের পাশে যে নদী বয়ে গেছে, গুফতগু-ই ইশ্ক তার ওপারে,
হিন্দ-ইরানের ইলম সুপ্ত সেখানে, তীব্র ফণা নিচু করে।
যখনই ইতিহাসে আঁধার নামে পরতে-পরত ঘিরে,
ইশ্কের আগে দগ্ধ দুঃখ ফৌত, গইলা যায়, ধীরে ধীরে।
রব্বের আশিকি বিনা মইরা মিটে যাই ভাঙনের স্রোতে;
হক আদায় করে ইলাহী, ছবি হই জীবনের পটে।
যে কামের গভীরে ইশ্ক, আবাদিয়ত সেখানে ভারী,
প্রেমে পাকা বইলা আমার সত্য ধ্বংস-বিদারী।
হে মসজিদ, তোর খিলান ভরা অন্ধকারের গভীর মায়ায়
এক নিঃশব্দ সুর ওঠে বেজে, কালের ধূলির জমাট ছায়ায়।
এ সুরের মূলে গূঢ় রুহের অতল আলো,
ক্লান্ত জাহানের জোয়ারে সেই ইস্ট সামালো।
সূর্য পাটে বসে—রক্তিম আঁচে কুরতুবা থিরথির কাঁপে,
আলোর খিলান থেকে চুনি, সাঁঝের মায়া ঝরে।
কিষাণীর ঠোঁটে গাঁয়ের গানের সরল ফিনিক,
রূপমুগ্ধ জোয়ান কবি তার তরে শপে দেয় প্রাণের লিরিক।
হে হাওয়া—তুই আছিস, এখানে?
দুঃখের শিথানে ঝংকার লুকায়?
গগন-গরিমা আজও থাকে উন্মোচিত,
এক মুয়াম্মা মুফত হয়ে যায়।
এ স্থান মোমেনের, ও স্থান কাফেরের—
যে হৃদয়ে ইশ্ক কামিল, তার তাবাহী নাই,
যে হৃদয়ে রুহ শুকনা, সেই উপদ্রুত উপকূলে আলো নাই।
অহংকার—যেন মিটমিটে জোনাকির গুচ্ছ,
প্রেম-পরাভূত মারহামাতই থাকে,
বাকি সব ধূলিকণার মত তুচ্ছ।
প্রেমহীন নির্মাণ, কালের কাছে পরাভূত,
কালের স্রোতে ভাইসা যায়,
স্মৃতি ও সিলসিলাহীন; প্রেমময় কর্ম থাইকা যায় মনিকোঠায়।
কুরতুবা, তোকে সইতে হইসে হুতাশন-নিমগ্ন নিরাশা অনেককাল,
তবু দাঁড়িয়ে আছিস আজ, প্রেমে ভরা আমলের ভরসায় অটল।
কারণ তোর ভিতরে গাঁথা আছে ইশ্কের কারুকাজ।
ইশকই এ হরমের স্থপতি, সৃজন ও কল্পনার মালিক।
হৃদয়ের বাঁকে লুকানো সেই মাস্ত মেহতাব,
অমাবস্যার আউলা আয়লা তার, ফিতরাত ঢালে ধীরতালে।
এশকই হিম্মত, এশক এক গেহরাই অন্বেষণ,
যে প্রেম জীবাত্মায় জাগরুক নির্মাণ, সেই প্রেম স্থায়ী সৃজন।
নিথর নিশায় যে শ্বাস মেহরাবে সংগীত বিশেষ,
সেই স্বর সকল দুঃখের নিদান হইসে।
রাতের শীতলতা, গম্বুজের নীলে, নয়া ওক্তের ওজর;
শতাব্দীর ওপার থেকে কে বলে ওঠে ধীরে,
“হস্তি ফানি, ইশকই বাকি।”
জীবন ক্ষণিক—
কিন্তু প্রেম-হেফাজতে গড়া নির্মাণ
মহাকালের মহিমা ধারণ করে চিরকাল।
অতীত সব উপড়ে নেয়,
তবু আশিকের আর্তি-আহ্সান
আবার গড়ে তোলে নতুন জামানার আগুন-দাহানা,
সমুদ্যত সাবুদের মতো।
বাংলা : এবাদুর রহমান