হোম > ফিচার > সাহিত্য সাময়িকী

সাহিত্যবই, মলাট ও মলাটের উল্টো পিঠ

আতা সরকার

সব বইয়েরই মলাট থাকে। সুন্দর মুখ যেমন হৃদয়কে আকর্ষণ করে মনে দাগ এঁকে যায়, তেমনি যে বইয়ের মলাট যত সুদৃশ্য ও আকর্ষণীয় হয়, সে বই প্রথম দেখায় পাঠক টানতে পারে। কথাতেই আছে : আগে দর্শনধারী, পরে গুণবিচারী।

প্রচ্ছদশিল্পীদের হাতের ছোঁয়ায় বই হয়ে ওঠে মনোলোভা, অনেক সময় বইটির ভেতরকার মাল-মসলার চেয়েও। তাই মলাট শুধু মলাট নয়, বইয়ের মোড়কও, প্রচারপত্র।

বই যদি হয় সাহিত্যের, মোড়কও কথা বলে ওঠে রংতুলির নানা ভাষায়। আমাদের দেশের সাহিত্যের বিকাশ যে মাত্রারই হোক না কেন, মলাটের উন্নতি ঘটেছে শনৈ শনৈ।

পাঠক বইয়ের প্রতি প্রাথমিকভাবে আকৃষ্ট হয় মলাটের প্রথম পাতা দেখে, তাকেই বুঝি প্রচ্ছদ বলে। সবকিছুর যেমন শেষ আছে, তেমনি আছে মলাটের শেষ পাতা। মলাটের প্রথম পাতায় থাকে ডাকসাঁইটে শিল্পীর কারুকাজ, উল্টো পিঠে থাকে কী? মলাটের শেষ পাতায়?

সেখানেও থাকে কারুকাজ। তবে সব কারুকাজই যে শিল্পীর ছোঁয়ায় হতে হবে, এমন কোনো কথা নেই। শেষ মলাট হতে পারে শূন্য প্রান্তর। কিংবা উৎকীর্ণ হতে পারে ওই বইয়েরই ভেতরকার পৃষ্ঠায় বর্ণিত বিশেষ বিশেষ অংশ, বাণী, কিংবা বইটির বিষয়বস্তুর সারসংক্ষেপ। অথবা শেষ মলাটজুড়ে থাকতে পারে লেখকের বিচিত্র মুডের পোর্ট্রেট। কখনো কখনো অবশ্য এই পোর্ট্রেট মলাটের শুরুতেই এসে স্থান জবরদখল করে ফেলে।

তবে বেশির ভগ ক্ষেত্রেই শেষ মলাটজুড়ে পোর্ট্রেটসহ বা পোর্ট্রেট ছাড়া যা থাকে, তা হলো সার্টিফিকেট—সার্টিফিকেটটাং লেখক সম্পর্কে। স্কুল-কলেজের পরীক্ষার সার্টিফিকেট তো প্রথম শ্রেণি, দ্বিতীয় শ্রেণি বা তৃতীয় শ্রেণি উৎকীর্ণ থাকে, কিন্তু সাহিত্যবইয়ের শেষ মলাটের সার্টিফিকেটে সব লেখকই পান সোজাসাপ্টা ফাস্টো ক্লাস। কবি-সাহিত্যিক লেখকরা কি হতে পারেন এর নিচের অন্য কোনো ক্লাসের বারোয়ারি প্যাসেঞ্জার?

কারা লেখেন শেষ মলাটের এই সার্টিফিকেট? কোনো বিশিষ্ট বুদ্ধজীবী? নামজাদা কোনো সাহিত্যিক? প্রকাশক? স্বয়ং গ্রন্থকার?

এই কৌতূহল সব পাঠকের। নামিদামি লেখক হলে সার্টিফিকেটে তা লেখা থাকে। যদি লেখা না থাকে, তাহলে কি প্রকাশ কিংবা লেখক নিজেরাই নিজ নিজ কলমে লেখেন সার্টিফিকেট?

এর আগে প্রশ্ন, শেষ মলাটে এমন সার্টিফিকেট কেন প্রয়োজন? বিশেষ করে, লেখকের খাট সার্টিফিকেট হিসেবে যেখানে রয়েছে পুরো বইটিই? শেষ মলাটের সার্টিফিকেট কি লেখক ও বইটির বাজারজাতকরণের কলাকৌশল?

সার্টিফিকেটের ভাষা থাকে অনবদ্য। ভাবনাটা যেন এমন : এই তো লেখকের হাত থেকে শুধু ফস্কে চলে গেল নোবেলের সাহিত্য পুরস্কার। লেখক এমন উচ্চমানেরই!

লেখক কি করে নিজেরই সম্পর্কে নিজেই লেখেন এমন স্তুতিবাক্য? এমন লেখায় তিনি নিজেই লজ্জাবনত হয়ে পড়েন না?—বোধহয় না। বরং বোধ করেন এক ধরনের আত্মতুষ্টি—নিজে যা নন, নিজেকে তাই বানিয়ে। কানা ছেলের নাম পদ্মলোচন হয়ে বইটি বই-বাজারের তাকে শোভা বাড়ায়।

আমাদের একজন প্রিয় সাহিত্যিক বেশ কিছুদিন ছিলেন বিদেশ-বিভুঁইয়ে। বিশ্বসাহিত্যিক হওয়ার ঝোঁকে কি না কে জানে। নিজের দৌড় বুঝতে পেরে ফিরে আসেন আবার গণ্ডমূর্খদের দেশে। এখানেই হাতপা ছড়িয়ে বসেন। কি না লিখেছেন—কবিতা, গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, নাটক, চলচ্চিত্র কাহিনি, চিত্রসংলাপ, চিত্রনাট্য—এমনকি সরকারি অর্থানুকূল্যে ছবিও বানিয়েছেন। ঘরে বসে বসে ছবিও আঁকতেন। শরৎচন্দ্রের পথের দাবি উপন্যাসের সর্বকাজে পারঙ্গম নায়কের নামটি কি মনে আছে? সেই নামটাও বিশেষণ হিসেবে যুক্ত করেছেন নিজের নামের সঙ্গে। তিনি নিজের বই নিজেই প্রকাশ করে প্রকাশকও হয়ে উঠেছিলেন। সেসব বই নিজেই বাজারজাত করতেন। রংপুরের এক ঐতিহাসিক কৃষকনেতা যিনি ব্রিটিশ শাসনের গোড়ার দিকে কৃষকবিদ্রোহ ঘটিয়ে অমর হয়ে আছেন, তাকে নিয়ে নাটক লিখেছেন তিনি। মঞ্চসফল নাটক। দর্শক-সমালোচকরা বাহবা দিয়েছেন। কিন্তু এসব বাহবায় মন ভরেনি তার। নাট্যগ্রন্থের উল্টো পিঠে নিজেই নিজেকে সার্টিফিকেট দিলেন যে তিনি নাটকটি লিখে উপমহাদেশের মহান সাহিত্যিক হিসেবে আবির্ভূত হলেন। আমরা পাঠকরা তো এমন আবির্ভাবই প্রত্যাশা করি, কিন্তু এমন ধারায় সার্টিফিকেটি ভূতুড়ে আবির্ভাবে পাঠক হিসেবে আমরা লজ্জা পাই।

শুধু নিজের বইয়ে লেখা হয় না নিজের সার্টিফিকেট, বিশিষ্টজনদের কাছ থেকেও আদায় করা হয় সার্টিফিকেট, মলাটে জুড়ে দেওয়া হয়। যার লেখা সার্টিফিকেট, তিনি হতে পারেন ডাকসাঁইটে কোনো লেখক, কলকাতার কেউ হলে তো পোয়াবারো।

কলকাতার একজন জ্ঞানী পণ্ডিত, ভক্তরা তাকে ডাকেন ভারতের বার্ট্রান্ড রাসেল বলে, তাকেই এক কবিতার বই উৎসর্গ করলেন ঢাকার পহেলা কাতারের এক কবি। নির্দোষ উৎসর্গে কীইবা আছে সন্দেহ করার! আজকাল তো উৎসর্গ শুধু বই হয় না, বইয়ের একেকটা কবিতাও উৎসর্গ হয়। একটা বইয়ে অনেকগুলো কবিতা উৎসর্গ করা যায় অনেকজনকে।

ঢাকার কবি বই পাঠিয়ে দিয়েছিলেন ভারতের রাসেলকে। চিঠি এলো তার কাছ থেকে। একেবারেই ব্যক্তিগত চিঠি। চিঠির কয়েক লাইনে কবির কবিতা নিয়ে দু-চারটে সাধুবাদ আছে। যেমন আমাদের ঘরের খোকা দৌড়াতে গিয়ে যদি হোঁচট খায়, তারপর উঠে আবার দৌড়ায়— আমরা খোকার পিঠ চাপড়ে উৎসাহ দিয়ে বলি : বাহ! বেশ! বেড়ে হচ্ছে। চালিয়ে যাও।

এ ধরনেরই কিছু কথাবার্তা কবিকে লিখেছিলেন পণ্ডিতজন। কবি তাকে লেখা ব্যক্তিগত চিঠিটা জানিয়ে দিলেন দেশবাসীকে। অধুনালুপ্ত এক প্রগতিশীল সাহিত্য মাসিকে বের হলো চিঠিটা। ধন্য ধন্য পড়ে গেল ঢাকার সাহিত্যমহলে।

এই কবির মাপেরই আরেকজন, হতে পারেন তার চেয়েও বড়—কবিতার দর্শনগত শক্তিতে, ভাবময়তায়, এমনকি জনপ্রিয়তাতেও। তিনিও আর বসে রইলেন না, জুটিয়ে নিলেন ওই পণ্ডিতজনেরই সার্টিফিকেট। সেটাই জুড়ে দিলেন তার এক কাব্যগ্রন্থে। এই কাব্যগ্রন্থের সুবাদেই তিনি জিতে নিয়েছিলেন এক বহুজাতিক কোম্পানির ঘোষিত মোটা টাকার পুরস্কারটি।

বাঙাল এই দেশে এসেছিলেন কলকাতার পণ্ডিত। ভক্তদের আদর-আপ্যায়ন পেয়ে চব্য চোষ্য লেহ্য পানীয় পেয়ে ভক্তদের প্রতি স্নেহে আপ্লুত হয়েছেন। নিজ দেশে ফিরে গিয়ে একেকজনের ওজন বুঝে বুঝে নিজ দেশেই আয়োজন করে বাংলাদেশি কবি-লেখকদের দিয়েছেন সার্টিফিকেট। নাকি সার্টিফিকেট বিলিয়ে ব্যঙ্গ মজা করেছেন! তবে সার্টিফিকেট পাওয়া কবি-সাহিত্যিকরা কিন্তু কৃতার্থ! বগল বাজিয়ে মচ্ছব করেছেন।

সার্টিফিকেটের মাহাত্ম্য বুঝেছিলেন আরেক কবি। দুটি বাজার কাটতি পত্রিকায় কলাম লিখতে গিয়ে খুলেছিলেন সার্টিফিকেট বিতরণী ইনস্টিটিউশন। এর নিশ্চয়ই একটা নেপথ্য মতলব ছিল—জুনিয়রদের কাছ থেকে তৈল মর্দন নেওয়া, অবশ্যই আমাদের চোখের আড়ালে। আমরা দেখতে পেয়েছি কী অবিরল ধারায় বেরিয়ে আসে গাদা গাদা সার্টিফিকেট, তোড়ে ভেসে যায় তরুণ থেকে তরুণতর কবি-সাহিত্যিক।

এই কবিই একবার আনুষ্ঠানিকভাবে বুড়িগঙ্গায় বিসর্জন দিয়েছিলেন তরুণ এক কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থ। আমাদের দেশের মফস্বল কবিদের কিন্তু নজর নেই ভিনদেশি শহরের কবিদের প্রতি। তারা কবিতার বই প্রকাশ করতে অনেক খাটা-খাটনি করেন। অনেক কষ্টে মফস্বলের ভাঙা প্রেস থেকে খেয়ে না খেয়ে তারা যে বই প্রকাশ করেন, সেই বইয়েরও পেছন-মলাটে থাকে লেখক সম্পর্কে আবেগ উচ্ছ্বাস, মফস্বলী কায়দায়। থাকে সার্টিফিকেটও, লেখাটা নিজেরই কিংবা ঢাকার কোনো কবি-লেখকের। তাদের দৌড় ঢাকা পর্যন্তই, যেমন ঢাকাইয়াদের দৌড় কলকাতা পর্যন্ত।

মলাটের উল্টো পিঠ নয়। সাহিত্যিকের মৌলিক লেখা হিসেবে সাহিত্যকর্মই কি হয়ে উঠতে পারে না একজন সাহিত্যিকের জন্য মূল সার্টিফিকেট?

আমাদের শবেবরাত : ইতিহাস ও সংস্কৃতি

বাংলাদেশে ইসলাম আগমনের অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট

মোগল স্থাপত্যের অনন্য নিদর্শন মির্জাপুর শাহি মসজিদ

৪ দাবিতে প্রধান উপদেষ্টার বরাবর প্রকাশকদের স্মারকলিপি

খিলাফত রাষ্ট্রে বিচারব্যবস্থার ভিত্তি এবং বিচারিক স্বচ্ছতা

ফিলিস্তিন অভিযানে উসামার সেনাবাহিনী

স্লোগানের দর্শন এবং ইনকিলাব জিন্দাবাদ

রোমাঞ্চ, ইতিহাস আর প্রকৃতি

খালেকুজ্জামানের চাকরিজীবন

মুসা আল হাফিজ-এর কবিতা