ঈদের দিনটিতে কোন পোশাকে কেমন সাজবেন তা নিয়ে চিন্তার শেষ নেই। সব পরিকল্পনাকে ঘিরে যেটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তা হলো নিজেকে পরিপাটি, উজ্জ্বল, সতেজ ও সুন্দর রাখা। নিজের সৌন্দর্যের মাত্রাকে আরেকটু বাড়িয়ে তুলতে নতুন জামা-কাপড়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সাজিয়ে নিতে হয়। ঈদের দিন বিকালে কীভাবে নিজেকে উপস্থাপন করবেন, সাজবেন তা নিয়ে লিখেছেন সুবানা হাসিন
বিকালে পোশাক
সারা দিনের কাজকর্ম শেষ করে ঈদের বিকাল মানেই ঘুরে বেড়ানো। সবাই আত্মীয়স্বজন বন্ধুবান্ধবদের বাড়িতে বেড়াতে যায়। এ সময় আরামদায়ক পোশাক বেছে নিতে হবে। যে পোশাক আপনাকে অস্বস্তি দেবে, সেটি পরে নিশ্চয়ই বেশি সময় থাকতে পারবেন না। তাই খুব বেশি আঁটসাঁটের বদলে ঢিলেঢালা পোশাক বেছে নিন। ব্যতিক্রমী কাটছাঁটের টপস, সালোয়ার কামিজ, গাউন পরলে ভালো দেখাবে। হাইনেকের বদলে কলার ছাড়া গলার জামা পরতে পারেন। এতে আরাম পাবেন। হাতা ছোট হলেই ভালো। ঈদে ছোটদের পোশাকের পাশাপাশি পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠদের পোশাক সমান গুরুত্ব দিতে হয়। তাদের কথা মাথায় রেখে নরম ও আরামদায়ক কাপড়ের পোশাক দিতে হবে। যেহেতু তারা শাড়ি পরে তাই তাদের জন্য সুতি প্রিন্ট, জুট কটন, হাফ সিল্ক, হাফ সুতি, তাঁতের শাড়ি পরাতে পারেন। হালকা ও ন্যুড কালারগুলো প্রাধান্য দিয়ে কিনতে পারেন। এবারের ঈদে ফ্যাশন হাউসগুলো নতুন নকশা, থিম, প্যাটার্ন ও কাটের বর্ণিল পোশাক পোশাক নিয়ে এসেছে সব বয়সি মানুষের জন্য। বিশ্বরঙ, অঞ্জন’স, রঙ বাংলাদেশ, লা রিভ, টুয়েলভ, কে ক্র্যাফটের মতো দেশীয় ব্র্যান্ডগুলো সমসাময়িক ফ্যাশন ট্রেন্ড, ক্রেতাদের চাহিদা, আবহাওয়া, আরাম ও স্বাচ্ছন্দ্যকে প্রাধান্য দিয়ে সাজিয়েছে তাদের এবারের সংগ্রহ। কয়েক বছর ধরেই ফ্যাশন জগতে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে জুটি বেঁধে পোশাক পরার ট্রেন্ড। বাবা-মা, মা-মেয়ে, বাবা-ছেলে এমনকি পরিবারের সবাই একই থিমের পোশাক পরে উদযাপন করতে পারবে এবারের ঈদ উৎসব।
ছেলেদের পোশাক
ছেলেদের যে কোনো উৎসবেই প্রধান পোশাক পাঞ্জাবি। তরুণরা ঈদে পাঞ্জাবিতেই বেশি সাবলীল। পাঞ্জাবির সঙ্গে সংস্কৃতির পাশাপাশি ধর্মীয় আবহও বিরাজ করে। ঈদের সকালে নামাজ পড়তে যাওয়ার সময় পাঞ্জাবিই চাই। ফ্যাশন হাউসগুলোও ছেলেদের জন্য পাঞ্জাবির বিশেষ সংগ্রহ নিয়ে আসে। পাঞ্জাবি বলতে এখন আর শুধু একরঙা সোজাসাপটা বা স্ট্রেট প্যাটার্নকে বোঝায় না। মেয়েদের পোশাকের মতো ছেলেদের এই ঐতিহ্যবাহী পোশাকের কাট, প্যাটার্ন ও রঙে এসেছে ভিন্নতা। কাপড়েও এসেছে বিচিত্র্যভাব। এ বিষয়ে ফ্যাশন হাউস ‘কে ক্র্যাফট’-এর স্বত্বাধিকারী খালিদ মাহমুদ খান জানান, ঈদের ছেলেদের পোশাকগুলোতে ফেব্রিক হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে কটন, ডিজাইনড কটন, হ্যান্ডলুম কটন, লিনেন, জর্জেট, ক্রেপ জর্জেট, সিল্ক, হাফ সিল্ক, মসলিন, টিস্যু, সাটিন। পাঞ্জাবির নকশায়ও রাখা হয়েছে বিভিন্ন ডিজাইন। বডিজুড়ে কারুকাজ না করে ছোট ছোট নকশা করা হয়েছে। এ ছাড়া ক্যাজুয়াল শার্ট, পলো শার্ট, টি-শার্টও রয়েছে এবার ঈদ ফ্যাশনজুড়ে।
বিকালের সাজ
ঈদের দিনের বিকালের সাজে আনতে পারেন একটুখানি ভিন্নতা। পোশাকের সঙ্গে মিলিয়ে স্নিগ্ধ ও অভিজাত এই দুটির মাঝামাঝি সাজই বিকালের সাজে বেশি মানানসই। বিকালের সাজ নিয়ে রেড বিউটি স্যালনের কর্ণধার আফরোজা পারভীন জানান, ফেস টোনের সঙ্গে মিল রেখে ফাউন্ডেশন, ফেস পাউডার ব্যবহার করতে হবে। সাজে ফাউন্ডেশন ব্যবহার না করতে চাইলে ক্রিম আর ফেস পাউডার দিয়ে বেজ মেকআপ করে নিতে হবে। মুখের দাগ ঢাকতে কনসিলার ব্যবহার করুন। ত্বকের রঙের সঙ্গে মানানসই ভালো ব্র্যান্ডের ফেসপাউডার লাগিয়ে নিন পুরো মুখে। কনট্যুরিং করতে চাইলে পাউডার কনট্যুরিং কিট ব্যবহার করুন। এ সময় ক্রিম কনট্যুরিং ব্যবহার করবেন না। হালকা গোলাপি কিংবা পিচ রঙের ব্লাশন লাগিয়ে নিন। হাইলাইটার ব্যবহার করতে পারেন হালকা। চোখে পাউডার আইশ্যাডোর বাদামি শেড ব্যবহার করতে পারেন। চোখের হালকা কাজল এবং চোখের ওপরে আইলাইনারের রেখা এঁকে দিন। মাসকারার লাগিয়ে নিন। ব্রাউন পেনসিল দিয়ে আইব্রো এঁকে নিন। বিকালের আড্ডায় খুব বেশি গাঢ় করবেন না আইব্রো জোড়া। মাসকারা লাগিয়ে নিন। চোখে পাউডার আইশ্যাডোর বাদামি শেড ব্যবহার করতে পারেন। চোখের হালকা কাজল এবং চোখের ওপরে আইলাইনারের রেখা এঁকে দিন। মাসকারার অবশ্যই দিতে হবে। লিপস্টিকের ক্ষেত্রে পিচ, গাঢ় গোলাপি, লাল, কমলা ইত্যাদি গাঢ় রঙের ব্যবহার করা যেতে পারেন, আবার হালকা রং হলেও মানানসই হবে। উজ্জ্বল রংগুলো চেহারায় এনে দেবে বাড়তি উজ্জ্বলতা। চুলগুলোকে সামনে ফুলিয়ে পনিটেল করে রাখতে পারেন। আবার একপাশের চুলগুলোকে পেঁচিয়ে ক্লিপ দিয়ে আটকে আরেক পাশ খুলেও রাখতে পারেন। চাইলে খোঁপাও করতে পারেন। হালকা মিষ্টি সুবাসের পারফিউম লাগিয়ে নিন। পোশাকের সঙ্গে মিলিয়ে বড় দুল পরে নিন কানে। বিকালের সাজ ন্যাচারাল এবং মিডিয়াম টু গর্জিয়াস হলে বেশি ভালো লাগবে। দেখতেও স্নিগ্ধ লাগে।
রাতের পোশাক
পোশাকও এমন বেছে নিতে হবে, যা আবহাওয়ার সঙ্গে মানানসই ও স্বস্তিদায়ক। পোশাকের নকশা ভারী হলেও কাপড়টা যেন আরামদায়ক হয়, সেদিকে খেয়াল রাখুন। রাতে দাওয়াত থাকবেই। শাড়ি পরলে জামদানি, সিল্ক হতে পারে। অনেকে আবার সব উৎসব-অনুষ্ঠানেই সুতির শাড়িতে স্বস্তিবোধ করেন। তারা সুতির মধ্যে এমন শাড়ি বেছে নেবেন, যেগুলো একটু ভারী কাজের ও আভিজাত্যপূর্ণ। কাফতান, ঢোলা কামিজ ইত্যাদি পছন্দের তালিকায় রেখে পোশাক নির্বাচন করতে হবে। সাটিন, সিল্ক, নরম জর্জেট, ভিসকস কাপড় নির্বাচন করতে পারেন। পোশাকে পুঁতি, পাথর, মুক্তা, সিল্ক সুতার কাজ থাকলে দারুণ লাগবে। সেমি ডার্ক, লেমন, সি গ্রিন, পিচ, সামুদ্রিক নীল রঙের পোশাক পরা যেতে পারে। এগুলো চোখকে আরাম দেবে।
রাতের সাজ
ঈদের রাত মানেই জমকালো সাজ। মূলত পোশাক অনুযায়ী ভারী ও হালকা সাজতে পারেন। তবে আবহাওয়ায় যেহেতু মিশেল থাকবে, তাই সাজের ক্ষেত্রে শুষ্ক বা ম্যাট-জাতীয় পণ্য ব্যবহারই ভালো। রাতের সাজে বেইসটা একটু ভারী হবে। তবে খুব বেশি ভারী নয়। মেকআপ করার আগে ত্বকে বরফ ঘষে নিন। এতে মেকআপ দীর্ঘক্ষণ থাকবে। পরে প্রাইমার ব্যবহার করে নিতে পারেন। তৈলাক্ত ত্বকের জন্য ম্যাট, শুষ্ক ত্বকের জন্য সাধারণ প্রাইমার ব্যবহার করুন। বেজ মেকআপ করে কনসিলার, ফাউন্ডেশন, কন্ট্যুর ও পাউডার দেওয়ার পরই ফিনিশিং স্প্রে লাগিয়ে নিন। সাজটা ভালোভাবে বসবে। এ ছাড়া যারা লিকুইড ফাউন্ডেশন ব্যবহার করবেন তারা প্রথমে কারেক্টর এবং কনসিলার দিয়ে মিশিয়ে নিন। এরপর ত্বকের রঙের সঙ্গে মিলিয়ে লিকুইড ফাউন্ডেশন দিয়ে ব্রাশ কিংবা মেকআপ স্পঞ্জ দিয়ে ভালো করে মিশিয়ে নিন। এরপর কন্ট্যুরিং কিট দিয়ে কন্ট্যুর করে নিন। এরপর এবং চিক-বোন, নাকের ওপর, কপাল, এবং থুতনিতে হাইলাইটর ব্যবহার করুন। চোখের মেকআপের ক্ষেত্রে এবার একটু হালকা মেকআপ চলছে। তবে হালকা রঙের আইশ্যাডোর সঙ্গে কাট অ্যান্ড ক্রিজ, ডাবল উইংস, গ্লিটার লাইনস ব্যবহার করতে পারেন। চোখের কোণে গ্লিটার, শাইনি মেটালিক আইলাইনার ব্যবহার করা যেতে পারে। চোখের কোণে পাথরও লাগাতে পারেন। চোখের কোণ এবং আইব্রো বোনে হাইলাইটার ব্যবহার করতে ভুলবেন না। এবার ঈদে আইব্রোটাকে একটু মোটা করে আঁকার চল চলছে। কালো আইশ্যাডো বা বাদামি পেনসিল দিয়ে ভ্রু সুন্দর করে এঁকে নিন। মোটা করে ভিন্ন রঙের আইলাইনার ব্যবহার করা যায়। আইলাইনার কিংবা জেল কাজল দিয়ে নিখুঁত উইংস একে নিন। চোখের কোলে সাদা কাজল দিয়ে নিচের পাতায় চিকন করে আইলাইনার দিতে পারেন। এতে চোখ জোড়াকে বেশ বড় দেখাবে। আইল্যাশ ও মাসকারা লাগিয়ে নিতে পারেন। ত্বকের রং ও পোশাকের রঙের সঙ্গে মিলিয়ে গাঢ় রঙের ব্লাশন ব্যবহার করতে পারেন। রঙের ক্ষেত্রে বেছে নিতে পারেন গাঢ় গোলাপি, পিচ, ইট রং, কমলা ও বাদামি। লিপস্টিকের ক্ষেত্রে ম্যাটই স্বস্তিদায়ক হবে। লিপস্টিকের রঙের বেলায় লাল, গাঢ় বেগুনি, হট পিংক, কোরাল পিংক, সফট পিংক ব্যবহার করতে পারেন। স্ট্রেইটনার দিয়ে স্ট্রেইট করে ছেড়ে রাখতে পারেন। অথবা কার্লিং মেশিন দিয়ে কার্ল করে নিচের দিকে রোল করে রাখতে পারেন। সামনে হালকা ফুলিয়ে পেছনে খোঁপা করে রাখতে পারেন। চুলের জন্য নানা ধরনের অ্যাক্সেসরিজ পাওয়া যাচ্ছে। পাথর খচিত মেটালের এসব অ্যাক্সেসরিজ খুব সাধারণ চুলের স্টাইলকেই অসাধারণ করে তুলতে পারে। এ ছাড়া কাঁচা ফুল ব্যবহার করেও সতেজ লুক আনতে পারেন ঈদের সাজে।