এক মাস সিয়াম সাধনার পরে আসে মুসলমানদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব পবিত্র ঈদুল ফিতর। উৎসবে শুধু নিজেকে সাজালে তো হবে না, সাজাতে হবে ঘরবাড়িও। ঘরবাড়ির সৌন্দর্যের ওপর মনের স্বস্তি ও শান্তি নির্ভর করে। কাজেই ঈদের পবিত্র দিনটিতে বাড়ি সুন্দর থাকুক, সেই সঙ্গে মনও থাকুক ফুরফুরে। তাই ঈদ সামনে রেখে চলছে নানা প্রস্তুতি। জেনে নেওয়া যাক, ঈদের দিনে কেমন হতে পারে আপনার বাড়ির সাজ।
ঘরের অন্দরমহলটা একদম মনের মতো করে সাজিয়ে নেওয়ার জন্য ভাবছেন—কী করা যায়, কেমন সব জিনিস দিয়ে শোবার ঘরটি ছবির মতো সাজানো যায়।
নিজের ঘরটা নিজেই সাজিয়ে নেওয়ার তৃপ্তি অন্যরকম, অসামান্য। অন্দরসজ্জায় কোন জিনিস নিয়ে কেমনভাবে কাজ করতে পারেন, কেমন করে আরো খানিকটা যত্ন মিশিয়ে দেয়া যায় আপনার ঘরের সাজের আয়োজনে, তা নিয়ে আজকের পরিকল্পনার কথা লিখেছেন তনিমা রহমান
অন্দরমহল হোক মনের মতন
আবহমানকাল থেকেই বাঙালিরা গৃহের সাজসজ্জার জন্য বিখ্যাত। আর যদি কোনো বিশেষ উৎসবের সময় হয় তাহলে তো বলার অপেক্ষা রাখে না সাজসজ্জা কতটা সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তোলা প্রয়োজন। গৃহের সাজসজ্জার মধ্যেও মানুষের রুচি, পছন্দ, জীবনধারা ও আভিজাত্য প্রকাশ পায়। তাই গৃহসজ্জা করার আগে সব দিক মিলিয়ে ভেবেচিন্তে করতে হয়।
দেয়ালের রঙ
গৃহসজ্জার জন্য প্রথমে দেয়ালের রঙের দিকে নজর দিতে হবে। প্রথমেই দৃষ্টিনন্দন করে সাজিয়ে তুলুন আপনার ঘরের প্রতিটি কামরা।
দরজা-জানালার পর্দা, বিছানার চাদর এবং বালিশের কভার ও কুশনে পরিবর্তন এনে গৃহসজ্জায় পরিপূর্ণতা আনতে পারেন। বাড়িতে ফুল দিয়েও সাজাতে পারেন। এভাবে সুন্দর পরিকল্পনা করে সাজিয়ে তোলা যায় গৃহসজ্জা।
ঘর সাজানো একটি শিল্প। গৃহকর্ম-নিপুণার মতো গৃহসজ্জা-নিপুণাও অনেক মানুষ আছেন। তারা পরম যত্নে সাজিয়ে রাখেন নিজের গৃহকোণ। ঘর সাজানোরও কিছু সাধারণ নিয়ম আছে। আপনার ঘরের সাজ কেমন হবে, তা নির্ভর করে আপনার ঘরের চারদেয়ালের রঙ, পর্দার রঙ, বাড়ির আঙিনার পরিধি ও অবস্থানের ওপর।
পর্দা, আসবাব ও বিছানার চাদরের রঙ হালকা রাখুন
প্রকৃতিতে এখন বসন্তকাল। আবহাওয়া আস্তে আস্তে তপ্ত হবে। তাই হালকা রঙ বেছে নেওয়া উচিত। হালকা রঙ মনে প্রশান্তি এনে দেয়, চোখের স্বস্তিও দেয়। সাদা ও শীতল কালার প্যালেটের প্রধান রঙ। সুতরাং এই হালকা রঙের দেয়াল ঘরের পরিসীমাকে আপাতদৃষ্টে প্রশস্ত করে তোলে, তাই ছোট গণ্ডির বাড়িও দেখতে বড় মনে হয়। সাদা আপনার ঘরে শান্তিপূর্ণ পরিবেশের সঙ্গে এনে দিতে পারে অভিজাত আবহও। অনেকে সাদা রঙের পর্দা বা বিছানার চাদর দ্রুত ময়লা হয় ভেবে এড়িয়ে চলেন। সে ক্ষেত্রে সাদা না কিনে বেছে নিতে পারেন অফহোয়াইট, ছাই, হালকা সবজ, গোলাপি, নীলাভ—যেকোনো শীতল কালার প্যালেটের রঙ।
আরেকটি উপায় হলো সাদার ওপর গাঢ় রঙের ছাপা আঁকা পর্দা কেনা। ইদানীং বিভিন্ন ধরনের ও ফুলেল ছাপার নকশা খুব চলছে। সুন্দর রঙ নির্বাচন আপনার ঘর সাজানো আরো আকর্ষণীয় করে তুলতে পারে।
আসবাব
ঈদের সময় ঘরের জন্য চাইলে নতুন আসবাব কেনা যায়, আবার পুরোনো আসবাবকে নতুন রূপ দেওয়া যায়। পেইন্ট করে আসবাবে নতুন ভাব আনা যায়। এ ছাড়া ঘরে নতুনত্ব আনতে আসবাবের জায়গা পরিবর্তনও গুরুত্বপূর্ণ। এতে করে ঘরে নতুন নতুন ভাব আসবে।
পর্দা বদলে নিন
ঘরের পর্দাও এই সুযোগে বদলে ফেলুন। গরমের সময় খুব মোটা কাপড়ের পর্দা ব্যবহার করবেন না। নয়তো বাইরের বাতাস ঘরে ঢুকতে সমস্যা হবে। বাড়ির দেয়ালের রঙ হালকা করলে পর্দা একটু রঙিন রাখার চেষ্টা করুন এবং পাতলা কাপড়ের পর্দা রাখুন।
টেবিল রানার ও ম্যাট
ঈদের দিন খাবার টেবিলের সাজ বিশেষ গুরুত্ব পায়। সুন্দরভাবে খাবার পরিবেশনও একটা শৈল্পিক কাজ। মজার মজার খাবার সাজানো হবে যে টেবিলে, সেটারও সাজসজ্জা হওয়া চাই উৎসব-উপযোগী। টেবিল সাজানোর অনুষঙ্গগুলোর মধ্যে টেবিল রানার ও ম্যাটকেই প্রাধান্য দিতে হবে। টেবিলে একটু উজ্জ্বল ও গাঢ় রঙের ম্যাট ও রানার সুন্দর লাগবে। টেবিল ক্লথ বাছাইয়ের ক্ষেত্রে সাদা রঙের পরিবর্তে উষ্ণ রঙ বেছে নিতে পারেন।
নিরীক্ষাধর্মী অনুষঙ্গ হোক ঘর সাজানোর সঙ্গী
গতানুগতিক ফুলের টব ও শোপিসে ঘর সাজাতে হবে এমন নয়। ঘর সাজান নিরীক্ষাধর্মী অনুষঙ্গে। হতে পারে তা টেবিল ম্যাট, পেইন্টিং, ওয়াল হ্যাংগিং কিংবা ভিন্ন ঘরানায় তৈরি কোনো শোপিস। ফ্রিজ ম্যাগনেটও আকর্ষণীয় এক অনুষঙ্গ। সেটা দিয়েও সাজাতে পারেন ঘর।
পরিবেশবান্ধব ও ‘রিসাইকেল’ উপযোগী পণ্যে সাজান ঘর
আসবাব ও অনুষঙ্গ এমন হওয়া উচিত, যা পরিবেশবান্ধব। প্লাস্টিকের অনুষঙ্গ ব্যবহার না করে পাট ও চটের তৈরি ঝুড়ি, ওয়ালম্যাট, শোপিস ও টেবিলম্যাট ব্যবহার করতে পারেন। এগুলো বেশ টেকসই ও পরিবেশবান্ধব। ঘরের এক কোণে একটি ঝুলন্ত দোলনা হয়ে উঠতে পারে আপনার ‘মি টাইম’ কাটানোর পরম বন্ধু। কাঠ, বেত ও বাঁশে তৈরি দোলনা বেশ কিছুদিন ধরেই দাপিয়ে বেড়াচ্ছে বাড়ির ইন্টেরিয়রে।
তবে ঝুলন্ত দড়ি ও পাট দিয়ে তৈরি আর্টিস্টিক দোলনা রয়েছে পছন্দের শীর্ষে। এগুলো ভাঁজ করা যায় বলে কোনো রকম ঝক্কি ছাড়াই স্থান পরিবর্তন করা সম্ভব, একই সঙ্গে পরিবেশবান্ধব।
বিশেষ নজর দিন তৈজসপত্রে
ঈদের অবিচ্ছেদ্য অংশ অতিথি আপ্যায়ন। অতিথি যদি হন ভোজনরসিক বাঙালি, তবে তো কথাই নেই। প্লেট, গ্লাসসহ যাবতীয় তৈজসপত্রে রাখুন নান্দনিকতার ছোঁয়া। ঈদের আমেজ ধরে রাখতে বেছে নিতে পারেন মোগল ও পারস্যের নকশা করা তৈজসপত্র।
আপনি যদি হন নিজ দেশের পণ্যপ্রিয় বাঙালি, তবে প্রাচীন ঐতিহ্য টেরাকোটার তৈজসপত্রে ভিন্ন আঙ্গিকে অতিথিদের খাবার পরিবেশন করুন। টেরাকোটার তৈজসপত্র বেশ পরিবেশবান্ধব। ঈদ না পেরোতেই আসছে পহেলা বৈশাখ। দুটি উপলক্ষ বিবেচনায় রেখে এর চেয়ে ভালো কিছু হতেই পারে না!
ঘরে সবুজের ছোঁয়া আনার উপযোগী বন্ধু ‘গাছ’
গাছ যে শুধু অক্সিজেন দিয়ে আমাদের জীবন বাঁচায়, শুধ তাই নয়। ইনডোর প্ল্যান্টস আপনার বাড়িকে করে তুলতে পারে সুন্দর। ছোট ছোট টবে গাছ লাগিয়ে ঘরের ভেতর এনে রাখুন। কম পরিচর্যায় এবং স্বল্প আলোতে ভালো থাকে এমন গাছ বেছে নেওয়াই ভালো। পোথোস, এলিফ্যান্ট ইয়ার, পিস লিলি, স্নেইক প্ল্যান্ট—এসব গাছ বেছে নিতে পারেন। এ ছাড়া বনসাই হতে পারে খুব ভালো নির্বাচন। ঘরে সবুজাভ ছোঁয়া থাকলে তা চোখ ও মন দুটোকেই শান্তি দেবে। সেই সঙ্গে ঘরের সৌন্দর্যও বাড়বে।