রমজান আত্মশুদ্ধি, সংযম ও ইবাদতের মাস। এই মাসে প্রত্যেক বিশ্বাসী মানুষ আল্লাহর নৈকট্য লাভের আশায় নিজ নিজ জীবন নতুনভাবে সাজান। তবে বাস্তবতা হলো রমজান সবার জীবনে একইভাবে আসে না। বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে রমজান মানে শুধু রোজা রাখা নয়; এটি ইবাদত, সংসার ও অদৃশ্য শ্রমের এক দীর্ঘ ও নীরব যাত্রা। নারীর রমজান শুরু হয় খুব ভোরে, আবার শেষ হয় গভীর রাতে। এই দীর্ঘ সময়জুড়ে তার যে ত্যাগ ও পরিশ্রম, তা অধিকাংশ সময়ই থেকে যায় আলোচনার আড়ালে।
ভোরের আগে : দিনের প্রথম দায়িত্ব
নারীর রমজান শুরু হয় সাহরির প্রস্তুতির মাধ্যমে। ফজরের আজানের অনেক আগেই তাদের ঘুম ভাঙে। রান্নাঘরে আলো জ্বলে ওঠে, হাঁড়ি-পাতিলের শব্দে ঘর নড়েচড়ে বসে। পরিবারের সবাই ঠিকমতো সাহরি খাচ্ছে কি না, এই চিন্তাই তখন মুখ্য হয়ে ওঠে।
অনেক সময় দেখা যায়, নারী নিজে সবার শেষে খেতে বসেন, কখনোবা তাড়াহুড়োয় ঠিকমতো খাওয়াই হয় না। তবুও কোনো অভিযোগ নেই। কারণ তার কাছে এটি দায়িত্ব, আর দায়িত্ব পালনের মাঝেই তিনি খুঁজে নেন ইবাদতের অনুভব।
ফজরের পর : অপ্রতুল বিশ্রাম
ফজরের নামাজ শেষে অনেক পুরুষ আবার বিশ্রামে ফেরেন বা কর্মস্থলের প্রস্তুতি নেন; কিন্তু নারীর বিশ্রামের ফুরসত সেখানেই শেষ হয়ে যায়। রান্নাঘর গুছানো, বাসন ধোয়া, শিশুদের প্রস্তুত করা—এই কাজগুলো দিয়েই শুরু হয় তার সকাল। এই সময়টায় নারীর ইচ্ছা থাকে কিছুক্ষণ কোরআন তিলাওয়াত বা দোয়া করার; কিন্তু সংসারের বাস্তবতায় সেই সুযোগ খুব সীমিত হয়ে পড়ে।
সকাল থেকে দুপুর : নীরব পরিশ্রম
রোজার সকাল ও দুপুর নারীদের জন্য দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর। তৃষ্ণা বাড়ে, শরীর দুর্বল লাগে, মাথা ভার হয়; তবুও কাজ থামে না। ঘর পরিষ্কার, কাপড় ধোয়া, শিশুদের পড়াশোনার তদারকি—সবকিছুই করতে হয় রোজা রেখেই। এই শ্রম চোখে পড়ে না, কোনো স্বীকৃতিও পায় না। অথচ এই অদৃশ্য শ্রম ছাড়া পরিবারের রমজান নির্বিঘ্নে চলাই সম্ভব নয়।
দুপুরের পর : ইফতারের ভাবনা
দুপুর গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে নারীর মনে ইফতারের চিন্তা ভর করে। কী রান্না হবে, কী উপকরণ আছে, কী আনতে হবে—এই হিসাব চলতে থাকে অবিরাম।
অনেক পরিবারে ইফতার আয়োজনকে সামাজিক মর্যাদা ও যত্নের মানদণ্ড হিসেবে দেখা হয়। ফলে ইফতার যত বৈচিত্র্যপূর্ণ হয়, নারীর পরিশ্রমও তত বাড়ে। অথচ এই পরিশ্রমকে খুব কমই ইবাদতের অংশ হিসেবে গণ্য করা হয়।
বিকাল : ব্যস্ততার চূড়ান্ত সময়
রমজানের বিকাল মানেই নারীদের সবচেয়ে ব্যস্ত সময়। রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাজ করতে হয়। ভাজা, তরকারি, শরবত—সবকিছু সময়মতো প্রস্তুত করা বড় এক চ্যালেঞ্জ। আজানের আগ মুহূর্তে যখন অন্যরা ইবাদতের প্রস্তুতিতে থাকে, তখন নারী শেষ মুহূর্তের কাজ গুছিয়ে নিতে ব্যস্ত থাকেন। নিজের জন্য সময় বের করা যেন এখানে বিলাসিতার মতো হয়ে দাঁড়ায়।
মাগরিব : রোজা ভাঙার বাস্তবতা
আজানের সঙ্গে সঙ্গে রোজা ভাঙার কথা থাকলেও নারীর ক্ষেত্রে তা অনেক সময় বিলম্বিত হয়। আগে পরিবেশন, পরে সবাই ঠিকমতো খাচ্ছে কি না—এই দায়িত্ব শেষ করে তবেই তিনি নিজের দিকে মন দেন। এই ছোট ছোট ত্যাগই নারীর রমজানকে আলাদা করে তোলে। অনেক সময় তিনি চাইলেও সবার সঙ্গে একসঙ্গে বসে রোজা ভাঙতে পারেন না।
সন্ধ্যা ও রাত : দায়িত্বের পর দায়িত্ব
ইফতারের পরও নারীর কাজ শেষ হয় না। বাসন ধোয়া, রান্নাঘর পরিষ্কার, রাতের খাবারের প্রস্তুতি—সব মিলিয়ে আবার এক দফা পরিশ্রম।
এশা ও তারাবির সময় অনেক নারী ক্লান্ত শরীরে দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করেন। কেউ বসে পড়েন, কেউ কাজ শেষ করে দেরিতে নামাজ পড়েন। তবুও তাদের নিয়ত ও চেষ্টা আল্লাহর কাছে মূল্যবান।
গভীর রাত : নীরব প্রার্থনার সময়
সব কাজ শেষ হলে পরিবারের সবাই ঘুমিয়ে পড়লে নারীরা একটু নীরব সময় পান। এই সময়টুকুই হয়তো তাদের একমাত্র নিজের সময়। কেউ চোখের পানি ফেলে দোয়া করেন, কেউ নিজের কষ্ট আল্লাহর কাছে তুলে ধরেন।
এই নিভৃত প্রার্থনা, এই নীরব কান্নাই নারীর রমজানের সবচেয়ে গভীর অধ্যায়।
অদৃশ্য শ্রমের স্বীকৃতি জরুরি
নারীর এই ২৪ ঘণ্টার শ্রম খুব কমই স্বীকৃতি পায়। অথচ সংসারের প্রতিটি ইফতার, প্রতিটি স্বস্তির পেছনে রয়েছে তার ত্যাগ। রমজানে নারীর কাজ কমার বদলে অনেক সময় আরো বেড়ে যায়।
এই বাস্তবতা বদলাতে পরিবারের সবাইকে সচেতন হতে হবে। কাজ ভাগ করে নেওয়া, ইফতারে অপ্রয়োজনীয় আয়োজন কমানো, নারীর ইবাদতের সময় নিশ্চিত করা—এসবই হতে পারে বাস্তব ও মানবিক সমাধান।
পরিশেষে বলতে চাই, নারীর রমজান মানে শুধু রোজা নয়; এটি ধৈর্য, দায়িত্ব ও অদৃশ্য শ্রমের এক দীর্ঘ সাধনা। এই সাধনার মূল্য শুধু আল্লাহর কাছেই নয়, পরিবার ও সমাজের কাছেও স্বীকৃত হওয়া উচিত। রমজান হোক এমন এক মাস, যেখানে নারীর ইবাদত ও শ্রম শুধু দৃষ্টিগোচর না হয়ে বরং পরিবার ও সমাজের কাছে সম্মানের আসনে অধিষ্ঠিত হোক।
লেখক : প্রাবন্ধিক ও গবেষক
প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান, জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি