জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান শুধু একটি রাজনৈতিক আন্দোলন ছিল না, ছিল একটি মানবিক জাগরণ, যেখানে নারীদের ভূমিকা অনন্য, অনস্বীকার্য ও ইতিহাস গঠনের উপকরণে পরিণত হয়েছিল। জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি নারী এই আন্দোলনের অংশ হয়ে প্রমাণ করে দিয়েছেন, নারী ছাড়া কোনো সত্যিকারের পরিবর্তন সম্ভব নয়।
রাজপথে যেমন ছিল নারীদের পদচারণা, তেমনি আন্দোলনের প্রতিটি স্তরে তাদের ছিল সাহসী ও কার্যকর উপস্থিতি। কোনো মা তার সন্তানের পাশে থেকে রাজপথে থাকতেন, কেউ খাবার রান্না করে দিতেন, আবার কেউ ঘর থেকে পালিয়ে, সমাজ-পরিবারের চোখ ফাঁকি দিয়ে কোচিংয়ের অজুহাতে আন্দোলনে অংশ নিতেন। অনেকে চিকিৎসা, আশ্রয় বা অর্থ দিয়ে আন্দোলনের ভিতকে শক্ত করেছেন।
এমন অসংখ্য সাহসী নারী এই সময় নিজেদের গণ্ডি ভেঙে নামেন রাজপথে। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীরা তো বটেই, এমনকি স্কুলের ছাত্রীরাও লাঠিচার্জ ও টিয়ার শেলের ভয় উপেক্ষা করে মিছিলে অংশ নেন। ১৪ জুলাই রাতে যখন আন্দোলনের ওপর দমন-পীড়ন শুরু হয়, তখন হল থেকে প্রথম বেরিয়ে এসেছিল মেয়েরাই। শুধু অংশগ্রহণ নয়, গণমাধ্যমেও নারী সাংবাদিকদের ভূমিকা ছিল অগ্রণী। শত বাধা ও হুমকি উপেক্ষা করে তারা তুলে ধরেছেন আন্দোলনের প্রকৃত চিত্র। সাংবাদিক শামীমা সুলতানা লাবু ছিলেন এমনই এক সাহসী কণ্ঠ। পুলিশ ও ছাত্রলীগ যখন পুরুষ সাংবাদিকদের বাধা দিচ্ছিল, তখন নারী সাংবাদিকেরা সত্য প্রচারে সামনে এগিয়ে আসেন।
একইভাবে শহর থেকে গ্রাম, ধনী থেকে দরিদ্র, মুসলিম, হিন্দু, খ্রিষ্টান কিংবা আদিবাসী—সব পরিচয়ের নারীরাই এই অভ্যুত্থানে রেখেছেন অমূল্য অবদান। তাদের ত্যাগ ও সাহসিকতা ছাড়া দীর্ঘ ১৬ বছরের স্বৈরশাসনের অবসান কল্পনাও করা যেত না। এই গণঅভ্যুত্থানে জীবন দিয়েছেন অনেক নারী। শহীদ রিয়া গোপ, নাইমা সুলতানা, লিজা আক্তার, মায়া ইসলাম, মেহেরুন নেসা, নাজমা বেগম, তানহা, সুমাইয়া আক্তার, নাফিসা হোসেন মারওয়া—তারা আজ আমাদের ইতিহাসের অমর নাম।
নাইমা সুলতানার মা আইনুন নাহার কাঁদতে কাঁদতে বলছিলেন, ‘মেয়েকে বলেছিলাম না যেতে। ঝগড়া করেছিল আমার সঙ্গে। কিন্তু তার আত্মত্যাগ বৃথা যাবে না।’
এদিকে আন্দোলনে আহত ওমর গণি এমইএস কলেজের শিক্ষার্থী নুসরাত জাহান বলছিলেন, ‘নারীদের গল্পগুলো বলতেই হবে। আমাদের কোনো ক্ষমতা বা অর্থের লোভ ছিল না, তারপরও আমরা দেশের জন্য রাজপথে নেমেছিলাম।’
বরিশালের কবি সাবরিনা শশী ঢাকায় আটকে পড়ার পর নিজেই নেমে পড়েন আন্দোলনে। প্রতিদিন একেক জায়গায় গিয়ে অংশ নেন প্রতিবাদে। আন্দোলনের প্রথম দিনেই ‘ধানমন্ডি ২৭’-এ সংঘর্ষে আহত হন। তবু থেমে যাননি। নারী মানেই শুধু চোখের জল নয়, নারী মানেই সাহস, প্রতিবাদ আর ত্যাগ।
এই আন্দোলন আরেকবার প্রমাণ করেছে, যেকোনো সামাজিক পরিবর্তনের মধ্যমণি নারী—তারা কেবল পাশে থাকা মানুষ নন, তারাই তো নেতৃত্বের প্রতীক।
আজকের এই গণঅভ্যুত্থান শুধু রাজনীতি নয়, এক নারীর জাগরণ, এক জাতির সম্মিলিত পুনর্জন্ম। ইতিহাসে লেখা থাকবে—‘নারী না থাকলে অভ্যুত্থান অসম্পূর্ণ থাকত।’