ফাহমিদা নাজনীন পরিবেশ রক্ষা আন্দোলন ও মাঠপর্যায়ের সংগ্রামের এক পরিচিত মুখ। বর্তমানে তিনি পরিবেশবাদী সংগঠন ‘গ্রিন ভয়েস’-এর কেন্দ্রীয় কমিটির সহসমন্বয়ক এবং রাজশাহী বিভাগীয় সমন্বয়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ২০১৬ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত এক দশক ধরে তিনি একজন নিবেদিতপ্রাণ স্বেচ্ছাসেবক ও সংগঠক হিসেবে সবুজ বাংলাদেশ গড়ার আন্দোলনে যুক্ত রয়েছেন। তেঁতুলতলা মাঠ রক্ষা আন্দোলন থেকে শুরু করে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের গাছ সংরক্ষণের সংগ্রাম—বিভিন্ন পরিবেশ আন্দোলনে রয়েছে তার অগ্রণী ভূমিকা।
পরিবেশ নিয়ে কাজ করার আগ্রহটা কীভাবে তৈরি হলো
ছোটবেলা থেকেই গাছপালা, নদী ও গ্রামীণ প্রকৃতির প্রতি আমার সহজাত টান ছিল। বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নির্বিচারে গাছ কাটা, নদীদূষণ এবং জীববৈচিত্র্যের ধ্বংসযজ্ঞ দেখে আমি গভীরভাবে উদ্বিগ্ন ও ভাবিত হই। ২০১৬ সালে ‘গ্রিন ভয়েস’-এর সঙ্গে যুক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে আমার প্রাতিষ্ঠানিক পথচলা শুরু হয়। আমি যখন কাজ শুরু করি, তখন পরিবেশ বিষয়ে শিক্ষার্থী ও তরুণদের মধ্যে সচেতনতা তুলনামূলকভাবে অনেক কম ছিল। গত এক দশকে এই সচেতনতা কিছুটা বেড়েছে। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, জলবায়ু পরিবর্তন, প্লাস্টিক দূষণ, বায়ুদূষণ এবং অবৈধ বালু উত্তোলনের মতো পরিবেশগত সংকটগুলো এখন আরো প্রকট ও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।
একা কাজ করা আর সংগঠনের হয়ে নেতৃত্ব দেওয়ার অভিজ্ঞতা কেমন
একা কাজ করলে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় এবং নিজের পরিকল্পনা অনুযায়ী এগিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়। তবে এর পরিধি তুলনামূলকভাবে সীমিত থাকে। জনবল ও অর্থায়নের অভাবে বৃহৎ পরিসরে কিংবা নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে প্রভাব বিস্তার করা কঠিন হয়ে পড়ে। অন্যদিকে, সংগঠনের হয়ে কাজ করলে দলগত শক্তি ও ঐক্যের সুবিধা পাওয়া যায়, যার মাধ্যমে মাঠপর্যায়ে বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তোলা সম্ভব। তবে সংগঠনে কাজ করার ক্ষেত্রে ভিন্নমতকে সম্মান জানিয়ে সবার সঙ্গে সমন্বয় রেখে এগিয়ে যাওয়ার চ্যালেঞ্জও মোকাবিলা করতে হয়।
এই দীর্ঘ পথচলায় এমন কোনো সাফল্যের গল্প আছে কি, যা সবচেয়ে বেশি আনন্দ দেয়
আমাদের অন্যতম বড় অর্জন হলো কয়েকটি ঐতিহাসিক মাঠ ও প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষা করতে সক্ষম হওয়া। গ্রিন ভয়েসের আন্দোলনের মাধ্যমে আমরা রাজধানীর তেঁতুলতলা মাঠ, গোলাপবাগ মাঠ এবং শহীদ আনোয়ার উদ্যানের গাছ সংরক্ষণে সফল হয়েছি। ২০২১ সালের দিকে যখন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ঐতিহ্যবাহী গাছগুলো কাটার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, তখন আমরা আন্দোলনের মাধ্যমে সেগুলো রক্ষা করতে সক্ষম হই।
এছাড়া ‘প্লাস্টিকের বোতলের বিনিময়ে গাছ’ কর্মসূচি এবং প্রতিবছর জুন-জুলাই মাসে দেশের ১৬০টিরও বেশি ইউনিটে ব্যাপক বৃক্ষরোপণ ও নিয়মিত পরিচর্যা নিশ্চিত করাও আমাদের উল্লেখযোগ্য সাফল্যের মধ্যে অন্যতম।
তবে নদী রক্ষা আন্দোলনের ক্ষেত্রে আমরা আশানুরূপ সাফল্য অর্জন করতে পারিনি। যতবারই নদী রক্ষার দাবি নিয়ে মাঠে নেমেছি, ততবারই যেন নদী দখল ও দূষণের মাত্রা আরো বেড়েছে। বর্তমানে আমাদের দীর্ঘদিনের অন্যতম দাবি হলো ঢাকার নদীগুলো চক্রাকার নৌপথের মাধ্যমে সংযুক্ত করা। এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে সরকারের দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
একজন নারী হিসেবে মাঠপর্যায়ের কঠিন পরিস্থিতি ও সামাজিক বাধাগুলো কীভাবে সামলান
পরিবেশ রক্ষার আন্দোলনে মাঠপর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে নানা ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়। একজন নারী হিসেবে কাজের গুরুত্ব তুলে ধরা, সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির বাধা অতিক্রম করা এবং বিশেষ করে মাঠপর্যায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা—এসব ক্ষেত্রে আমাকে বাড়তি পরিশ্রম করতে হয়েছে। তবে আমি বিশ্বাস করি, ধৈর্য, সঠিক জ্ঞান এবং ইতিবাচক মনোভাবই একজন কর্মীর সবচেয়ে বড় শক্তি। আমার এই দীর্ঘ পথচলার অন্যতম প্রধান অনুপ্রেরণা গ্রিন ভয়েসের প্রতিষ্ঠাতা আলমগীর কবির। তিনি দেশের হাজারো তরুণের মধ্যে পরিবেশ রক্ষার চেতনা ছড়িয়ে দিয়েছেন। আমি প্রতিনিয়ত তার কাছ থেকে শিখছি। যখনই কোনো বড় চ্যালেঞ্জ বা বাধার মুখোমুখি হই, তার দিকনির্দেশনা ও পরামর্শ থেকেই সমাধানের পথ খুঁজে পাই।
আমাদের পরিবেশ আইনের ঘাটতি কোথায় এবং নতুনদের জন্য আপনার কী উপদেশ থাকবে
আমাদের দেশে পরিবেশ সুরক্ষায় বেশ কিছু ভালো আইন ও নীতিমালা রয়েছে। তবে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো এসব আইন ও নীতিমালার কার্যকর বাস্তবায়নের অভাব। নদী দখল, বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ এবং অবৈধভাবে গাছ কাটা বন্ধে আইনের কঠোর প্রয়োগ ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে পরিবেশ পর্যবেক্ষণ ও তদারকি ব্যবস্থা আরো শক্তিশালী করতে হবে।
তরুণদের প্রতি আমার আহ্বান, শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সচেতনতা তৈরির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে সরাসরি মাঠপর্যায়ে কাজ করতে হবে। যারা নতুনভাবে পরিবেশ আন্দোলনে যুক্ত হতে চান, তাদের আগে বাস্তব সমস্যাগুলো গভীরভাবে বোঝার চেষ্টা করা উচিত। শুধু প্রতিবাদ করলেই হবে না, সমস্যার কার্যকর সমাধান খুঁজে বের করার দিকেও মনোযোগ দিতে হবে। কারণ প্রকৃতিকে রক্ষা করা মানে আমাদের নিজেদের ভবিষ্যৎকে রক্ষা করা।
সাক্ষাৎকার নিয়েছেন
শিক্ষার্থী, স্নাতক, হাবিবুল্লাহ বাহার কলেজ, শান্তিনগর, ঢাকা