স্বাধীনতার এত বছরেও এ জাতির পশ্চাৎপদতার কারণ কী, কী কারণে রাষ্ট্রের রক্ষক ভক্ষকে পরিণত হয়, কোন সুতোর টানে শাসকশক্তি বেপরোয়া হয়ে ওঠে, কাদের ইন্ধনে সমাজে দিন দিন বিভেদ বাড়ে, কাদের কুচক্রে জনমত আজ বিপন্ন ইত্যাদি প্রসঙ্গ গভীর দৃষ্টিকোণ থেকে আলোচনার দাবি রাখে।
‘ক্ষমতা যার, রাষ্ট্রও তার’, ‘ক্ষমতা হারানো মানে সর্বস্ব হারানো’, ‘হাকিম নড়ে তো হুকুমও নড়ে’, যেসব প্রভুদের দয়ায় ক্ষমতার মসনদ, তাদের স্বার্থ রক্ষার বাধ্যবাধকতা—এসব ধ্বংসাত্মক ও আগ্রাসী মনোভাব থেকেই রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থায় স্বেচ্ছাচারিতা জন্ম নেয়। রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরে সত্যিকার গণতন্ত্রের চর্চা না থাকা এবং প্রাজ্ঞ, পরীক্ষিত ও মেধাবান নেতৃত্বের প্রভাব কমে যাওয়াও ফ্যাসিজমের অন্যতম প্রভাবক/নিয়ামক। চিন্তক ও গবেষক ড. সলিমুল্লাহ্ খানের মতে, শেখ মুজিবের শাসনামলেই বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদের গোড়াপত্তন হয়।
তবে আগের ইতিহাস বাদ দিলেও ২০১৩ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি আমার দেশ-এর সেই দুঃসাহসিক ও চাঞ্চল্যকর লিড নিউজের সুবাদে জনগণ নতুন এক ফ্যাসিবাদের পদধ্বনি শুনতে পায়। কার্যত, তৎকালীন ক্ষমতাসীন গোষ্ঠী তারও আগে, অর্থাৎ ২০০৯ সালে সরকার গঠনের পর থেকেই নব্য বাকশালী কায়দায় কর্তৃত্ববাদী শাসন প্রতিষ্ঠার নীলনকশা আঁকতে থাকে। ক্ষমতা গ্রহণের দুই মাস পূর্ণ হয়নি তখনো। পিলখানার বিডিআর সদর দপ্তরে দরবার চলাকালে কথিত বিদ্রোহের নামে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড চলে। ৫৭ দেশপ্রেমিক, চৌকস ও মেধাবী সেনা অফিসারসহ অসংখ্য বেসামরিক ব্যক্তিত্ব হত্যার গভীর ষড়যন্ত্র সফল(!) করা হয়, যা সরকারি তদন্তেও প্রকাশ। এ যেন আপন ভাইয়ের মধ্যে খুনোখুনি!
আসলে শেখ হাসিনার কর্তৃত্ববাদের বীজ বপন হয় ২০০৮ সালে। সেনাসমর্থিত অনির্বাচিত ১/১১ সরকারের সময়। আওয়ামী লীগের কথিত ‘আন্দোলনের ফসল’ সেই বিতর্কিত সরকারের কর্তাব্যক্তিদের সেইফ এক্সিটের জন্য ভারত সরকার প্রত্যক্ষ ওকালতি করে। ভারতের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী (পরে রাষ্ট্রপতি) প্রণব মুখার্জির ধারাবাহিক আত্মজীবনী গ্রন্থের তৃতীয় খণ্ড ‘কোয়ালিশন ইয়ারস (১৯৯৬-১২)’-এর ‘ম্যানেজিং দ্য এক্সটারনাল এনভায়রনমেন্ট’ অধ্যায়ে (১১৩-১১৫ পৃষ্ঠায়) এ বিষয়ে ইঙ্গিত মেলে। ওই বছর ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে ভারত সফরকালে তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল মইন ইউ আহমেদকে এ বিষয়ে বিশেষভাবে আশ্বস্ত করা হয়। বিনিময়ে ১৪-দলীয় মহাজোটের একতরফা বিজয়ের বন্দোবস্ত চূড়ান্ত হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্য দিয়ে যে ক্ষমতাকাঠামো তৈরি, তা জাতীয় অভিশাপ ডেকে আনে। সাধারণত ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থায় জনপ্রশাসন, বিচার বিভাগ, গোয়েন্দা বিভাগ, নিরাপত্তা বাহিনী, আইনশৃঙ্খলা প্রয়োগকারী সংস্থা ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে ক্রমান্বয়ে চরম অন্ধ দলীয় আনুগত্যের শিকলে বাঁধা হয়। অতঃপর ক্ষমতার আধিপত্য বিস্তারের হাতিয়ার হিসেবে এসবের যথেচ্ছ ব্যবহারের প্রবণতা দেখা যায়।
তবে এর পাশাপাশি এ দেশে ফ্যাসিবাদ বিকাশে মোটাদাগে গণমাধ্যমের ওপর নগ্ন ও অনৈতিক নিয়ন্ত্রণকেই হাসিনাগং অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হিসেবে বেছে নেয়। ২০০৯-২৪ সময়কালে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক বেসরকারি টিভি চ্যানেল ও সংবাদপত্র অনুমোদন দেওয়া হয়। আপাতদৃষ্টিতে মনে হয়, তথ্যের অবাধ প্রবাহে বিপ্লব হয়েছিল। এখানেই শেখ হাসিনার অতি চালাকি! প্রচারযন্ত্রের সংখ্যা বাড়াতে হবে। কারণ, গণমাধ্যম জাতির দর্পণ। সমাজের প্রতিচ্ছবি এতে প্রতিফলিত হয়।
তাই দেশের শাসনভার পরিচালনার মোক্ষম সুযোগে নিজের হীন স্বার্থসিদ্ধির কুমতলবে এ মাধ্যমকে কাজে লাগান মুজিবকন্যা। আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে একপক্ষীয় বয়ান বুনতে থাকেন। যাতে ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করার পরিবেশ তৈরি হয় এবং ধীরে ধীরে আওয়ামীতন্ত্রের মাধ্যমে রাষ্ট্রের ‘অঘটন ঘটন পটীয়সী’(!) শক্তিরূপে আবির্ভূত হওয়া যায়।
জানুয়ারি-২০২১-এ প্রকাশিত সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের (সিজিএস) ‘হু ওনস দ্য মিডিয়া ইন বাংলাদেশ’বিষয়ক এক গবেষণা সমীক্ষায় উঠে এসেছে, রাজনৈতিক/পারিবারিক সম্পর্ক, ব্যবসায়িক স্বার্থ ও দলীয় আনুগত্য বিবেচনায় বেশিরভাগ মিডিয়ার মালিকানা ঠিক করা হয়।
রাষ্ট্রের সার্বিক কর্মনীতির চিত্র যাদের সূত্রে জনগণ অবগত হবে, তাদের মজ্জা যখন দানবীয় সরকারের কবজায় বন্দি হয়ে যায়, তখনই ফ্যাসিবাদের পথ সুগম হয়। ‘সুবিধাবাদ জিন্দাবাদ’ ধারার মিডিয়াগুলো তখন গদিনশীনদের চ্যালেঞ্জ বা প্রশ্ন করার পরিবর্তে তাদের পূর্ণ আজ্ঞাবহ হয়ে যায়। সরকার বাহাদুরের প্রেসক্রিপশনে জাতিকে সার্ভ করাকেই তারা সম্পাদকীয় নীতির অলিখিত মূলমন্ত্র হিসেবে গ্রহণ করে। আর তখনই রাষ্ট্র ঘোর অমানিশার দিকে পা বাড়ায়। আরোপিত সেন্সরশিপ ও সেলফ সেন্সরশিপের জাঁতাকলে সত্য পলেস্তরায় ঢাকা পড়ে যায়। অসত্য ও আংশিক সত্য তথ্য ছড়ানোর অসুস্থ প্রতিযোগিতা সমানে চলতে থাকে। ক্ষমতার লেন্সে সবকিছুকে জাস্টিফাই করার অপচেষ্টা পরিলক্ষিত হয়।
এমতাবস্থায় বিরোধী দল-মতের আন্দোলন মানে নাশকতার আলামত। সরকারের সমালোচনা মানে রাষ্ট্রের শত্রু। ন্যায়বিচারের প্রশ্নে আওয়াজ তোলা মানে আদালত অবমাননার জুজুর ভয়। প্রতিবেশীর সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্কের দাবির বিপরীতে হুমকির থাবা। আয়নাঘর ও গুম সংস্কৃতি তো ক্ষমতার এক ভয়ংকর রূপ। আর মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ-বিপক্ষ শক্তির নামে কৃত্রিম বিভাজন তো ছিলই। সর্বোপরি নির্বাচনব্যবস্থা নিয়ে চলে ইতিহাসের নিকৃষ্টতম প্রহসন।
এভাবে চিহ্নিত মিডিয়ার মাধ্যমে নানা কায়দায় উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও ধারাবাহিক প্রচারণা চালিয়ে ভীতিকর অবস্থা সৃষ্টি করা হয়। ২০১৩ সালে মতিঝিলে শাপলা গণহত্যার আগে ও পরে কয়েকটি চ্যানেল ও পত্রিকা বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনা এ ক্ষেত্রে মারাত্মক প্রশ্নের সৃষ্টি করে।
সম্প্রতি প্রখ্যাত সম্পাদক ড. মাহমুদুর রহমানের সাপ্তাহিক মন্তব্য প্রতিবেদনেও গণমাধ্যমের একাংশের প্রতি উক্ত ১/১১ সরকারের চাপ ও বৈরী আচরণের বিষয় স্থান পেয়েছে। তবে সামগ্রিকভাবে ভয়কে জয় করে, রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে কিছু মিডিয়া সত্য প্রকাশের ঝুঁকি নিতে অবশ্য কার্পণ্য করেনি। যা শেষমেশ ফ্যাসিবাদী ডামি সরকারের পতনে কম গুরুত্বপূর্ণ ছিল না।