২০০৬ সাল। আমি তখন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল। খুব ইচ্ছে ছিল প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সঙ্গে একবার বিদেশ সফর করার। চেষ্টা করছিলাম বহুদিন ধরে। কিন্তু কোনোভাবে পৌঁছাতে পারছিলাম না কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে। দুটো কারণ- প্রথমত, ম্যাডাম সফরসঙ্গী হিসেবে ‘বিশিষ্ট নাগরিক’ ক্যাটাগরিতে নিতেন মাত্র দুজনকে। তার মধ্যে আবার একজন থাকতেন জেলা প্রশাসক (ডিসি)। রাজনৈতিক বিবেচনায় থাকতেন মাত্র একজন। দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক বিবেচনায় অধিকাংশ সফরে ম্যাডামের সফরসঙ্গী হতেন বিএনপির রাজনীতিতে প্রভাবশালী বিশেষ একজন ব্যক্তি।
আল্লাহর রহমত, অকস্মাৎ এসে গেল একটা সুযোগ। হাইকোর্ট বিভাগের দুই দলবাজ বিচারপতি তাদের এক রায়ে বাতিল করলেন সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী। রাতের মধ্যেই তৎকালীন অ্যাটর্নি জেনারেল এ জে মোহাম্মদ আলীকে আপিল দায়ের ও শুনানি করার নির্দেশ দিলেন ম্যাডাম। আইনজীবীদের পাঁচ-ছয়জনের একটা টিম নিয়ে সব জায়গায় থাকার জন্য প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরীর মাধ্যমে আমাকেও দিলেন বিশেষ নির্দেশ। সফলতার সঙ্গে আমি সম্পন্ন করেছিলাম সেই কাজ। সেদিন রাত দেড়টার সময় আমাদের ধন্যবাদ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে বাসায় যান খালেদা জিয়া। ম্যাডামের খুব কাছাকাছি যাওয়ার সুযোগ পেলাম এ ঘটনার মধ্য দিয়ে। পরবর্তী বিদেশ সফরেই আমাকে সফরসঙ্গী করার নির্দেশ দিলেন তিনি।
পরবর্তী সফর ছিল দুবাই এবং সৌদি আরব। আমাকে অন্তর্ভুক্ত করা হলো সফরসঙ্গী হিসেবে। কিন্তু দুর্ভাগ্য, হঠাৎ করে দেশের ৬৩ জেলার আদালত প্রাঙ্গণে একযোগে ঘটল বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা। বাতিল হয়ে গেল প্রধানমন্ত্রীর দুবাই ও সৌদি আরব সফর। তারপরের গন্তব্য পাকিস্তান। ৬ ফেব্রুয়ারি, ২০০৬ তারিখে প্রধানমন্ত্রীর একান্ত সচিব লেফটেন্যান্ট কমান্ডার (Aet) সাইফুল ইসলাম ডিউক আমাকে ফোন করে জানালেন পাকিস্তান সফরে যাওয়ার কথা। বিকালেই আমি ডিউক ভাইয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করলাম। তাকে অনুরোধ করলাম, এটা পরিবর্তন করে কোনো ইউরোপীয় দেশে দেওয়া যায় কি না। শ্রদ্ধেয় ডিউক ভাই বললেন, ‘ম্যাডামের অনুমতি নিয়েই চূড়ান্ত করতে হয় সফরসঙ্গীদের তালিকা। আর পরিবর্তন করতে হলেও নিতে হবে ম্যাডামের অনুমতি। এতে কিন্তু তার বিরক্ত হওয়ার আশঙ্কা আছে । তাছাড়া সরকারের মেয়াদ শেষ হয়ে আসছে। বিগত সফরের মতো সম্ভাবনা আছে কোনো কোনো বিদেশ সফর বাতিল হয়ে যাওয়ার।’ ডিউক ভাইয়ের যুক্তি মেনে নিলাম আমি।
১২ ফেব্রুয়ারি, ২০০৬ দুপুর একটায় জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ইসলামাবাদের উদ্দেশে রওনা হলাম ‘ভিভিআইপি ফ্লাইট নম্বর বিজি-০৩৫’ যোগে। বিকাল ৫-৩০ মিনিটে পৌঁছালাম ইসলামাবাদের চাকলালা বিমানবন্দরে। বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে সাদর অভ্যর্থনা জানালেন পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শওকত আজিজ। ‘মিনিস্টার ইন ওয়েটিং’ ছিলেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর ‘নারী উন্নয়ন ও ফেডারেল মিনিস্ট্রি’-সংক্রান্ত মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা নিলুফার বখতিয়ার।
ঘাড় চাপড়িয়ে প্রেসিডেন্ট পারভেজ মোশারফ বললেন Very young Deputy Attorney General of Bangladesh-
বিমানবন্দর থেকে সরাসরি চলে গেলাম পাঁচ তারকা হোটেল ‘ইসলামাবাদ সেরিনা’তে। বিশাল আকৃতির পাহাড়ের ওপরে নৈসর্গিক পরিবেশে অবস্থিত ‘ইসলামাবাদ সেরিনা’ হোটেল। হোটেলের আশপাশে মনোরম ফুলের বাগান ও সুইমিংপুল সবার চোখ ধাঁধিয়ে দেয়। আর তাদের আতিথেয়তার তো কোনো তুলনাই হয় না।
প্রথম দিন রাতে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে ছিল অল্প কিছু দ্বিপক্ষীয় কর্মসূচি। দ্বিতীয় দিন একের পর এক সরকারি কর্মসূচিতে কাটল সারাদিন। সন্ধ্যায় নৈশভোজের আয়োজন করেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শওকত আজিজ। পাকিস্তানের মন্ত্রিপরিষদের সদস্য এবং সুপ্রিম কোর্টের বিচারকরাসহ গণ্যমান্য ব্যক্তিরা অংশগ্রহণ করেন নৈশভোজে। খাবারের মেন্যু ও পরিবেশনে সর্বত্র ছিল আভিজাত্যের ছাপ। সবশেষে ছিল মনোরম সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। মন্ত্রমুগ্ধের মতো সমগ্র সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উপভোগ করে বুঝলাম, শালীনতা বজায় রেখেও কত চমৎকার সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করা যায়।
তৃতীয় দিনেও ছিল একের পর এক রাষ্ট্রীয় কর্মসূচি। দুপুরে মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন করলেন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল পারভেজ মোশারফ। তার দুই পাশে ছিলেন দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী। ম্যাডাম এক এক করে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছিলেন তার সফরসঙ্গীদের। আমি যখন প্রেসিডেন্ট পারভেজ মোশাররফের সঙ্গে করমর্দন করছিলাম, তখন ঘটলো এক অভূতপূর্ব ঘটনা। জেনারেল পারভেজ মোশাররফ করমর্দন করছিলেন ডান হাতে। অন্য হাতে আমার ঘাড় চাপড়িয়ে বললেন, Very young Deputy Attorney General of Bangladesh sh (বাংলাদেশের খুব কম বয়স্ক ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল)। সত্যিই ভোলার মতো নয় ঐতিহাসিক সেই মুহূর্ত। উল্লেখ্য, পাকিস্তানের আইনজীবীরা সাধারণত ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল হয় ৫৫-৬০ বছর বয়সে। আর আমার বয়স তখন মাত্র ৪০ বছর।
আমার পাল্টা প্রশ্নে কিছুটা লজ্জিত হলেন পাকিস্তানের প্রধান বিচারপতি-
প্রেসিডেন্টের নৈশভোজে ডাইনিং টেবিলে পাশাপাশি বসেছিলাম পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধান বিচারপতি এবং আমি। ভদ্রলোক ছিলেন খুব মন খোলা মানুষ, বহু বিষয়ে কথা হলো তার সঙ্গে। একপর্যায়ে আমাকে জিজ্ঞাসা করলেনÑ
* Can you talk in Urdu (তুমি কি উর্দুতে কথা বলতে পারো)?
** আমি বললাম : No I can’t talk in Urdu (না, আমি উর্দুতে কথা বলতে পারি না)।
* তিনি বললেন : Why not, many people of Bangladesh can talk in Urdu (কেন নয়, কেন নয়, বাংলাদেশের বহু মানুষ উর্দুতে কথা বলতে পারে)!
** আমি বললাম : No, I can’t (না, আমি পারি না)।
এ পর্যায়ে কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থাকলাম আমি। তারপর পাল্টা প্রশ্ন করলাম :
** Can you talk in Bangla (আপনি কি বাংলায় কথা বলতে পারেন)?
* প্রধান বিচারপতি উত্তর দিলেন :
No, I can’t talk in Bangla (না, আমি বাংলায় কথা বলতে পারি না)।
আমি বললাম :
** Why not, many people of Pakistan can talk in Bangla (কেন নয়, পাকিস্তানের বহু মানুষ বাংলায় কথা বলতে পারে)।
Till 1971 it was undivided Pakistan.There were 2 (two) main languages, Urdu and Bangla. I was only 5 (five) years old in 1971 but then you were quite matured. So you could have talked in Bangla (১৯৭১ সাল পর্যন্ত ছিল অবিভক্ত পাকিস্তান। সেখানে দুটো প্রধান ভাষা ছিল, উর্দু ও বাংলা। ১৯৭১ সালে আমার বয়স ছিল মাত্র ৫ (পাঁচ) বছর। কিন্তু আপনার বয়স তখন যথেষ্ট ছিল। সুতরাং আপনার বাংলায় কথা বলতে পারাটা স্বাভাবিক ছিল)।
আমার কথা শুনে তিনি খানিকটা লজ্জিতই হলেন, মুখটাও হয়ে গেল কিছুটা কালো। দ্রুত আমি প্রসঙ্গ পরিবর্তন করে তাকে স্বাভাবিক করে নিতে চেষ্টা করলাম।
পাকিস্তানের ভূস্বর্গ ‘মারি’র সৌন্দর্যে বিমোহিত সবাই-
প্রকৃতির ভূস্বর্গ কাশ্মীর। তবে কাশ্মীর আবার দুই ভাগে বিভক্ত। ভারতের মধ্যে অবস্থিত জম্মু-কাশ্মীর। আর পাকিস্তানে আজাদ-কাশ্মীর। পর্যটকদের জন্য খুবই বিপজ্জনক জম্মু-কাশ্মীর। কিছুদিন আগেই জম্মু-কাশ্মীরে পর্যটক হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে হয়ে গেল পাক-ভারত যুদ্ধ। অন্যদিকে মনোরম দৃশ্য, প্রচণ্ড ঠান্ডা আবহাওয়া এবং ঐতিহাসিক গুরুত্বের কারণে আজাদ-কাশ্মীর পর্যটকদের কাছে সমাদৃত। আজাদ-কাশ্মীরের মধ্যেই অবস্থিত পাকিস্তানের অনিন্দ্য সুন্দর পর্যটন কেন্দ্র ‘মারি’। ভৌগোলিক অবস্থান পাঞ্জাব প্রদেশের রাওয়ালপিন্ডি জেলার মধ্যে।
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সফরসূচির মধ্যে ছিল না ‘মারি’ ভ্রমণ। কিন্তু ‘মারি’তে একবার বেড়াতে যাওয়ার প্রচণ্ড ইচ্ছে ছিল আমাদের চারজনের। দ্বিতীয় দিনের সরকারি কর্মসূচি শেষে মধ্যরাতে আমরা চারজন (প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্টের কমান্ড্যান্ট ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবু সোহেল, প্রধানমন্ত্রীর একান্ত সচিব লেফটেন্যান্ট কমান্ডার (অব.) সাইফুল ইসলাম ডিউক, প্রটোকল অফিসার ফরিদুল ইসলাম এবং আমি) গেলাম ম্যাডামের প্রেসিডেন্টশিয়াল স্যুটে। খুব বিনয়ের সঙ্গে বললাম : আমরা চারজন একবার ‘মারি’তে যেতে চাই। ফিরে আসব সরকারি সফরসূচি শুরু হওয়ার আগেই। ম্যাডাম জানতে চাইলেন, সরকারি সফরসূচি শুরুর আগেই ফেরা সম্ভব হবে কি না। আমরা সেই নিশ্চয়তা দিয়েই পেয়ে গেলাম বহুল প্রত্যাশিত অনুমতি।
প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গীদের প্রত্যেকের জন্য ছিল পাকিস্তান ট্রান্সপোর্ট পুলের আলাদা আলাদা অভিজাত প্রাইভেট কার। কিন্তু ছোট ট্যাক্সিতে যাতায়াত সম্ভব না দুর্গম পাহাড়ি জনপদ ‘মারি’তে। পাকিস্তানে নিযুক্ত বাংলাদেশের তৎকালীন হাইকমিশনার শামীম আহমদকে অনুরোধ করলাম একটা বড় গাড়ি দেওয়ার জন্য। তার দেওয়া পাজেরো জিপে খুব ভোরে রওনা দিলাম ইসলামাবাদ শহর থেকে ৩০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৭ হাজার ৫১৭ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত ‘মারি’র উদ্দেশ্যে।
চোখ জুড়িয়ে গেল কিছু সময়ের মধ্যেই। রাস্তার দুপাশে শ্বেতশুভ্র বরফ জমে তৈরি হয়েছে দৃষ্টিনন্দন ‘প্রাকৃতিক ফুটপাত’। ছোট-বড় পাহাড়ের ওপরে সারি সারি পাইনগাছের বাগান। পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে স্থানীয় মানুষের বসবাস। পর্যটকদের জন্যও আছে দৃষ্টিনন্দন পাহাড়ি রিসোর্ট। ‘মারি’তে যখন পৌঁছালাম, তখনো হচ্ছিল মৃদু তুষারপাত। বিরূপ আবহাওয়ার মধ্যেই ঘুরে দেখলাম সৃষ্টিকর্তার পরম মমতায় তৈরি নৈসর্গিক জনপদকে। সত্যিই বিমোহিত হলাম সবাই।
পাকিস্তানের সাধারণ মানুষের আন্তরিকতা স্মৃতিতে জ্বল জ্বলে একজন ড্রাইভার বশির-
‘Car No. 10 of Pakistan Protocol (পাকিস্তান প্রটোকলের ১০ নম্বর গাড়ি).’
লাউঞ্জের মাইক্রোফোনে ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে কালো রঙের মার্সিডিজ গাড়িটি নিয়ে হোটেলের সামনে হাজির হয় ড্রাইভার বশির। পেশোয়ারের বাসিন্দা বশির, ৬ ফুটের মত লম্বা, পেটা শরীর। পাকিস্তান ট্রান্সপোর্ট পুলের অভিজ্ঞ ড্রাইভার।
ভাঙা ভাঙা কিছু ইংরেজি বোঝে বশির, বাংলা তো বোঝেই না। আর আমিও বুঝি না উর্দু। তাই কখনো ইশারায়, আবার কখনো ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে কথা বলতে হয়েছে তার সঙ্গে। বশিরকে বললাম : বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সফরসূচির ফাঁকে ফাঁকে ইসলামাবাদ শহর এবং আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো ঘুরিয়ে দেখিও আমাদের। আমার সঙ্গে ছিলেন সাতক্ষীরার তৎকালীন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইলিয়াস। খুব ঈমানদার মানুষ ড্রাইভার বশির, যা বলেছিলাম, তাই করল। পাকিস্তানের রাজধানী শহর এবং আশপাশের দর্শনীয় স্থানগুলো পর্যায়ক্রমে ঘুরিয়ে দেখাল।
‘মারগালা’ পাহাড়ের পাদদেশে সুপরিকল্পিতভাবে তৈরি ইসলামাবাদ শহর। কিছু লোক দূরবীক্ষণ যন্ত্র নিয়ে বসেছে পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে। তাদের কিছু টাকা দিয়ে দূরবীক্ষণ যন্ত্রে চমৎকারভাবে দেখা যায় রাজধানী শহর এবং আশপাশের মনোরম প্রকৃতি। বশির নিজেই টাকাটা দিয়ে দিল, আমরা চেষ্টা করেও দিতে পারলাম না। এমনই করেছে বশির আরো দু-এক জায়গায়। ‘চাকলালা’ বিমানবন্দরে বিদায় নেওয়ার সময় কোলাকুলি করে কেঁদে ফেলল বশির। মাত্র তিন-চার দিনের সম্পর্ক, কিন্তু তার আন্তরিকতা যেন হৃদয় ছুঁয়ে গেল। তাই ২০ বছর পরও স্মৃতিতে জ্বল জ্বলে ড্রাইভার বশির। তখন ছিল না কোনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। আবিষ্কৃত হয়নি স্মার্টফোন, ব্যবহার করতাম ছোট্ট মোবাইল সেট। সরকারি ফটোগ্রাফারকে দিয়ে সম্ভব ছিল না সব ছবি তোলাও।
সরকারি সফরসূচির বাইরে পাকিস্তানের নানা শ্রেণি ও পেশার বেশ কিছু সাধারণ মানুষের সান্নিধ্যে গিয়েছিলাম আমরা দুজন। বুঝতে চেষ্টা করেছিলাম, বাংলাদেশ সম্পর্কে তাদের মনোভাব। তাদের সবারই ভাষ্য : ‘আমরা তো ভাই ভাই ছিলাম। কিন্তু বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছি পাকিস্তানের তৎকালীন সামরিক শাসক গোষ্ঠীর ভুলের কারণে। তবে মনেপ্রাণে আজও আছি ভাই ভাই।’ আমাদের পরিচয় জেনে প্রত্যেকেই চেষ্টা করেছে কিছু না কিছু আতিথেয়তা করার। ফেরার সময় কোলাকুলি না করে ছাড়েননি কেউ। প্রথমে পাকিস্তান সফরের কর্মসূচি পরিবর্তন করে অন্য কোনো দেশে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলাম আমি। কিন্তু পরে মনে হয়েছে পাকিস্তানে আসাটাই ছিল সঠিক। নিজের খরচে হয়তো কোনোদিন যেতাম না পাকিস্তানে। আর জানাও সম্ভব হতো না পাকিস্তানের সাধারণ মানুষের আন্তরিকতার কথা, যা সত্যি ভোলার মতো নয়।
বেগম খালেদা জিয়ার তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তে নিমিষেই শান্ত হয়ে গেল বিক্ষুব্ধ হাজিরা-
পাকিস্তান থেকে ফেরার পালা। এসএসএফের বিশেষ পাহারায় জেদ্দা থেকে ইসলামাবাদ পৌঁছেছে ভিভিআইপি ফ্লাইট নম্বর বিজি-০৩৬। প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গীদের প্রায় সবাই আসন গ্রহণ করেছেন সুপরিসর ডিসি-১০ বিমানে। কিন্তু বিশেষ কারণে ম্যাডামের গাড়ি বহর আসতে হচ্ছিল কিছুটা বিলম্ব। সৌদি আরব থেকে হজযাত্রীদের নিয়ে এসেছে বিমানটি। পরদিন বাংলাদেশে ছিল আওয়ামী লীগ আহূত সকাল-সন্ধ্যা হরতাল। তাই হাজিরাও ছিল খুব উদ্বিগ্ন। কিছুটা সময় পাওয়ায় আমি বিমানের মধ্যে ঘুরে দেখছিলাম, পরিচিত কোনো হাজি আছে কি না। ফ্লাইট বিলম্বিত হওয়ায় একপর্যায়ে হাজিরা হয়ে পড়েন বেশ বিক্ষুব্ধ।
ঘণ্টাখানেক পরে পৌঁছাল প্রধানমন্ত্রীর গাড়ি বহর। আসন গ্রহণ করলেন ম্যাডাম। আমি কাছে গিয়ে বললাম : ‘ম্যাডাম, হাজিরা খুবই উত্তেজিত। বিমানের মধ্যে হইচই করছে তারা। কিছু একটা করার দরকার।’
সঙ্গে সঙ্গেই ম্যাডাম ডাকলেন বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে। নির্দেশ দিলেন, রাতের খাবার প্রস্তুত থাকলে এখনই পরিবেশন করুন। আর ঘোষণা দিয়ে দিন, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ নির্দেশে আগামীকাল জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হজযাত্রীদের থাকার এবং খাওয়ার সুব্যবস্থা করবে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। ক্যাপ্টেনকে ঘোষণা দিতে বললেন বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক।
পাশেই দাঁড়ানো ছিলাম আমি। তাৎক্ষণিক আমি বললাম, এভাবে না। ঘোষণাটা হবে : ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার বিশেষ নির্দেশে আগামীকাল বিরোধী দল আহূত হরতালের ফলে সৃষ্ট জনদুর্ভোগ নিরসনকল্পে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস এই ফ্লাইটে আগত হজযাত্রীদের জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে থাকা ও খাওয়ার সুব্যবস্থা করবে।’
ম্যাডাম একটু মুচকি হাসলেন। বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমাকে একটা নোটবুক দিয়ে বললেন, ঘোষণাটা লিখে দিন আপনি। আমি সিটে বসে সঙ্গে সঙ্গেই লিখে দিলাম, ক্যাপ্টেন ঘোষণা দিলেন।
বেগম খালেদা জিয়ার দূরদর্শী সিদ্ধান্তে হজযাত্রীরা তাৎক্ষণিকভাবে হয়ে গেল একদম শান্ত। নৈশভোজ শেষে ম্যাডাম বিমানের মধ্যে ঘুরে ঘুরে সাক্ষাৎ করলেন হজযাত্রীদের সঙ্গে। আমরাও ছিলাম পেছনে পেছনে। প্রধানমন্ত্রীকে কাছে পেয়ে হজযাত্রীরা হয়ে পড়ল খুবই আনন্দিত। আল্লাহর অশেষ রহমতে রাত ১টায় নির্বিঘ্নে সবাই পৌঁছালাম বাংলাদেশের জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে।
লেখক: বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী এবং সাবেক ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল