হোম > জুলাই বিপ্লব

‘জালেমকে ধ্বংস করুন’ প্রার্থনা করে আন্দোলনে শহীদ হন ডা. সজিব

মাহমুদ আশিক

ডা. সজিব সরকার

জুলাই বিপ্লবে ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি সফল করতে নরসিংদীর বাসা থেকে রাজধানীর উত্তরায় এসেছিলেন ব্রহ্মণবাড়িয়া মেডিকেল কলেজের প্রভাষক তরুণ চিকিৎসক সজিব সরকার। এসে দেখেন রণক্ষেত্র উত্তরার সড়ক-মহাসড়ক। আন্দোলন চলাকালে অ্যাপ্রোন পরিহিত কয়েকজনের একটি ভ্রাম্যমাণ মেডিকেল টিমের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েন ত্রিশ বছর বয়সি এই চিকিৎসক। গুলিবিদ্ধ আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতাকে প্রাথমিক চিকিৎসা সেবা দিয়ে পাঠাচ্ছিলেন হাসপাতালে।

এভাবেই ধীরে ধীরে সামনের দিকে যেতে যেতে উত্তরা আজমপুর ওভার ব্রিজের নিচে পৌঁছে যান তিনি। এরই মধ্যে টার্গেটে পরিণত হন আওয়ামী সন্ত্রাসী ও পুলিশ বাহিনীর। এরপর সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় গুলিবিদ্ধ হন চিকিৎসক সজিব। মেডিকেলে নিতে নিতেই শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন জুলাই বিপ্লবে একমাত্র শহীদ এই চিকিৎসক। সজিবের পিতা মোহাম্মদ হালিম সরকার ও ছোট বোন সুমাইয়া সরকার স্বর্ণা আমার দেশকে এসব তথ্য জানিয়েছেন।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে নারী শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগের হামলা ও নিরস্ত্র শিক্ষার্থীদের গুলি করে হত্যাকাণ্ডের ঘটনাগুলো চিকিৎসক সজিবের হৃদয়ে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করে। যা রূপ নেয় তীব্র ক্ষোভে। ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে তিনি তার শহীদ হওয়ার দিন ২০২৪ এর ১৮ জুলাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মহান রবের নিকট প্রার্থনা করে লিখেন, ‘হে আল্লাহ আপনি সহায় হোন, আমিন। জালেমকে ধ্বংস করুন, জালেমের ধ্বংসকে ত্বরান্বিত করুন, আমিন’। এরপর তিনি ওইদিন দেশব্যাপী ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করেন।

ওইদিন সকালে ফজরের নামাজ আদায় করে বাসায় অসুস্থ মা ঝর্ণা বেগমের সঙ্গে নাস্তা করেন সজিব সরকার। এরপর রেডি হয়ে বের হওয়ার সময় মায়ের হাতে চার হাজার টাকা দিয়ে প্রয়োজনে খরচ করতে বলে কপালে চুমু দিয়ে বের হন তিনি। কোথায় যাচ্ছে জানতে চাইলে আন্দোলনে যুক্ত হওয়ার বিষয়টি মাকে না জানিয়ে বলেছিলেন- মাদরাসায় পড়ুয়া ছোট ভাই আব্দুল্লাহ সরকারকে নিতে যাচ্ছেন। দরজার সামনে গিয়ে মেজো ভাইয়ের স্ত্রীকে ডেকে মাকে দেখে রাখতে বলেন। এরপর চলে যাওয়ার সময় তিনবার মাকে ডেকে বিদায় জানিয়েছিলেন সজিব।

সেদিন উত্তরার আন্দোলনে ছিলেন চিকিৎসক সজিবের ছোট বোন সুমাইয়া সরকার স্বর্ণা। তিনি বলেন, আমি উত্তরা আজমপুর-বিএনএস সেন্টারের মধ্যবর্তী স্থানে থাকা পাম্পের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলাম। হঠাৎ পেছন থেকে ভাইয়ার কণ্ঠে শুনতে পারি ‘এত ছোট লাঠি দিয়ে কী হবে?’। আমি অবাক হয়ে পেছনে তাকিয়ে দেখি ভাইয়া কয়েকজন অ্যাপ্রোণ পরিহিত লোকের সঙ্গে আছেন। তখন আমি ভাইয়াকে মজা করেই বলেছিলাম, ‘তুমি ডাক্তার মানুষ, তোমার আন্দোলনে কী কাজ?’ তিনি প্রশ্ন এড়িয়ে গিয়ে আমাকে বলেছিলেন অবস্থা ভালো না, বাসায় ফিরে যাওয়ার জন্য।

স্বর্ণা জানান, এরপর তিনি সেখান থেকে চলে যান। সামনের দিকে এগোতেই টিয়ারশেল এসে তার সামনে পড়ে। একই সময় স্বর্ণার মাথায়, পিঠে ও হাতে পুলিশের ছোড়া ছররা গুলি লাগে। বড় ভাই চিকিৎসক সজিবকে না জানিয়েই তখন প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে বাসায় চলে যান স্বর্ণা। তারপর থেকেই ভাই সজিবকে মোবাইলে কল করে পাচ্ছিলেন না তিনি।

তরুণ এই চিকিৎসকের পিতা হালিম সরকার জানান, প্রত্যক্ষদর্শীরা চিকিৎসক সজিবের শেষ মুহূর্তের কিছু কাজ দেখেছেন। তিনি একটি মেডিকেল টিমের সঙ্গে যুক্ত হয়ে টিমটিকে নেতৃত্ব দিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা দিচ্ছিলেন আহত জুলাই যোদ্ধাদের। যাদের অবস্থা গুরুতর তাদের মেডিকেলে পাঠাচ্ছিলেন। এভাবে তিনি সেখানে আন্দোলনকারীদের চিকিৎসাসেবা দিতে দিতে সামনে এগিয়ে যান। হয়তোবা তার ভেতর ভয় ছিল না। কারণ চিকিৎসককে কেন মারবে?

কিন্তু তার ধারণা ভুল ছিল। আন্দোলনকারী আহতদের চিকিৎসা সেবা দেওয়ায় পুলিশ ও আওয়ামী সন্ত্রাসী বাহিনীর টার্গেটে পরিণত হন। এরপর তিনিসহ কয়েকজন উত্তরা আজমপুর পূর্ব থানার সামনের ওভার ব্রিজের নিচে দাঁড়ানো ছিলেন। বিকালে থানার ছাদ ও সামনে থেকে গুলি ছুড়ছিল পুলিশ ও আওয়ামী সন্ত্রাসীরা। এ সময় সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় চিকিৎসক সজিবকে টার্গেট করে ছোড়া গুলি তার বুকে এসে লাগে। মুহূর্তেই মাটিতে লুটিয়ে পড়েন তিনি। আন্দোলনকারীরা তাকে ধরে রিকশায় তুলে উত্তরা আধুনিক মেডিকেলে নিয়ে যান। কিছুক্ষণ পর সজিবের ছোট বোন স্বর্ণার ফোনে কল আসে। তাকে জানানো হয় সজিব গুলিবিদ্ধ হয়েছেন হাসপাতালে যাওয়ার জন্য।

সেদিনের ঘটনার বিবরণ দিয়ে স্বর্ণা বলেন, ভাইয়া গুলিবিদ্ধ হয়েছেন জানতে পেরে দ্রুত মেডিকেলে যাই। ভাবছিলাম হয়তো কিছুটা আঘাত পেয়েছেন। মেডিকেলে এসে খুঁজে পাচ্ছিলাম না তাকে। এরপর একজন চিকিৎসককে ভাইয়ার ছবি দেখানোর পর বলেন তার সঙ্গে যাওয়ার জন্য। গিয়ে কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখা দুইটি নিথর দেহ দেখতে পাই। দেখি ভাইয়া শুয়ে আছেন। তিনি শহীদ হয়ে আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে চলে গেছেন।

মেডিকেল থেকে স্বজন ও বন্ধুদের সহযোগিতায় শহীদ চিকিৎসকের লাশ বের করে নিয়ে যাওয়া হয় উত্তরার একটি মসজিদে। সেখানে মসজিদের ইমাম ও শহীদের ছোট ভাই আব্দুল্লাহ শেষ গোসল করিয়ে রাতেই ট্রাকে করে গ্রামের বাড়ি নরসিংদী জেলার রায়পুরে নিয়ে যান।

শহীদের পিতা হালিম বলেন, আমার শহীদ চিকিৎসক ছেলের লাশ আনার পর আমরা তো পাগলপ্রায়। ওই অবস্থায় বিভিন্ন নম্বর থেকে কল করে আমাদের হুমকি-ধমকি দিচ্ছিল তাড়াতাড়ি লাশ সরানোর জন্য। চাপের মুখে পরদিন সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করি। পরদিন ১৯ জুলাই সকালে শহীদের ছোট ভাই আব্দুল্লাহ সরকারের ইমামতিতে জানাজার মাধ্যমে শেষ বিদায় জানিয়ে গ্রামের বাড়ির চরসুবুদ্ধি কবরস্থানে সজিব সরকারকে দাফন করা হয়।

বাবা হালিম সরকার আরো বলেন, আমার ছেলেটা ছিল অত্যন্ত মেধাবী ও পরহেজগার। ওর সব রেজাল্টই এ প্লাস। বিভিন্ন মাদরাসার শিক্ষার্থীদের কোরআন ও পাঠ্যবই কিনে দিত। এমনকি একটি মাদরাসায় দুই বস্তা চাল দিত সবসময়। আমার ছেলে যেখানেই যেত, দুই রাকাত নফল নামাজ পড়ে বের হতো। আমি দেখিনি কিন্তু আমার বিশ্বাস সেদিন আন্দোলনে যাওয়ার সময়ও আমার সজিব দুই রাকাত নামাজ পড়েই গেছে। সে আমাদের জন্য কিছু সম্পদ রেখে গেছে তার ড্রয়ারে। সেগুলো হলো তসবিহ, জায়নামাজ ও টুপি।

শহীদ সজিব সরকারের নামে নরসিংদী মেডিকেল অথবা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের নামকরণ চেয়ে হালিম সরকার বলেন, আমি চাই আমার শহীদ ছেলে অমর হয়ে থাকুক। অন্তত একটি প্রতিষ্ঠান হলেও তার নামে নামকরণ করুক। আমরা জানি না বিচার আসলেই আমরা পাব কি না! কিন্তু আমরা এমন বাংলাদেশ দেখতে চাই যেখানে শহীদদের রক্ত বৃথা যাবে না।

তাদের যথাযথ মূল্যায়ন হবে এবং জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত হবে।

চবিতে ‘আজাদীর বই উৎসব’, শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ

‘অথচ বেগম খালেদা জিয়া বারবার বলেছেন, বাহাত্তরের সংবিধানকে ডাস্টবিনে নিক্ষেপ করা উচিত’

‘জুলাই সনদ অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়নের কথা বলে তারা পাতায় পাতায় অস্বীকার করে যাচ্ছেন’

‘ওসমান হাদির চিন্তা, বারুদমাখা কথা শতাব্দীর পর শতাব্দী টিকে থাকবে’

‘খুনিরা হাদিকে হত্যা করেছে, তার চিন্তা ও আদর্শকে হত্যা করতে পারেনি’

‘খুনিরা ভেবেছিল হাদিকে হত্যা করলে ফ্যাসিস্টবিরোধী লড়াই থেমে যাবে, কিন্তু এ লড়াই থামবে না’

জুলাইয়ের স্মরণসভায় হেফাজত আমিরকে আমন্ত্রণ জানালেন ইশরাক

শহীদ কাইয়ুমের পরিবারের বেঁচে থাকার লড়াই

আ.লীগ নেতাদের হুমকিতে ঘরছাড়া জুলাই শহীদ রোমানের পরিবার

অভ্যুত্থানের পর সরকারবিহীন টালমাটাল তিনদিন