হোম > সাহিত্য সাময়িকী > বাংলার ইতিহাস

সুলতানি আমলের প্রথম মহাসড়ক

মাহমুদ নাসির জাহাঙ্গীরি

মধ্যযুগের সূচনায় তাম্রলিপ্তির স্থান দখল করে নেয় সপ্তগ্রাম আর বিক্রমপুরের স্থান দখল করে সুবর্ণগ্রাম। প্রাগৈতিহাসিক গঙ্গার গতি পরিবর্তনের পর প্রাকৃতিক কারণে পরিত্যক্ত হয় পুরোনো বন্দর তাম্রলিপ্তি আর রাজনৈতিক কারণে রাজধানী বিক্রমপুর স্থানান্তরিত হয় সুবর্ণগ্রামে। দশম শতক থেকে ত্রয়োদশ শতক পর্যন্ত বিক্রমপুর ছিল চন্দ্র, বর্মণ ও সেন রাজাদের রাজধানী। ত্রয়োদশ শতকের প্রথমার্ধে গৌড়কে রাজধানী করে পশ্চিমাঞ্চল শাসিত হয় মুসলমান শাসকদের দ্বারা আর সুবর্ণগ্রামকে রাজধানী করে পূর্বাঞ্চল শাসিত হয় সেনবংশের রাজাদের দ্বারা। ত্রয়োদশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে দ্বৈতশাসনপ্রথা ভেঙে যায়। দিল্লির সুলতান গিয়াসউদ্দিন বলবনের সময়ে (১২৬৬-৮৭) বাংলার গভর্নর মুগিসউদ্দিন তুঘরল বিদ্রোহী হয়ে নিজেকে স্বাধীন সুলতান হিসেবে ঘোষণা করেন (১২৭৫-৮১)। এ সময়ে সেন রাজাদের পরাজিত করে স্বাধীন সুলতানরা বৃহত্তর ঢাকা, ফরিদপুর, কুমিল্লা ও পার্বত্য ত্রিপুরায় নিজেদের প্রভাব বিস্তার করেন এবং রাজধানী সুবর্ণগ্রামের নামকরণ করেন সোনারগাঁ। বিক্রমপুরের খ্যাতি অস্তমিত হয়ে উদিত হয় সোনারগাঁয়ের সূর্য। মুগিসউদ্দিনকে বলা যায় স্বাধীনতা ঘোষণার প্রথম নায়ক। দিল্লিতে বলবনী শাসনের সমাপ্তি ঘটে গিয়াসউদ্দিন বলবনের মৃত্যুর পর (১২৮৭)। একই সঙ্গে বাংলায় এ বংশের শাসকদের উত্থান ঘটে। বরবনী বংশের নাসিরউদ্দিন মাহমুদের ক্ষমতারোহণকে (১২৮৭-৯১) বলা যায় স্বাধীনতার পূর্বসূচনা। প্রকৃত স্বাধীনতার সূচনা করেন ফখরউদ্দিন মোবারক শাহ, ১৩৩৮-৪৯ কালপর্বে।

স্বাধীন সুলতানাত প্রতিষ্ঠার সময় থেকে সাতগাঁও, সোনারগাঁ ও চট্টগ্রামের মতো বন্দরগুলো প্রতিষ্ঠিত হতে থাকে। মেঘনা, লক্ষ্যা ও ব্রহ্মপুত্রের মোহনায় সোনারগাঁ হয়ে ওঠে স্বাধীন দেশের রাজধানী হওয়ার উপযোগী। এ ক্ষেত্রে পথপ্রদর্শকের ভূমিকা পালন করেন ফখরউদ্দিন মোবারক শাহ। স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করে স্বাধীন দেশের সুলতান গড়ে তোলেন সোনারগাঁ বন্দর ও চাঁদপুর-চট্টগ্রাম মহাসড়ক। সোনারগাঁয়ের সঙ্গে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রবন্দর চাটগাঁওয়ের সংযোগ স্থাপনের জন্য চতুর্দশ শতকে নির্মিত হয় এই মহাসড়ক—যার নামকরণ হয় ‘সদ্দীনের হদ্দ’, ‘ফদ্দীনের পথ’ বা ফখরুদ্দিনের পথ।

ফখরউদ্দিন মোবারক শাহ সোনারগাঁয়ের প্রথম স্বাধীন সুলতানই নন, চট্টগ্রাম বিজয়েরও প্রথম নায়ক। বলবনের পুত্র বুগরা খান এবং তার উত্তরাধিকারী রুকনউদ্দিন কাইকাউসের সময়ে বাংলা চার ভাগে বিভক্ত ছিল। এর মধ্যে লখনৌতি বলতে উত্তরবঙ্গকে বোঝাত, সাতগাঁও বলতে নিম্নবঙ্গকে বোঝাত, সোনারগাঁ বলতে পূর্ববঙ্গকে বোঝাত এবং চাটগাঁও বলতে বোঝানো হতো ভিন্ন এক অঞ্চলকে। শামসউদ্দিন ফিরুজ শাহ নতুন রাজবংশ প্রতিষ্ঠা করেন। তার রাজত্বকালে (১৩০১-২২) লখনৌতি, সাতগাঁও ও সোনারগাঁয়ের সঙ্গে বিহার অন্তর্ভুক্ত হয়, কিন্তু হস্তচ্যুত হয় চাটগাঁও। এ অবস্থায় ফখরউদ্দিন মোবারক শাহ ক্ষমতা দখল করেই চট্টগ্রাম পুনরুদ্ধারে মনোনিবেশ করেন। কদল খান সম্ভবত তার সেনাপতি হিসেবে আরাকানিদের বিতাড়িত করে প্রথম চট্টগ্রাম দখল করেন। চট্টগ্রাম বিজয়ের পর এ শহরকে চাঁদপুরের সঙ্গে যুক্ত করে নির্মাণ করেন প্রথম মহাসড়ক। তাতে সোনারগাঁ সমুদ্রবন্দরের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের পথ খুলে যায়। ইবনে বতুতা লিখেছেন, এ সময়ে ‘সোদকায়া’ ছিল ফখরউদ্দিনের রাজধানী। সুখময় মুখোপাধ্যায় মনে করেন, ফখরউদ্দিন পর্যায়ক্রমে সোনারগাঁ ও ‘সোদকায়া’য় (চট্টগ্রাম) তার রাজধানী স্থানান্তরিত করতেন। কাজেই দুই সমুদ্রবন্দর সোনারগাঁ ও চাটগাঁওয়ের মধ্যে সংযোগ স্থাপনের জন্য তৈরি হয় চাঁদপুর-চট্টগ্রাম সড়ক।

প্রথম জীবনে ফখরউদ্দিন ছিলেন সোনারগাঁয়ের গভর্নর বাহরাম খানের (১৩২৮-৩৮) সিলাহদার বা বর্মরক্ষক। তার কর্মস্থল ছিল ভুলুয়া। ভুলুয়া হচ্ছে গঙ্গা-মেঘনার সঙ্গমস্থলে দক্ষিণ লক্ষ্মীপুরের একটি এলাকা। ১৬৬৮ সালে নতুন খাল খননের কারণে এর নাম নোয়াখালী (নোয়া+খাল+ঈ) হওয়ার আগ পর্যন্ত নোয়াখালীকে বলা হতো ভুলুয়া। এখানে তিনি সম্ভবত বাহরাম খানের সামরিক প্রশাসনিক কর্মকর্তা বা ফৌজদার ছিলেন। বাহরাম খানের মৃত্যুর পর ফখরউদ্দিন ভুলুয়া থেকে এসে মোবারক শাহ উপাধি ধারণ করে সোনারগাঁয়ের শাসনভার গ্রহণ করেন। কিন্তু লখনৌতির গভর্নর কাদার খানের প্রতিরোধের মুখে তার বাহিনী নিয়ে পালিয়ে যান ভুলুয়ায়। পরবর্তী সময়ে কাদার খানের অশ্বারোহী বাহিনীকে পরাজিত করে সোনারগাঁয়ের সিংহাসনে স্বাধীন সুলতান হিসেবে অধিষ্ঠিত হন। কাদার খান ছিলেন দিল্লির ঔপনিবেশিক শাসনের প্রতিভূ—তার অশ্বারোহী বাহিনী পরাজিত হয় বাংলার কাদাজলের মধ্যে। ফখরউদ্দিন ছিলেন বাংলার স্বাধীনতার প্রতীক—তার নৌবাহিনী বিজয়ী হয় কাদার খানের অশ্বারোহী বাহিনীর বিরুদ্ধে। কাদার খানের খাজাঞ্চিখানার প্রধান (আরিজ-ই-লস্কর বা বেতনদাতা) ও পরবর্তী সময়ের সুলতান আলাউদ্দিন আলী শাহর (১৩৪১-৪২) বিরুদ্ধে ‘বর্ষাকালের যুদ্ধের কৌশল’ ব্যবহার করে জয়লাভ করেন ফখরউদ্দিন মোবারক শাহ।

ইবনে বতুতার বর্ণনানুসারে, শীতকাল ও বর্ষাকালে ফখরউদ্দিন মোবারক শাহ জলপথে লখনৌতি আক্রমণ করতেন, কারণ জলে তিনি শক্তিশালী ছিলেন। কিন্তু শুষ্ক ঋতুতে (গ্রীষ্মকালে) আলী শাহ স্থলপথে বাংলা আক্রমণ করতেন, কারণ স্থলপথে তার শক্তি ছিল বেশি। শুকনো মৌসুমে পাঠান, আফগান ও মোগল বাহিনী ঘোড়ায় চড়ে এসে আক্রমণ করত তেলিয়াগড়ি ও সিক্রিগলির পথে। আর বর্ষাকালে নৌবাহিনীর অভাবে তারা অভিযান থেকে বিরত থাকত। পক্ষান্তরে, নদীর দেশে সুবিশাল নৌবহর নিয়ে মোবারক শাহ পদ্মা-মেঘনায় প্রতিষ্ঠা করেন তার আধিপত্য। নৌবাহিনী ও স্থলবাহিনীকে সমৃদ্ধ করে তিনি বাংলায় যে স্বাধীন সুলতানাতের গোড়াপত্তন করেন, তার স্থায়িত্ব হয় ২০০ বছর (১৩৩৮-১৫৩৮)।

মোহাম্মদ ঘোরির ক্রীতদাস কুতুবউদ্দিন আইবেক হয়েছিলেন ভারতের প্রথম সুলতান; বাহরাম খানের বর্মবাহক হন বাংলার প্রথম স্বাধীন সুলতান। বাংলার আঞ্চলিক স্বাতন্ত্র্য ও ভূগোলের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বিশেষ সামরিক বিদ্যাবলে এই সাফল্য লাভ করেন তিনি। দিল্লির ঔপনিবেশিক শাসকদের সঙ্গে স্থলযোগাযোগ রুদ্ধ করে দিয়ে স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির অংশ হিসেবে তিনি বহির্বিশ্বের সঙ্গে নৌবাণিজ্যের নীতি গ্রহণ করেন। বিশ্বব্যাপী মুসলমান-নিয়ন্ত্রিত বাণিজ্যের যুগে নতুন সমুদ্রবন্দরনীতি স্বাধীন সুলতানাত প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ৫০০ বছর কৃষিজীবনে আটকে থাকার পর বাংলাদেশ আবার তার সময়ে সামুদ্রিক বাণিজ্যের উপযোগী হয়ে ওঠে। সামুদ্রিক বাণিজ্য পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর গ্রামীণ সভ্যতা মুদ্রা-অর্থনীতিবাহী নাগরিক সভ্যতায় রূপান্তরিত হয়।

স্থলপথে চাঁদপুরের সঙ্গে চট্টগ্রামের সহজ যোগাযোগের ফলে প্রতিষ্ঠিত হয় দিল্লিমুখী পূর্ব-পশ্চিম স্থলনীতির পরিবর্তে উত্তর-দক্ষিণ নীতি। তাতে বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত হয় প্রধানত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে। ইবনে বতুতার ভ্রমণবৃত্তান্তে পাওয়া যায় মোবারক শাহর স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির কথা। স্বাধীন সুলতানি আমলের ২০০ বছর ধরে এই নীতি অব্যাহত ছিল। শুধু শের শাহর আমলে সড়ক-ই-আজম প্রতিষ্ঠার পরই দিল্লিমুখী নীতি আবার প্রবর্তিত হয়। মোগল আমলে এ নীতি আরো শক্তিশালী হয়। আওরঙ্গজেবের অন্যতম কর্মচারী শিহাবুদ্দীন তালিশের বর্ণনা অনুযায়ী, সুলতানদের মহাসড়কটি তখনো কোনোক্রমে তার অস্তিত্ব বজায় রাখতে সক্ষম হয়। রবার্ট ক্লাইভের সার্ভেয়ার জেনারেল জেমস রেনেলের লেখায় আছে এর ভঙ্গুর দশার বর্ণনা—

লক্ষ্মীপুর (নোয়াখালী) থেকে চন্দরগঞ্জ পর্যন্ত রাস্তাগুলো অনেক জায়গায় ভাঙা। চন্দনগঞ্জ থেকে কালিন্দা পর্যন্ত অঞ্চল নিচু বলে রাস্তা প্রায়ই খারাপ হয়ে পড়ে থাকে।

কালিন্দা থেকে ফেনী পর্যন্ত রাস্তাগুলোর অবস্থা আরো খারাপ। ফেনী নদী থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত রাস্তাগুলোর মাঝে মাঝে নালা দেখা যায়। সেতু না থাকায় পার হওয়া দুঃসাধ্য। এ যুগে কোনো পাকা রাস্তা নেই, সব রাস্তা কাঁচা।

ক্লাইভের জরিপ বিভাগে সার্ভেয়ার জেনারেল হিসেবে (১৭৬৭-৭৭) নিয়োগ লাভের পর রেনেলের দায়িত্ব ছিল—সুন্দরবন ও মেঘনার মধ্যবর্তী পথের পরিবর্তে গঙ্গা থেকে কলকাতায় বৃহদাকার নৌযান চালানোর উপযোগী অপেক্ষাকৃত কম দূরত্বের নৌপথ খুঁজে বের করা। এতে বাংলার প্রধান বন্দর চট্টগ্রামের পরিবর্তে কলকাতাকে প্রধান করার মানসিকতা সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। কারণ, পলাশীর প্রান্তরে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর চট্টগ্রামের স্থান দখল করে নেয় কলকাতা। কলকাতা হয়ে ওঠে বৃহত্তর সমুদ্রবন্দর, চট্টগ্রাম দ্বিতীয় সমুদ্রবন্দর। কলকাতামুখী নীতির কারণে ‘সদ্দীনের হদ্দ’ পরিত্যক্ত হয় ব্রিটিশ আমলে। ঔপনিবেশিক শাসকরা নতুন যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলে উত্তর-দক্ষিণ অক্ষের ভিত্তিতে। ঔপনিবেশিক স্বার্থে ক্রমে বিকশিত হয় কলকাতা, বোম্বে, সিঙ্গাপুর (১৮১৯), হংকং (১৮৪০), সাংহাই, কলম্বো (১৮১৫), রেঙ্গুন (১৮২৪) ইত্যাদি বন্দর। তার ফলে চট্টগ্রাম বন্দর ও তার সঙ্গে ফখরউদ্দিন মোবারক শাহর কীর্তি বলে খ্যাত সংযোগসড়কটি দৃষ্টির অন্তরালে চলে যায়।

লেখক : প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, বাংলা বিভাগ, মিরপুর কলেজ

হারিয়ে যাওয়া স্বাদ: ঢাকার জাহাজি কালিয়া

বাংলায় মাদরাসা স্থাপত্যের বিকাশ

বাংলাদেশের কালচারাল ক্যালেন্ডার: অক্টোবর-কার্তিক-জমাদিউল আউয়াল

বাংলায় মাদরাসা স্থাপত্য

বাংলাদেশের মহানায়কদের গল্প: হিরোস নেভার ডাই

অক্টোবর-আশ্বিন-রবিউস সানি/জমাদিউল আউয়াল

ঢাকেশ্বরী মন্দির: ইতিহাস ও কিংবদন্তি

মসনদে আলা ঈসা খাঁ: স্বাধীন বাংলা সালতানাতের শেষ উত্তরসূরি

ভোলার হারানো মসজিদের খোঁজে

অক্টোবর-আশ্বিন-রবিউস সানি: বাংলাদেশের ইতিহাস ক্যালেন্ডার